সরেজমিন : পঙ্গু হাসপাতাল
ফারহানা বহ্নি
প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০২৪ ১৫:৫৮ পিএম
পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মো. আরফান আলী। প্রবা ফটো
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে দায়িত্ব পালন করছিলেন ট্রাফিক ইন্সপেক্টর মো. আরফান আলী। সেদিন ২০ জুলাই, উত্তপ্ত হয়ে আছে পুরো শহর। থেমে থেমে সংঘর্ষ চলছে বিভিন্ন স্থানে। হঠাৎ কয়েকজন এসে মারধর করতে শুরু করে আরফানকে। লুট করে নেয় তার মানিব্যাগ, মোবাইল ফোন আর ঘড়ি। তবে লুট করেই ক্ষান্ত হয়নি তারা। রাজপথে লুটিয়ে পড়ার পরও মারধর করা হচ্ছিল তাকে।
জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেদিন দায়িত্ব পালন করতে সকালেই পল্লবীতে চলে এসেছিলেন আরফান আলী। যারা তাকে মারধর করছিল, তারা শিক্ষার্থী নয় বলেই মনে করেন ভুক্তভোগী এই পুলিশ। তিনি বলেন, ‘‘যারা মারছিল, তারা বেশ বয়সি। প্রায় অচেতন হয়ে পড়েছিলাম। ওই সময় মনে হয় কয়েকজন ছাত্র এলো। কাউকে তখন বলতে শুনলাম, ‘ও তো মরেই গেছে, আর মারিস না।’ একজন ছাত্র আমারে বুকে জড়ায়ে ধইরা কইল, ‘আঙ্কেল, আপনি চিন্তা কইরেন না, আমি আছি। আপনারে যেমনেই হোক আমরা হাসপাতালে নিব।’’
আরফান আলীর সঙ্গে কথা হচ্ছিল রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অর্থোপেডিক হাসপাতালে। বিছানায় শুয়ে সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি জানান, প্রথমে তার মাথায় আঘাত করে হামলাকারীরা। নিজেকে বাঁচাতে মুখের সামনে দুই হাত ধরে রাখলে হাতের ওপর একের পর এক আঘাত করতে থাকে তারা।
আরফান বলেন, ‘মারতে মারতে নিচে ফালাইয়া দিছে। পরে কয়েকজন ছাত্র আমারে কোলে কইরা হসপিটালে নিতে গেলে আবার বাড়ি দিল কেউ। যারা মারছিল, তাদের কারও ইউনিফর্ম ছিল না। অনেক সিনিয়র ছিল। ছাত্ররা লাথিটাথি মারতে পারে, ওইভাবে আক্রমণ করে না। আমার ওপর এমনভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, মনে হয় আমার সাথে দুনিয়ার শত্রুতা। আমরা চাকরি করি। পেটের দায়ে কাজ করি। আমরা তো কিছু করি নাই।’
আরফানই বললেন, আহত রক্তাক্ত তাকে সেখান থেকে বের করে হাসপাতলে নিয়ে যাওয়া ছিল সেই ছাত্র কয়জনের জন্য একটা কঠিন চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, ‘যে কয়জন ছাত্র আমারে হাসপাতালে নিতে গেছিল তাদেরও আটকাইয়া কেউ কেউ বাড়ি দেয়। তারা থামায়, আমারে বুকে আগলায় রাখে। পরে ওখানেই পাশের একটা ক্লিনিকে নিয়ে যায়। ওখানে বলল, উনার অবস্থা খারাপ। পরে ওরা আল হেলাল হাসপাতালে নিয়া গেল। ওইখান থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়া বলল, নিউরোসায়েন্সে নিতে। তারপর এই পঙ্গুতে পাঠাইল আমারে।’ নিজের হাত দেখিয়ে তিনি বারবার বলতে থাকেন, ‘আমারে ছেইচা ছেইচা হাতটারে শেষ করে দিছে। ওই ছেরা আমারে কোলে করে আনছে। নইলে বাঁচতাম না।’
পাশেই ছিলেন আরফানের স্ত্রী হালিমা বেগম। তিনি বলেন, ‘পুলিশের কল্যাণ বিভাগ থেকে কিছু সাহায্য দিছে। ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা চইলা গছে। হাতডা অপারেশন করা লাগবে। বাসায় দুই ছেলে আছে। সুস্থ হইতে সময় লাগবে। তারপর না কাজে যাওয়া। কতটুকু সুস্থ হবে, তা-ও জানি না।’
একই হাসপাতালে শুধু পুলিশ না, আছে শিশু, বৃদ্ধ, মধ্যবয়স্কও। তাদের কেউই কোনো কিছুর সঙ্গে জড়িত না থেকেও আহত হয়ে এসেছেন এখানে। কথা হয় আরেক ভুক্তভোগীর সঙ্গে। তারও হাতের অবস্থা খারাপ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই শিক্ষার্থী বলেন, ‘সেদিন যা দেখছি তা তো ভোলার মতো না। পুলিশরাও ভুগছে, আমরাও ভুগছি।’ এখনও এই শিক্ষার্থীর ডান হাতের আঙুলগুলো কাজ করছে না। অনেকগুলো রাবার বুলেট ভেতরে বিঁধে আছে। হাতে একটা অপারেশন হয়েছে, তবে বুলেট সবগুলো বের করা যায়নি। আবার অপারেশন করতে হবে। এদিকে আঙুলে কোনো অনুভূতি নেই। ঘা শুকাতে সময় লাগবে। তারপর এটার ট্রিটমেন্ট হবে।
সেদিন শুক্রবার মোহাম্মদপুরে নামাজ পড়ে বের হয়ে পথে গুলিবিদ্ধ হন এই শিক্ষার্থী। সেই লোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘নামাজ পড়ে বাসায় যাওয়ার পথে পুলিশের মাঝখানে পড়ে যাই। না দৌড়ে দাঁড়িয়ে পড়ি, পুলিশকে বলি, আমি আন্দোলনকারী না। আমাকে বলল, দৌড়া। তারপর পেছন থেকে আমাকে গুলি করতে থাকল। একঝাঁক গুলি করেছে। সে সময় আরেকটা ছেলে পুলিশের কাছে মাফ চাচ্ছিল। তাকেও গুলি করেছে।’
পলিটেকনিকে পড়াশোনার পাশাপাশি ডেলিভারির কাজ করেন এই শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, ‘সাইকেল চালাতে হয় কাজের জন্য। পার্ট টাইম কাজ করে কিছু টাকা পাই। তা দিয়ে নিজের খরচ চালাই। পরিবারকেও কিছু দেই। এখন হাতটা নিয়ে চিন্তায় আছি। আঙুলগুলো ঠিক না হলে কাজ আর করতে পারব না। যে অবস্থা দেখেছি, তাতে কাউকে চেনা কঠিন। কোথাও পুলিশ মার খায়, কোথাও পুলিশ মারে।’ তবে মানসিকভাবে নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করছেন তিনি।