ঈদযাত্রা
ইউছুব ওসমান, জবি
প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০২৫ ১৪:৪৯ পিএম
পবিত্র ঈদুল ফিতরে নাড়ির টানে ঢাকা ছাড়ছেন অনেকেই। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে তোলা। প্রবা ফটো
পবিত্র ঈদুল ফিতরের আনন্দ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিতে রাজধানী ঢাকা ছেড়ে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরতে শুরু করেছেন অনেকেই। বাস ও ট্রেনের ঈদযাত্রা গত সোমবার থেকে শুরু হলেও লঞ্চে ঈদযাত্রা শুরু হচ্ছে আজ থেকে। ঈদুল ফিতরে নৌপথে যাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে নেওয়া হয়েছে নানা প্রস্তুতি। লঞ্চগুলোও সেজেছে নতুন রঙে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর থেকে সারা বছরই লঞ্চে যাত্রী খরা চললেও ঈদ এলে একটু আশায় বুক বাঁধেন লঞ্চ মালিকরা। এবারও খরা কাটিয়ে প্রাণ ফেরার অপেক্ষায় লঞ্চযাত্রায়।
রাজধানীর প্রধান নদীবন্দর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালেও ফিরতে শুরু করেছে যাত্রীদের হাঁকডাক। বাড়ছে ব্যস্ততাও।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর সদরঘাট থেকে বিশেষ লঞ্চ সার্ভিস শুরু হচ্ছে আজ বুধবার থেকে। ফিরতি যাত্রীদের জন্য এই সার্ভিস থাকবে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত। সদরঘাট থেকে ৫০টি রুটে যাত্রী নিয়ে ছেড়ে যাবে ১৭৫টি লঞ্চ। ভোগান্তিহীন ও নিরাপদ ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে প্রস্তুতিও নিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। সদরঘাটের সেই চিরচেনা রূপ না থাকলেও ঈদ উপলক্ষে রয়েছে বাড়তি প্রস্তুতি। অপেক্ষমাণ ১৭৫টি লঞ্চ, যা ছেড়ে যাবে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে।
গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা গেছে, কেরানীগঞ্জের ডকেরঘাটে দক্ষিণবঙ্গের মানুষদের অন্যতম এই গণপরিবহনের মেরামতের কাজ চলছে। মেরামত শেষে লঞ্চগুলো ঘাটে পাঠানো হচ্ছে। বুড়িগঙ্গার পাড়ে কেউ ব্যস্ত লঞ্চে রঙ করার কাজে, কেউবা ব্যস্ত পুরাতন পাটাতন মেরামত ও ঝালাইয়ে।
এদিকে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে কিছুটা যাত্রী সমাগম শুরু হলেও আগের মতো জৌলুস নেই টার্মিনালে। তবে ঈদযাত্রা শুরু হওয়ায় কিছুটা যাত্রী বেড়েছে। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত যাত্রীদের আনাগোনা দেখা গেছে। বিকালে বেড়েছে যাত্রীদের উপস্থিতিও। লঞ্চগুলো যাত্রী নিয়ে আনুষ্ঠানিক ঈদযাত্রা এখনও শুরু না করলেও কিছুটা স্বস্তি আর পরিবারকে বাড়তি সময় দিতে আগেভাগেই শেকড়ের টানে নদীপথে যাত্রা করছেন অনেকে।
এদিকে ঈদযাত্রার দামামা বেজে যাওয়ায় নদীপথের শ্রমিকদের অলস সময় শেষ হয়ে বেড়েছে ব্যস্ততা। হাঁকডাকে ঘাটে ফিরেছে প্রাণচাঞ্চল্য। লঞ্চ মালিকরা বলছেন, পদ্মা সেতু চালুর পর থেকেই নানা কারণে নদীপথে যাত্রায় বিমুখ হয়ে গেছেন অনেকেই। যানজটের কারণে গুলিস্তান থেকে সদরঘাট পর্যন্ত দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা চলে যায়। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর থেকে নৌ সেক্টরে ধস নেমেছে। তারপরও ঈদে যাত্রী পাওয়ার আশা করছেন তারা।
