হাসনাত শাহীন
প্রকাশ : ২৩ মার্চ ২০২৫ ১৫:২৮ পিএম
ফুটপাতে জমে উঠেছে ঈদের কেনাকাটা। শনিবার রাজধানীর রমনা ভবন এলাকা থেকে। ছবি : আলী হোসেন মিন্টু
ঈদুল ফিতর আসতে আর মাত্র ৮-৯ দিন বাকি। এরই মধ্যে রাজধানীবাসী এবং ঢাকায় অবস্থানরত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ ঈদের কেনাকাটা সেরে নিচ্ছে। নামিদামি শপিংমলের পাশাপাশি ফুটপাতের বাজারগুলোতেও চলছে জমজমাট কেনাবেচা। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ফুটপাত ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ক্রেতা-বিক্রেতাদের ভিড়ে মুখরিত হয়ে উঠেছে এসব স্থান।
বিগত কয়েকদিন রাজধানীর বিভিন্ন অঞ্চলের ফুটপাত ঘুরে ফুটপাতগুলোতে ঈদের কেনাকাটায় ব্যাপক ভিড় লক্ষ করা গেছে। মোহাম্মদপুর-শ্যামলী, মিরপুর, নিউমার্কেট-এলিফ্যান্ট রোড, গুলিস্তান-মতিঝিল, মালিবাগ-মৌচাক, রামপুরা, বাড্ডা-নতুনবাজারসহ বিভিন্ন এলাকার ফুটপাতের দোকানগুলোতে প্রতিদিন সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চলছে জমজমাট বেচাকেনা। বিক্রেতাদের মতে, দিন যত যাচ্ছে, ক্রেতাদের ভিড় ও কেনাকাটার পরিমাণ ততই বাড়ছে।
ফুটপাতের দোকানগুলো সাধারণত নিম্ন আয়ের মানুষের প্রধান কেনাকাটার স্থান হলেও, ঈদের সময়ে এখানে নিম্ন-মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত এমনকি উচ্চবিত্তরাও পণ্য কিনতে আসেন। ঈদ উপলক্ষে ফুটপাতের বাজারগুলোতে নজরকাড়া পণ্যের সমারোহ এবং সুলভ মূল্যে ভালো জিনিস পাওয়া যায় বলে এ সময়ে এখানে চোখে পড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য। ক্রেতা-বিক্রেতাদের গলাগলি আর রঙবেরঙের পণ্যের সমাহার ফুটপাতের ঈদ বাজারগুলোকে করে তোলে নগরবাসীর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ফুটপাতের দোকানগুলোতে নানা ডিজাইন ও রঙের পোশাক ও অন্যান্য পণ্যের সমাহার রয়েছে। শার্ট, প্যান্ট, জুতা, সালোয়ার, থ্রি-পিস, কামিজ, পাজামা-পাঞ্জাবি, কসমেটিকস, গেঞ্জি, টুপি থেকে শুরু করে ঘর সাজানোর জিনিসপত্র পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়াও, এক্সপোর্ট কোয়ালিটির বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সামগ্রীও পাওয়া যায়। স্বল্প আয়ের মানুষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণির ক্রেতারা নামিদামি মার্কেটের চেয়ে কম দামে মানসম্মত পণ্য কিনতে পারছেন, যা তাদের যেমন সন্তুষ্ট করছে, তেমনি দোকানিরাও ভালো বিক্রি করে খুশি।
এখানে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে হকারদের নানা হাঁকডাকও শোনা যায়। যেমন, ‘দেইখ্যা লন আড়াইশ, বাইছ্যা লন তিনশ, বুইঝ্যা লন পাঁচশ, একদাম পাঁচশ’Ñ এ ধরনের নানা ডাকে ক্রেতারা আকৃষ্ট হচ্ছেন। মোহাম্মদপুরের শ্যামলী ক্লাবের সামনের ফুটপাত থেকে কেনাকাটা করছিলেন আলামিন হোসেন, যিনি একটি বাড়ির সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে কাজ করেন। তিনি বলেন, এবার ঈদে পরিবার নিয়ে গ্রামে যাব। মা-বাবা ও ভাইয়ের জন্য কিছু কিনছি। বাবা ও ভাইয়ের জন্য শার্ট-লুঙ্গি, মায়ের জন্য শাড়ি কিনেছি। ফুটপাত থেকে ভালো জিনিস কম দামে পাওয়া যায়।
মোহাম্মদপুরের কৃষি মার্কেটের সামনের ফুটপাতে তুহিন নামের এক দারোয়ানের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, অনেক চেষ্টার পর এবার ঈদের ছুটি পেয়েছেন এবং গ্রামের বাড়িতে মা-বাবা, স্ত্রী ও সন্তানের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে যাবেন। এজন্য তিনি পরিবারের জন্য কেনাকাটা করছেন। তুহিন বলেন, আগেও এখান থেকে জিনিস কিনেছেন, যা ভালো ছিল। এবারও ঈদের কেনাকাটা করছেন, কারণ পণ্যের মান ভালো এবং দামও কম। তবে তিনি পরামর্শ দেন, কেনার সময় পণ্য ভালোভাবে দেখে নেওয়া জরুরি।
