রাহাত হুসাইন
প্রকাশ : ০৩ আগস্ট ২০২৫ ১২:৩২ পিএম
ডিএনসিসির কর্মকর্তা এসএম শফিকুর রহমান। প্রবা ফটো
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) একজন কর্মকর্তা এসএম শফিকুর রহমান। নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির দীর্ঘ পথ পেরিয়ে তিনি এখন ‘প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ (অতিরিক্ত দায়িত্ব)’। যদিও তার চাকরি কাঠামো, পদোন্নতি ও বেতন-ভাতা নিয়ে রয়েছে নানা বিতর্ক। তার পদোন্নতির জন্য ডিএনসিসি সম্প্রতি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কাছে অনাপত্তিপত্র (এনওসি) চেয়েছে।
জানা গেছে, ২০১২ সালের ১৫ মে স্থানীয় সরকার বিভাগের আদেশে বরিশাল সিটি করপোরেশন থেকে বদলি হয়ে ডিএনসিসিতে যোগ দেন এসএম শফিকুর রহমান। মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে তাকে নগর পরিকল্পনা বিভাগে স্থপতি হিসেবে পদায়ন করা হয়, যদিও তার মূল পেশাগত পটভূমি ছিল পানি প্রকৌশল। ২০১৩ সালের ২৬ নভেম্বর ডিএনসিসির তৎকালীন সচিব আবু ছাইদ শেখ এক অফিস আদেশে পরিষ্কার করে দেন যে, শফিকুর রহমানের পদোন্নতির জ্যেষ্ঠতা, অবসরকালীন পাওনা ও প্রশাসনিক বিষয়াদি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, অর্থাৎ বরিশাল সিটি করপোরেশন থেকেই নিষ্পত্তি করতে হবে।
২০১৪ সালের ২২ জানুয়ারি, আরেক আদেশে তাকে নির্বাহী প্রকৌশলী (পূর) হিসেবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগে পাঠানো হয়। সব মিলিয়ে ২০১২ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত সময়ে তার তিনটি ভিন্ন বিভাগে পদায়ন হয়েছে। চাকরির এই পরিবর্তন-পর্যায়ের কোথাও নেই প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা বা মেধাক্রমভিত্তিক জ্যেষ্ঠতার প্রতিফলন। বরং আছে একের পর এক পদায়ন। বর্তমানে তিনি নগর পরিকল্পনা বিভাগের স্থপতি, একই সঙ্গে প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের অতিরিক্ত দায়িত্বে। পাশাপাশি দুটি বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও আমিনবাজার ল্যান্ডফিল সম্প্রসারণ প্রকল্পের ফোকাল পার্সন ও প্রকল্প পরিচালকও তিনি। ফলে প্রকৌশল, নগর পরিকল্পনা ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনাÑ তিন ভিন্ন পেশাগত শাখার দায়িত্ব একাই কাঁধে নিয়েছেন শফিকুর রহমান।
২০১৪ সালে তাকে যখন ডিএনসিসিতে পদায়ন করা হয়, তখন করপোরেশনের নিজস্ব চাকরি বিধিমালা ছিল না। ২০১৯ সালে ‘ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন কর্মচারী চাকরি বিধিমালা, ২০১৯’ অনুমোদিত হয়। যেখানে স্পষ্ট বলা হয়, ‘সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ হইতে প্রেষণে নিয়োজিত অথবা বদলি, চুক্তি বা খণ্ডকালীন ভিত্তিতে নিয়োজিত কর্মচারীর ক্ষেত্রে এই বিধিমালার কোনো কিছু প্রযোজ্য হইবে না, যদি না তা চাকরির শর্তে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে।’ অর্থাৎ যাদের বদলি বা প্রেষণে আনা হয়েছে, তাদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে এই বিধিমালা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, শফিকুর রহমানের চাকরির শর্তে কি এসব সুবিধা স্পষ্ট ছিল?
২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল ডিএনসিসির বাছাই কমিটি-১ বৈঠকে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, যেখানে বলা হয়, এসএম শফিকুর রহমান, স্থপতি ও প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ (অ.দা), নগর পরিকল্পনা বিভাগকে ডিএনসিসির উপযুক্ত পদে বিধি মোতাবেক আত্মীকরণ করত শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী পদোন্নতির বিষয়টি সুরাহা করা হবে। এরপর ২০ জুলাই ডিএনসিসি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে অফিসিয়াল চিঠি পাঠায়। সেখানে সিলেট থেকে বরিশাল বদলি হয়ে যাওয়া এক প্রকৌশলীর পদোন্নতির উদাহরণ টেনে শফিকুর রহমানের ক্ষেত্রেও অনাপত্তিপত্র চাওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেই প্রকৌশলী ছিলেন পদোন্নতির নির্ধারিত ফিডার পদে (নির্বাহী প্রকৌশলী, পূর)। শফিকুর রহমানের ক্ষেত্রেও তার মূল পদ নির্বাহী প্রকৌশলী (পানি); যা তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পূর বা যান্ত্রিক) পদে পদোন্নতির জন্য নির্ধারিত নয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তের উত্তর সিটি করপোরেশনের কয়েকজন প্রকৌশলী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, যদি ডিএনসিসির দাবি অনুযায়ী শফিকুর রহমানের পদোন্নতির অনুমোদন দেওয়া হয়, তাহলে তা চাকরি বিধিমালার বিপজ্জনক ব্যতিক্রম হবে। তিনি তো শিক্ষাগত যোগ্যতায়ও পিছিয়ে।
বর্তমানে ডিএনসিসিতে প্রকৌশলী, আইসিটি, পরিবহন, রাজস্ব, নগর পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন বিভাগে জনবল সংকট রয়েছে। কিন্তু একাধিক দায়িত্বধারী একজন কর্মকর্তার জন্য পদোন্নতির তোড়জোড় শুরু হয়েছে। এটি নিয়োগ নীতির চেয়ে সম্পর্কের প্রভাবকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়ার দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চাকরির বিধিমালাকে পাশ কাটিয়ে এসএস শফিকুর রহমানের পদোন্নতির জন্য মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তি চাওয়া প্রসঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় যে মতামত দেবে, আমরা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।
চাকরির বিধিমালাকে পাশ কাটিয়ে বদলি হয়ে আসা একজন কর্মকর্তার পদোন্নতির জন্য মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তি চেয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের দেওয়া চিঠির বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. রেজাউল মাকছুদ জাহেদীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।