বরিশালগামী লঞ্চ সুন্দরবন-১৪-এর স্টাফ আবু বকর বলেন, সারা বছর তেমন যাত্রী থাকে না। ঈদে কিছু যাত্রী হয়। এবারও আমরা সেই আশায় প্রস্তুতি নিয়েছি। আশা করি ঈদ ঘনিয়ে এলে যাত্রী আরও বাড়বে।
এদিকে, অন্যবারের মতো এবারও নৌ মন্ত্রণালয় থেকে ঈদে অতিরিক্ত ভাড়া ও অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন না করার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে লঞ্চ মালিকরা বলছেন, নৌপথে যাত্রী খরার কারণে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের কোনো সুযোগ নেই। অন্যান্য সময়ের লোকসান পোষাতে ও যাত্রী ধরে রাখতে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার অনেক কম নিয়ে থাকেন তারা। ঈদের মৌসুমেই কেবল নির্ধারিত ভাড়া আদায়ের সুযোগ পান। সেটাও তুলনামূলক কম। জ্বালানি তেলের মূল্য, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়াসহ নানা কারণে নির্ধারিত ভাড়া নিয়েও ক্ষতি পোষানো যায় না। তাই ভাড়া অল্প বাড়িয়ে দেওয়া হলে আরও স্বাচ্ছন্দ্যে যাত্রীসেবা দিতে পারতেন বলে দাবি লঞ্চ মালিকদের। তবে যাত্রীদের আগ্রহ ধরে রাখতে ভাড়া না বাড়ানোর কথা বলছেন লঞ্চ মালিক সমিতির অধিকাংশ নেতা।
অ্যাডভেঞ্চার-১ লঞ্চের সুপারভাইজার মো. সেলিম বলেন, পদ্মা সেতু চালুর আগে পুরো রমজানজুড়ে যাত্রীর ভিড় হতো। এখন আর এমনটি হয় না। লঞ্চে কেবিন আছে ১৫০ থেকে ২০০টি। বর্তমানে ২০-২৫টি ভাড়া দিতে পারি। তাই ভাড়া কিছুটা না বাড়ালে আমাদের লোকসানে পড়তে হতে পারে। যাত্রী বাড়লে সেক্ষেত্রে কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া যায়।
লঞ্চের ম্যানেজার ও সুপারভাইজারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকা থেকে বরিশালগামী লঞ্চের ডেকের ভাড়া ৩০০ টাকা, সিঙ্গেল কেবিন ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা এবং ডাবল কেবিনের ভাড়া ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু ঈদের সময় ডেকের ভাড়া ৪০০, সিঙ্গেল কেবিন ১ হাজার ২০০ ও ডাবল কেবিনের ভাড়া ২ হাজার ৪০০ টাকা। অন্যান্য রুটের লঞ্চগুলোতেও প্রায় একই অবস্থা।
লঞ্চ মালিকদের সংগঠন অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থার মহাসচিব সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারী বলেন, আগে ঈদে ৩৫ শতাংশ ঘরমুখো যাত্রী নৌপথে যাতায়াত করতেন। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর থেকে এখন তা প্রায় ১৫ শতাংশে নেমে এসেছে। আমরা সারা বছর অনেক কষ্ট করে লস দিয়েই লঞ্চ চালাই। ঈদে কিছু যাত্রী হলে আমরা সেটা কাভার করার চেষ্টা করি। ঘরমুখো মানুষের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে।
বিআইডব্লিউটিএর ঢাকা নদীবন্দরের যুগ্ম পরিচালক মোবারক হোসেন বলেন, ঈদযাত্রা নিরাপদে সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। ফিটনেসবিহীন লঞ্চ চলাচল করতে পারবে না। যাত্রীদের নিরাপত্তায় ফায়ার সার্ভিস, নৌপুলিশ এবং ডিএমপির সদস্যরা প্রস্তুত রয়েছে। নিরাপত্তা ঝুঁকির অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেব।