হাসনাত শাহীন
প্রকাশ : ০৭ মার্চ ২০২৫ ২০:৫৪ পিএম
আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২৫ ২০:৫৫ পিএম
শুরু হয়েছে রমজান মাস, চলছে রোজা। রোজা শেষেই অনুষ্ঠিত হবে মুসলমান সম্প্রদায়ের সবচেয়ে ধর্মীয় উৎসব ‘ঈদুল ফিতর’। এ ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে গণমানুষের পরিধেয় এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় নতুন সামগ্রীর পসরা সাজিয়ে বসেছে রাজধানীর নিউমার্কেট ও তার সংলগ্ন খোলা দোকান এবং ছোট-বড় বিভিন্ন মার্কেটের বিভিন্ন ধরনের দোকানগুলো।
আর বসবেই বা না কেন, এ এলাকায় যে ঢাকা শহরের বাসিন্দাদের একটা বৃহৎ অংশই ঈদের কেনাকাটা তো বটেই; সারা বছরই কেনাকাট করেন। এর বড় কারণ হলোÑ এ অঞ্চলের মার্কেটগুলোতে যে একই সঙ্গে নারী-পুরুষ-শিশুদের সাশ্রয়ী মূল্যের পোশাক এবং জুতা-স্যান্ডেল থেকে শুরু করে ঘর-গৃস্থালির প্রায় সকল সামগ্রী পাওয়া যায়।
শুক্রবার (৭ মার্চ) দুপুরের পরে এ অঞ্চলের নিউমার্কেট ও তার সংলগ্ন খোলা দোকান, নুরজাহান সুপার মার্কেট, গাউছিয়া, চাঁদনী চক, এলিফ্যান্ড রোডের বিভিন্ন ব্র্যান্ড এবং ব্র্যান্ডবিহীন মার্কেটগুলো ঘুরেও দেখা গেল সেই চিত্র। পুরো এলাকা জুড়েই হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি; ভিড়। এই ভিড় ঠেলে এলিফ্যান্ট রোডের সাইন্সল্যাব মোড়ের একটা মার্কেটের ইভা গার্মেন্টেসের এক বিক্রয়কর্মীর কাছে এর কারণ জিজ্ঞেস করতেই তিনি উত্তর দিলেনÑ এমনিতেই সারা বছর এ অঞ্চলে দুপুরের পরে একটু ভিড় জমে। এখন তো ঈদের মার্কেট শুরু হয়ে গেছে; তাতে আবার আজ শুক্রবার- ভিড় তো হবেই। আর, ঈদ যত এগিয়ে আসবে এখানে ততোই বাড়তে থাকবে ক্রেতার সংখ্যা। যে কারণে প্রতিবছরই ট্র্যাফিক জ্যাম ও বাজারের ভিড় এড়াতে রমজানের শুরুর দিকেই ঈদের আমেজ চলে আসে দোকানগুলোতে। চাঁদরাত পর্যন্ত চলে ক্রেতা-বিক্রেতার দর-দাম।
আপনাদের এখানে কি কি সামগ্রী বিক্রি করছেন, দাম কেমনÑ এমন প্রশ্নের উতরে তিনি বলেন, আমাদের এখানে মূলত বিভিন্ন বয়সী মানুষের কাতান, সুতি, সিল্কসহ বিভিন্ন রকমের পাঞ্জাবীর সমাহারই বেশি। দাম গতবারের মতোই আছে। বেশি বাড়েনি।
একই সুরে কথা বললেন, রূপসী বাংলা নামের পাঞ্জাবীর দোকানের এক কর্মকর্তাও। তারা এবার ঈদকে কেন্দ্র করে সুতি পাঞ্জাবী, কাতান ও কাতান সিল্ক (ইন্ডিয়ান) পাঞ্জাবীই বেশি রেখেছি। দাম আগের মতোই আছে। তিনি জানান, আমাদের এখানে বিভিন্ন রকমের সুতি পাঞ্জাবীর দাম পড়বে ১ হাজার থেকে শুরু করে ১ হাজার ৮৫০টাকা পর্যন্ত। আর কাতান ও কাতান সিল্কের পাঞ্জাবীগুলোর দাম পড়বে ২ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকার মধ্যে।
তাদের সঙ্গে কথা বলা শেষে নিউমার্কেটে যাওয়ার পথে দেখা মেলে- আলপনা প্লাজা, নুরজাহান সুপার মার্কেট, গ্লোবমার্কেটসহ বিভিন্ন মার্কেটের সামনের ফুটপাতসহ রাস্তার ওপর বসেছে অস্থায়ী সব কাপড়ের দোকান। পাজামা, শার্ট-প্যান্ট, টি-শার্ট, হিজাব, নারীদের ওয়ান পিসসহ নানান রকমের কাপড় বিক্রি হচ্ছে সেখানে। কেউ কেউ তার পণ্যের দাম ধরে ধরে হাঁকডাক দিচ্ছে। এমনই আলপনা প্লাজার সামনের ফুটপাতে মোহাম্মদ রুবেল নামের পাজামা বিক্রিকারী প্রতিদিনের বাংলাদেশ’কে জানান, তিনি পাঞ্জাবীর সঙ্গে পরার পাজামা বিক্রি করছেন। তার কাছে থাকা পাজামার দাম ২৫০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০০ টাকা পর্যন্ত।
তার ঠিক পাশের জন রিফাত বলেন, তার দোকানের পাজামাগুলোর দামও ২৫০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০০ টাকার মধ্যে। এই অঞ্চলের সব ফুটপাতের দোকানগুলোর দামই প্রায় একই রকম।
তাদের সঙ্গে কথা বলা শেষ করে নিউমার্কেটের দিকে যেতে যেতে যতরকমের দোকান দেখা গেছে তার মধ্যে পাঞ্জাবী ও শার্টের দোকানে দেখা যায় ক্রেতাদের বেশি আনাগোনা। ঈদের নামাজের জন্য নতুন পাঞ্জাবী আর কাছের মানুষের জন্যে ঈদের উপহার কিনতে এসেছেন অনেকেই। এদিন অন্যান্য সামগ্রীর বাজারে ক্রেতাদের উপস্থিতি ছিলো তুলনামূলক বেশ কম।
এসব দেখতে দেখতে ইফতারের আগে আগে নিউ মার্কেটে প্রবেশ করে দেখা মেলে ভিন্ন রকমের চিত্র। সেখানে যেন পা ফেলবার জায়গা নাই। তবু ভিড় ঠেলে নিউমার্কেটের ২ নম্বর গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে দেখা যায়- প্রায় সব ধরণের দোকানেই ভিড়। স্বাভাবিক কারণেই ভিষণ ব্যস্ত দোকানগুলোর বিক্রমকর্মী থেকে শুরু করে কর্মকর্তারা। তাদের সঙ্গে ‘প্রতিদিনের বাংলাদেশ’ পত্রিকার হয়ে কথা বলতে চাইলে- তারা সবিনয়ে জানান- ভাই; এই সময়ে কথা বলার সময় নাই। দুপুরের আগে আগে আসলে কথা বলা যাবে। কালকে আসেন।
এমনই পরিবেশের নিউমার্কেটে ঘুরতে ঘুরতে দেখা হয়- স্বপ্নীল স্বপন নামের নিউমার্কেট ও এর সংলগ্ন বিভিন্ন মার্কেটের নিয়মিত এক ক্রেতার সঙ্গে। তিনি জানান, আমি সারা বছরই কিছু না কিছু কিনি। সারাবছরই ক্রেতা সমাগম থাকে এসব মার্কেটে। তবে ঈদ, পূজাসহ অন্য উৎসব-অনুষ্ঠান কেন্দ্র করে হাজারো ক্রেতায় মুখরিত থাকে পুরো নিউমার্কেট এলাকা। ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকা থেকে পছন্দের পোশাকসহ অন্য জিনিসপত্র কিনতে এসব মার্কেটে আসেন ক্রেতারা। উৎসব কেন্দ্র করে ক্রেতা-বিক্রেতাদের ব্যস্ততায় জমজমাট থাকে নিউমার্কেট এলাকা।
