প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৪ জুলাই ২০২৪ ১৯:২৮ পিএম
আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২৪ ২২:০২ পিএম
গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা বলেন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ইকোসিস্টেমে যে ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে তা মোকাবিলায় সামগ্রিকভাবে কাজ করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত ইকোসিস্টেমকে ঠিক আগের জায়গায় হয়তো নেওয়া যাবে না। তারপরও যতটুকু সম্ভব ফিরিয়ে আনতে হবে। আর এজন্য প্রয়োজন নদীগুলোর প্রাণ ফিরিয়ে আনা। কেননা নদী না থাকলে ইকোসিস্টেম ঠিক থাকবে না।
মুস্তাফিজ শফি, সম্পাদক/ প্রতিদিনের বাংলাদেশ
আমরা সব সময় পরিবেশ-প্রতিবেশ নিয়ে কথা বলছি—কাজ করছি। বাংলাদেশে ইকোসিস্টেম পরিবর্তনে পত্রিকার কাজ শুধু সংবাদ প্রকাশ ও প্রচারেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তার চেয়ে বেশি কিছু। পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে, জলবায়ু পরিবর্তন প্রভাব মোকাবিলা এবং তা পুনরুদ্ধারে আমাদের সামাজিক দায়িত্ব রয়েছে। নদীগুলো আমাদের জীবনের সঙ্গে মিলেমিশে আছে। নদী না থাকলে পরিবেশ কীভাবে রক্ষা পাবে? আমাদের পূর্বপুরুষদের বাড়িঘর ছিল নদীমুখী। এখন নদীকে পেছনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় নীতিগ্রহণে পরিবেশকে মাথায় নিয়ে কাজ করতে হবে। ইকোসিস্টেম রক্ষায় রাজনৈতিক দল ও সরকারকে বাধ্য করতে হবে।
শুধু নদী নয়; সামগ্রিক অর্থে পরিবেশ রক্ষা, মানুষের জীবন রক্ষা, মানবাধিকার রক্ষা, গণতন্ত্রের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা আমাদের অন্যতম লক্ষ্য। সেই অসাম্প্রদায়িক উন্নত বাংলাদেশ কিন্তু কোনোভাবেই পরিবেশকে বিঘ্নিত করে নয়। মানুষের জনজীবন ও অধিকার বিঘ্নিত করে নয়। সেখানেও ইকোসিস্টেম লাগবে। এসব কাজ শুধু পত্রিকার বা গণমাধ্যমের একার পক্ষে সম্ভব নয়। শুধু আন্তর্জাতিক সংস্থার একার পক্ষেও সম্ভব না, বরং এটি সম্মিলিত কাজ। আমরা শুধু এদেশের নয়, বরং ভূপৃষ্ঠের পরিবেশ রক্ষায় কাজ করব।
বাংলাদেশে ইকোসিস্টেম পরিবর্তনে পত্রিকার কাজ শুধু সংবাদ প্রকাশ ও প্রচারেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তার চেয়ে বেশি কিছু। পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে, জলবায়ু পরিবর্তন প্রভাব মোকাবিলা এবং তা পুনরুদ্ধারে আমাদের সামাজিক দায়িত্ব রয়েছে।
পৃথিবীতে যত প্রাণ-প্রকৃতি আছে- সকলের মধ্যে সহাবস্থান ও নিজ নিজ অবস্থানে বসবাস নিশ্চিত করাই হচ্ছে ইকোসিস্টেম। আমরা মানুষের বসবাস ঠিক করলাম, পশুপাখিরটা করলাম না, এটা প্রকৃত ইকোসিস্টেম না। বনায়নের নামে, বৃক্ষরোপণের নামেও আমরা অনেক কিছু ধ্বংস করছি। আমাদের বৃক্ষরোপণ হয়েছে কিন্তু আদর্শ বনায়ন হয়নি। অনেক পশুপাখি হারিয়ে গেছে, গ্রামাঞ্চলেও আর দেখি না। ইকোসিস্টেম ঠিক রাখতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। এজন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও ব্যবহার করা যায়। বিশেষ করে যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক পরিচিতমুখ ও মানুষের মধ্যে প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে, তাদেরকে পরিবেশ আন্দোলনের কাজে লাগানো যেতে পারে।
