প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৫ জুন ২০২৫ ১৪:৩৬ পিএম
সকাল থেকেই আকাশের ছিলো মেঘের আনাগোনার সঙ্গে ছিল সূর্যের লুকোচুরি। সেই মেঘ-সূর্যের লুকোচুরি মধ্যে হালকা ঝিরঝিরে বৃষ্টি নেমে বর্ষা ঋতুর প্রথম দিনের সকালেকে ভিজিয়ে দিতে না পারলেও জানান দিল আষাঢ় এসেছে। যাকে সঙ্গী করেই রবিবার ঢাকা মহানগরবাসী ধরিত্রীকে সবুজ করার আহ্বান রেখে বর্ষা ঋতু নিয়ে বিভিন্ন কবি-সাহিত্যিকদের রচিত গান, কবিতা আর নৃত্যের ছন্দের সঙ্গে কথামালায় বরণ করে নিলো ‘আষাঢ়ষ্য প্রথম দিবস’।
রবিবার (১৫ জুন) সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় বর্ষা উদযাপন পরিষদ এবং বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী আয়োজন করে বর্ষাকে বরণ নেবার ‘বর্ষা উৎসব ১৪৩২’। এ দুই আয়োজনে আষাঢ় ও শ্রাবণকে নিয়ে রচিত বর্ষাবন্দনার গান-কবিতার সঙ্গে নৃত্যের ছন্দে উদ্ভাসিত হলো এবারের বর্ষা ঋতু।
বর্ষা উদযাপন পরিষদের আয়োজনে অনুষ্ঠিত বর্ষা উৎসবের শুরু হয় শিল্পী সোহানী মজুমদারের সেতারে ‘রাগ আহীর ভৈরব’ পরিবেশনের মধ্যদিয়ে। পরে একে একে গান, আবৃত্তি ও নাচ পরিবেশন করেন শিল্পীরা। আয়োজনের এক ফাঁকে অনুষ্ঠিত বর্ষা কথন পর্বে ধরিত্রীকে সবুজ করার আহ্বানে শিশু-কিশোরদের মাঝে বিতরণ করা হয় বনজ, ফলদ ও ঔষধি গাছের চারা।
উৎসবের আয়োজকরা বলেন, ‘সংবেদনশীলতা ও সহমর্মিতা, জীবনযাপন ও প্রকৃতির মধ্যে সমঝোতা তৈরি ছাড়া মানবের মুক্তির ভিন্ন পথ নেই। উৎসবে বর্ষার জলধারায় সিক্ত হয়ে জীবন আনন্দময় ও কল্যাণব্রতী হওয়ার প্রত্যাশার বার্তাও এসেছে। তারা আরও বলেন, ধরিত্রী সবুজ হলেই পৃথিবী বাঁচবে। এজন্যই আমরা শিশু-কিশোরদের হাতে গাছের চারা তুলে দিয়েছি।’
উৎসবের ঘোষণাপত্রে বলা হয়, ষড়ঋতুর দেশ বাংলার জীবনধারা পাল্টে যাচ্ছে দ্রুত, সেই সাথে বদলে যাচ্ছে ঋতুর চরিত্র। গ্রীষ্ম হয়ে উঠছে খরতর, বর্ষা অনেক রুষ্ট এলোমেলো, শীত একাধারে নরম ও চরম, বসন্ত ক্ষীয়মাণ। প্রকৃতির ওপর মানুষের সীমাহীন অনাচার জন্ম দিয়েছে বিশ্বজনীন সংকটের। ভূপৃষ্ঠ হয়েছে তপ্ততর, সমুদ্রজল স্ফীত, ওজন বলয় ক্ষতিগ্রস্ত। আধুনিক জীবনযাত্রা গড়ে তুলছে অপচয়ের পাহাড়, মাটি খুঁড়ে প্রকৃতির সম্পদ গোগ্রাসে গিলছে মানুষ, প্রয়োজনের সীমানা-ছাপানো অপ্রয়োজনের ভারে পিষ্ট ও বিপন্ন আজকের পৃথিবী।” সভ্যতার দম্ভ ও প্রকৃতির ঔদার্য্যের মধ্যে বৈরিতা; মানব-অস্তিত্বের জন্য হুমকি তৈরি করছে বলেও জানানো হয় উৎসবের ঘোষণায়।
বর্ষা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মানজার চৌধুরী বলেন, ‘বর্ষাকে উদযাপন করা তো আমাদের শিখিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তবে বর্ষা উৎসব উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে গত ১৭ বছর ধরে বর্ষা উৎসব হয়ে আসছে। আমরা প্রতি বছর পহেলা আষাঢ় তথা আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে এই উৎসবটি আয়োজন করি। এবার ১৮তম আয়োজন।’
অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার জন্য এরকম আয়োজনের গুরুত্বের কথা তুলে ধরে মানজার চৌধুরী বলেন, এবারেও তারা আয়োজনটি সাজিয়েছেন বর্ষার গান, কবিতা, নাচসহ নানা সাংস্কৃতিক পরিবেশনায়। বাংলাদেশকে যে অসাম্প্রদায়িক করে গড়ে তোলার স্বপ্ন আমাদের সবার, সেখানে এ ধরণের আয়োজন বিশেষ ভূমিকা রাখে।
উৎসবের বর্ষা কথন পর্বে বক্তব্য দেন, বাংলাদেশ গণসঙ্গীত সমন্বয় পরিষদের সভাপতি কাজী মিজানুর রহমান। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক নিগার চৌধুরী। সঞ্চালনায় ছিলেন নুসরাত ইয়াসমিন রুম্পা।
উৎসবে একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন ইয়াসমিন মুশতারী, সালাউদ্দিন আহমেদ, বিজন চন্দ্র মিস্ত্রী, নবনীতা জাইদ, অনিমা রায়, শামা রহমান, মকবুল হোসেন, ফেরদৌসী কাকলী, বিমান চন্দ্র বিশ্বাস, শ্রাবণী গুহ রায়, এস এম মেজবাহ, রত্না সরকার। আবৃত্তি করেছেন নায়লা তারাননুম চৌধুরী কাকলী, আহসান উল্লাহ তমাল। দলীয় সংগীত পরিবেশন করেছে- সীমান্ত খেলাঘর আসর (শিশু-কিশোর), সুর বিহার, বহ্নিশিখা, সুর নন্দন, সত্যেন সেন শিল্পী গোষ্ঠী। দলীয় নৃত্য পরিবেশন করেছে- ধৃতি নর্তনালয়, নৃত্যাক্ষ, স্পন্দন, বেনুকা ললিতকলা কেন্দ্র, সিনথিয়া একাডেমি অফ আর্টস, নৃত্যম। যন্ত্রশিল্পী ছিলেন- তবলায় তুলসী সাহা, গিটারে মো. নাসির উদ্দিন, কী-বোর্ডে রবীন্স চৌধুরী, মন্দিরায় বিশ্বজিৎ সেন বিষ্ণু।
অন্যদিকে, উন্নয়নের নামে চলমান প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংসের প্রক্রিয়া বন্ধের দাবি নিয়ে ‘বর্ষা উৎসব’ আয়োজন করে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চে রবিবার সকাল সাড়ে ৭টায় সুর-সংগীতে প্রকৃতি-বন্দনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় এই উৎসব।
বর্ষা কথন, গান, নৃত্যসহ নানা সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় সাজানো এই আয়োজনের বর্ষা কথন পর্বে অতিথি ছিলেন রাজধানীর পান্থকুঞ্জ রক্ষা আন্দোলনের প্রধান সংগঠক ও বাংলাদেশ গাছ রক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক আমিরুল রাজিব। আলোচনায় অংশ নেন উদীচীর একাংশের কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপন এবং সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির একাংশের কেন্দ্রীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হাবিবুল আলম।
অনুষ্ঠানে উদীচীর নিজস্ব শিল্পীদের বিভিন্ন পরিবেশনার পাশাপাশি অতিথি শিল্পী হিসেবে সংগীত পরিবেশন করেন- বিজন চন্দ্র মিস্ত্রি, মহাদেব ঘোষ, প্রিয়াঙ্কা গোপ, তুহিন কান্তি দাস, চম্পাবতী এন মারাক প্রমুখ। মুসা কলিমের নেতৃত্বে সংগীত পরিবেশন করে- মাভৈঃ। অনিক বসুর পরিচালনায় দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে- স্পন্দন। দলীয় আবৃত্তি পরিবেশন করে- কারুপিঠ।