তিনি জানান, প্রতিমাসের সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে এলাকায় কেনাকাটা করতে ঢু-মারি। আজ অফিস নেই; তাই এসেছি। পছন্দ হলেই কিনে নেব। কারণ, ঈদের আগে এখানে কেনাকাটা করা কঠিন হয়। এখনকার চেয়ে সে সময়গুলোতে অনেক ভিড় থাকে; দেখে-শুনে পছন্দ করে জিনিস নেওয়াটা কঠিন হয়ে পড়ে। সেই ভিড় এড়াতে এখন এসেছি। তিনি জানান, আজ যদি নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে না পারি দুই একদিনের মধ্যেই কিনে নিবো। শেষের দিকে মার্কেটে আসবো না; কারণ সে সময়ে অতিরিক্ত লোকসমাগমের কারণে অনেক ভোগান্তির সৃষ্টি হয় এই এলাকায়। সড়কে তীব্র যানজটের পাশাপাশি মার্কেটগুলোতে অপরাধমূলক কাজকর্ম বেড়ে যায়। এর মধ্যে চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা বেশি ঘটে।
নিউমার্কেটে কাপড় কিনতে আসা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বেসরকারী চাকরিজীবী বলেন, ঈদের আগে কেনাকাটা করা বেশ ঝামেলার। অনেক ভিড় থাকে। আজ ছুটির দিন, এজন্য এসেছি।
রাজধানীর মোহাম্মপুর থেকে পরিবারসহ কেনাকাটা করতে এসেছেন আমানুর রহমান। তিনি বলেন, ঈদের আগে এ এলাকার মার্কেটে অনেকে ভিড় থাকে। গতবার ঈদের আগে কেনাকাটা করতে এসে খুব ঝামেলায় পড়তে হয়েছিল। তাই এবার আগেই মার্কেটে এসেছি।
নিউমার্কেটের দোকানগুলোতে ক্রেতা সমাগমের পাশাপাশি রাস্তায় ফুটপাতে থাকা দোকানেও ক্রেতাদের ভিড় দেখা গেছে। মার্কেটের তুলনায় ফুটপাতের দোকানে জিনিসপত্রের দাম কম থাকায় এখানে অনেকেই কেনাকাটা সারছেন।
আফিয়া মিম নামের এক ক্রেতা বলেন, ফুটপাতে দাম একটু কম থাকে। তাই এখান থেকে কিছু জিনিসপত্র কিনেছি। একটু বেছে কিনতে পারলে এখানকার জিনিসও বেশ ভালো হয়।
নিউমার্কেট ছাড়াও নিউ সুপার মার্কেট, চন্দ্রিমা সুপার মার্কেট, গ্লোব শপিং কমপ্লেক্স, নুরজাহান মার্কেট, ধানমন্ডি হকার্স মার্কেটসহ আশপাশের মার্কেটগুলোতেও ক্রেতাদের ভিড় দেখা গেছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, এদিকে গত কয়েক দিন ধরেই ঈদের কেনাকাটা করতে ঢাকা ও আশপাশের এলাকা থেকে বিভিন্ন বয়সী মানুষ আসছেন। এখনও পুরোদমে বিক্রি না হলেও ভালো বিক্রি হচ্ছে। আশা করি ঈদ যত এগিয়ে আসবে তত বিক্রি বাড়বে। এবং অন্যান্যবারের এবারের বেচাবিক্রি ভালো হবে।