সামাজিক বনায়নের নামে বৃক্ষরোপণ করে ইকোসিস্টেমকে নষ্ট করা হচ্ছে। এসব বন্ধ করে পরিবেশের সঙ্গে খাপ খায় এমন গাছ রোপণ করতে হবে। পরিবেশ ও জলবায়ুর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের স্বার্থ ঠিক রেখে কাজ করতে হবে। এজন্য ব্যক্তি, পরিবার থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে ঐকমত্য থাকতে হবে। কেননা জনগণ অনেক বেশি শক্তিশালী। কিন্তু তারা সংগঠিত নয় বলে শক্তিটা দেখায় না। আমরা সবাই মিলে ভূখণ্ডটি রক্ষায় কাজ করব।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, পরিচালক/ ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আমরা নির্বিচারে গাছ কেটে ফেলছি, নদী ধ্বংস করছি। বর্তমানে কতগুলো নদী জীবিত আছে, কতগুলো প্রবাহিত হচ্ছে; সে হিসাবও করা দরকার। আমাদের সবকিছু অপরিকল্পিতভাবে হচ্ছে, এগুলো পরিকল্পিতভাবে করতে হবে। পরিবেশ নিয়ে আমাদের আরও ৩০-৪০ বছর আগে থেকে কাজ করার দরকার ছিল। আমাদের মনে রাখতে হবে, পরিবেশদূষণ রোধ করতে পারলে ইকোসিস্টেম ফিরিয়ে আনা যাবে। ঢাকাসহ সারা দেশ পলিথিন ব্যবহার করছে। এতে করে ড্রেনেজ সিস্টেম নষ্ট হচ্ছে, মাটি নষ্ট হচ্ছে। প্লাস্টিকের রিসাইকেল হচ্ছে না। পলিথিন ব্যবহার একবার নিষিদ্ধ করা হয়েছিল কিন্তু কেন আবারও ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হলো, তা নিয়ে আমি প্রশ্ন রাখতে চাই।
সার্বিকভাবে এসব সমস্যা সমাধানে গণমাধ্যম তো আইন করতে পারবে না, তবে লিখতে লিখতে সচেতন করতে পারবে। পত্রিকাগুলো এসব বিষয় নিয়ে আরও বেশি কাজ করতে পারে। এসব আলোচনা এই টেবিলে সীমাবদ্ধ না রেখে জাতীয় পর্যায়ে কাজ করতে হবে।
ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আবু সাদেক, নির্বাহী পরিচালক/ সেন্টার ফর হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ
বিশ্বের তুলনায় কার্বন নিঃসরণে আমরা নগণ্য হলেও আত্মতৃপ্তির কিছু নেই। ২০১৫ সালে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন হিসেবে, ঢাকার তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য ৫৮ শতাংশ দায়ী হচ্ছে ইটভাটা ও উন্নয়নের ময়লা এবং গাড়ির ধোঁয়া।
রাজনৈতিক সদিচ্ছ ছাড়া কিছুই করা যাবে না। কিন্তু প্রান্তিক পর্যায়ে আমরা কাজ করতে পারি। কার্বনের ৫০ শতাংশ ইটভাটা থেকে আসে। অথচ ইটভাটা বন্ধ হচ্ছে না। একটা ইট তৈরিতে ১ কেজি কার্বন নিঃসরণ হয়, ৫ টাকা খরচ হয়। ১৫ বা তার বেশি দামে প্রত্যেকটি ইট বিক্রি হচ্ছে। তাই প্রতিটি ইটে ৫ টাকা করে পরিবেশ কর বসাতে হবে। গ্রামের ৮০ শতাংশ বাড়ি টিনের তৈরি। ইট তৈরিতে টপ সয়েল নষ্ট হচ্ছে। ভারত ফ্লায়েস দিয়ে ইট বানাচ্ছে। আমাদের নদীগুলোয় পলি পড়ছে। আমরা পলি দিয়ে ইটের বিকল্প তৈরি করতে পারি। ইট ১ শতাংশ কৃষি জমি নষ্ট করছে। ত্রিপুরা টস মাটি দিয়ে ইট তৈরি করতে দেয় না। অথচ আমরা তা তৈরি করছি।
ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান বা ড্যাপে ২০ ডেসিমাল জমি কৃষিতে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। যেকোনো সময় এটি অন্যান্য কাজে ব্যবহার হয়ে যাবে। এজন্য এসব জমিতে বনায়ন করতে হবে। শহরের বনাঞ্চল দরকার। দেশে ২৫ বন থাকা দরকার। শহরে দরকার ৩০ শতাংশ। তারপরও গাছ পুড়িয়ে ইট তৈরি করছি। রাজনৈতিক সদিচ্ছ ছাড়া কিছু করা যাবে না। কিন্তু প্রান্তিক পর্যায়ে আমরা কাজ করতে পারি। এক্ষেত্রে সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমকে এগিয়ে আসতে হবে।