কৃষি মার্কেটের পাশের শ্যামলী থেকে মোহাম্মদপুরের দিকে আসার রাস্তায় আসলাম নামের এক তরুণ পাঞ্জাবি ও পাজামা বিক্রি করছিলেন। তিনি বলেন, ঈদের এক সপ্তাহ বাকি থাকতেই বিক্রি শুরু হয়ে গেছে এবং বিক্রি ভালো হচ্ছে। তিনি আশা করেন, ঈদ যত কাছে আসবে, বিক্রি তত বাড়বে।
মেহেরপুরের স্টেশনারি ব্যবসায়ী সোহেল রানা রিপন ব্যক্তিগত কাজে ঢাকায় এসেছিলেন। কাজ শেষে ফেরার আগে তিনি নিউমার্কেট ও গাউছিয়ার ফুটপাত থেকে ঈদের কেনাকাটা সেরে নেন। তিনি বলেন, ঢাকায় এলে ফুটপাতের দোকান থেকে কিছু না কিছু কিনে নেন, কারণ এখানে মানসম্মত জিনিস কম দামে পাওয়া যায়। তিনি বালিশের কভার ও বিছানার চাদর কিনেছেন, যা নিউমার্কেট থেকে ১৫০০-১৭০০ টাকায় কিনতে হতো, কিন্তু এখানে মাত্র ১ হাজার টাকায় পেয়েছেন। ঈদের জামা-কাপড়ও তিনি এখান থেকে বা এলিফ্যান্ট রোড থেকে কিনবেন, কারণ ঈদের আগে ঢাকায় আসার সুযোগ হবে না।
রিপন আরও বলেন, শুধু এখানেই নয়, রাজধানীর মিরপুর ও মোহাম্মদপুরের ফুটপাত থেকেও তিনি নিয়মিত জিনিস কিনে থাকেন। এসব ফুটপাতের দোকানে কম দামে মানসম্মত কাপড় পাওয়া যায়, যা ব্যবহার করে তিনি সন্তুষ্ট। তিনি পরিবারের সদস্যদের জন্যও এখান থেকে কাপড় কিনে নেন।
ধানমন্ডি হকার্স মার্কেটের সামনে বিছানার ছাদর ও বালিশের কভার বিক্রেতার সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, মার্কেটের কাপড়ের সঙ্গে ফুটপাতের কাপড়ের মানে তেমন পার্থক্য নেই। তবে ফুটপাতের দোকানগুলোর এসি বা লাইটের খরচ না থাকায় তারা কম দামে পণ্য বিক্রি করতে পারে। একই চিত্র দেখা গেছে রাজধানীর গুলিস্তান, মতিঝিল, মালিবাগ-মৌচাক, রামপুরা, বাড্ডা-নতুনবাজারসহ বিভিন্ন এলাকার ফুটপাতের মার্কেটগুলোতে।
গুলিস্তানে জুতার শোরুমের এক কর্মচারী বলেন, আমাদের আয় কম, তাই বড় মার্কেটে যাওয়া সম্ভব হয় না। ফুটপাতের দোকান থেকে পোশাক কিনি, কারণ এখানে দাম কম এবং ভালো জিনিসও পাওয়া যায়। তিনি আরও জানান, গত দুই-তিন বছর ধরে তিনি ফুটপাতের দোকান থেকে পোশাক কিনছেন এবং পরিবারের জন্যেও এখান থেকে কেনাকাটা করেন।
গুলিস্তানের ফুটপাতের মার্কেটে ঘুরে দেখা যায়, শার্ট, প্যান্ট, টি-শার্ট, পাঞ্জাবি, পায়জামা, শিশুদের পোশাক, লুঙ্গি, থ্রি-পিস, শাড়ি, লেহেঙ্গা, ট্রাউজার, জুতা, বেল্ট, ঘড়ি, মানিব্যাগ, চশমা সবই পাওয়া যাচ্ছে। কাপড় ব্যবসায়ী আব্দুল মতিন বলেন, আমার দোকানে নতুন কালেকশনের পোশাক রয়েছে, তাই ক্রেতারা ফিরে যায় না। আমি কম দামে পণ্য বিক্রি করি, প্রতি জামায় ৩০-৪০ টাকা লাভ হলেই সন্তুষ্ট।
মজিবুল হক নামের এক ক্রেতা বলেন, এখানে দাম তুলনামূলক কম। ৪০০ টাকায় দুই মেয়ের জন্য দুটি জামা কিনেছি, যা দেখতে সুন্দর। এখন শুধু স্ত্রীর জন্য একটি জামা কিনলেই কেনাকাটা শেষ। যাত্রাবাড়ী থেকে আসা পারভিন আক্তার বলেন, গুলিস্তানে ভালো জিনিস পাওয়া যায়। ছেলের জন্য ৩০০ টাকায় পাঞ্জাবি এবং ২০০-৩০০ টাকার মধ্যে শার্ট-প্যান্ট কিনেছি।
মৌচাক-মালিবাগ ও রাজধানীর অন্যান্য এলাকার ব্যবসায়ীরা জানান, এবার কম বাজেটে ক্রেতাদের পছন্দের বাহারি নকশা ও রঙের পোশাক রাখা হয়েছে। তাদের দোকানে নিম্ন আয়ের পাশাপাশি মধ্যবিত্তরাও বেশি কেনাকাটা করতে আসছেন।