ইঞ্জিনিয়ার আসফিয়া সুলতানা, পরিচালক/ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ
ইকোসিস্টেম পুনরুদ্ধারের জন্য কমিউনিটি, রিজিওনাল ও ন্যাশনাল প্ল্যান থাকা দরকার। যুগ যুগ ধরে আমাদের অর্জিত জ্ঞান ও বিভিন্ন সভা-সেমিনারের জ্ঞানগুলোর সঠিক ডকুমেন্টেশন নেই, যা করাটা খুব দরকার। কাজ করার ক্ষেত্রে এসব ডকুমেন্টেশন অ্যাকশন প্ল্যানের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে ইকোসিস্টেমে পরিবর্তন না করে কীভাবে করা যায় তা নিয়ে ভাবার সময় হয়েছে। যেমন নদীতে একটি সেতু করার কারণে পরিবেশের কী ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে তা নিয়ে গবেষণালব্ধ জ্ঞান থাকা দরকার। কেননা এসব প্রকল্প নেওয়ার সময় পর্যবেক্ষণের জন্য বেশি সময় পাওয়া যায় না। আগে থেকেই যদি পরিবেশের অ্যাসেসমেন্ট থাকে তাহলে ইকোসিস্টেমকে পরিবর্তন না করে কীভাবে কাজ করতে হবে তা সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হয়।
এসব ক্ষেত্রে নিজ নিজ অবস্থান থেকে পরিবর্তন আনা জরুরি। রাষ্ট্র তো কাজ করবেই, সেখানে আমাদের ব্যক্তিগত পরিবর্তনটা আগে আনতে হবে। কেননা ইকোসিস্টেম ধ্বংসের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী প্লাস্টিকের ব্যবহার। দৈনন্দিন জীবনে আমরা প্লাস্টিকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি। চা, কফি, পানি পান থেকে শুরু করে জীবনের সব ক্ষেত্রে প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়ে গেছে। এসব থেকে বের হতে হবে। তাছাড়া সমুদ্রের ইকোসিস্টেম রক্ষা করতেও যত্নবান হতে হবে। এই পরিবর্তন স্কুলজীবন থেকে শুরু করতে হবে। কেননা একটা পর্যায়ে এসে মানুষ নিজেকে পরিবর্তন করতে পারে না। এজন্য শিশুকাল থেকে শুরু করতে হবে, শিশুরা শুরু থেকে অভ্যস্ত হয়ে গেলে কাজটা সহজ হয়।
এম জাকির হোসেন খান, প্রধান নির্বাহী/ চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ
টেকসই উন্নয়নকে প্রধান্য না দিলে বাংলাদেশকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে হবে। এজন্য প্রাণ ও প্রকৃতিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়ন অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। কেননা পৃথিবীতে আমরা যা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না বা করা সম্ভবও নয়, তা হচ্ছে প্রকৃতি। প্যারিস চুক্তি হয়েছিল রাষ্ট্র থেকে রাষ্ট্রের মধ্যে। অথচ বিশ্বের মাত্র ৫৭টি কোম্পানি ৮০ শতাংশ কার্বন নিঃসরণ করছে। এরা রাষ্ট্রের চেয়েও শক্তিশালী, এদেরকে ধরা হচ্ছে না।
উত্তরাঞ্চলে মরুকরণ শুরু হয়েছে, সেখানে ধানের উৎপাদন কমছে। ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারে মনোযোগ দিতে হবে। ২০৫০ সালে টেকসই উন্নয়ন চিন্তা করতে হলে ৩০ সালের মধ্যে বনাঞ্চলের পরিমাণ বাড়াতে হবে। সব উন্নয়ন হতে হবে গ্রিন ও টেকসই। সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধিতে সুন্দরবনের যে ক্ষতি হচ্ছে তা মোকাবিলায় বিনিয়োগ করতে হবে।
শেখ রোকন, মহাসচিব/ রিভারাইন পিপল
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদী নষ্ট হচ্ছে, রাস্তাঘাট নষ্ট হচ্ছে। আর আমরা যখন এর সঙ্গে দ্বিমত করছি, তখন আমাদের সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আমাদের নদী ও জলাশয় নষ্ট করে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পাচ্ছে। ইকোসিস্টেম রক্ষা করতে হলে আমাদের নিজেদের স্বভাব ঠিক করতে হবে। বুড়িগঙ্গা নদী হত্যা শুরু হয়েছে আসলামুল হকের পাম্প দিয়ে। সে ১৬ কিলোমিটার নদী ধ্বংস করেছে। বেজা ২০১৬ সালে সেই অর্থনৈতিক অঞ্চলের অনুমতি দিয়েছে। এজন্য নীতিগত প্রশাসনিক ঔদাসীন্যতা দায়ী।
আমরা যে ইকোসিস্টেমের কথা বলছি তা নেদারল্যান্ডস থেকে শিখতে হচ্ছে। অথচ আমাদের পূর্বপুরুষরা হাজার বছর ধরে তা রক্ষা করে যাচ্ছে। সবকিছুতে জলবায়ু পরিবর্তন আনা দরকার নেই। বেজা যেন নদী দখল করে ইকোনমিক জোনের অনুমতি না পায়, আমাদের নদীগুলো ঠিক থাকলে, রীতিমতো প্রবহমান থাকলে ইকোসিস্টেমে কোনো প্রভাব পড়বে না। যে নদী তার বুকের পলি তিল তিল করে জমিয়ে বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছে, তার প্রতিদান দূরে থাকÑ দখলে, দূষণে, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ করে আমরা সেই নদী তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছি। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে, আক্ষরিক অর্থেই জালের মতো ছড়িয়ে থাকা নদীর মধ্যে বেষ্টিত থেকেও নদীর কথা মনে না রাখা। ফলে আমাদের নীতি ও কর্মে নদীর প্রেক্ষিত থাকে অনুপস্থিত। অথচ নদীমাতৃক একটি দেশে সব নীতি, চিন্তা ও তৎপরতার মূলে থাকতে হতো নদী। প্রকৃতপক্ষে কাজ হচ্ছে প্রথমত নদী-নিধন বন্ধ করা। নদী তো পুরোপুরি মরে না, তাকে আধমরা করা হয়।
ড. মোহাম্মদ ইমরান হাসান, হেড অব ক্লাইমেট জাস্টিস অ্যান্ড ন্যাচারাল/ রিসোর্স রাইট, অক্সফাম ইন বাংলাদেশ
জলবায়ু পরিবর্তন এবং এর প্রভাব সম্পর্কে আমরা মোটামুটি সবাই জানি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ পৃথিবীর সপ্তম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ, এই তথ্যটাও অনেক পরিচিত। তবে আমি কিছু তথ্য দিতে চাই, যেমন বিজ্ঞানীরা বৈশ্বিক উষ্ণতার ওপর ভিত্তি করে ইকোলজিক্যাল টিপিং পয়েন্ট (সীমা নির্ধারণ) অনুমান করেছিলেন। দুঃখের বিষয়, অনুমিত যে মাত্রার উষ্ণায়ন হলে ইকোলজিক্যাল টিপিং পয়েন্টে পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছিল, তারও অনেক কম উষ্ণতায় সেই টিপিং পয়েন্টে পৌঁছে গেছে। কোপার নিকাসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এ বছরের শুরুতে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মাত্রা অতিক্রম করেছে। এসব তথ্য জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য চরম হতাশার। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় নানারকম ক্লাইমেট অ্যাকশন বা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে; চর্চা হচ্ছে, দাবিদাওয়া নিয়ে কথা হচ্ছে, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে চর্চা হচ্ছে। তবে আজকের আলোচনার বিষয় অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ইকোসিস্টেম রিস্টোরেশন বা ইকোসিস্টেম পুনরুদ্ধার; সেটি নিয়েই কিছু কথা বলতে চাই।
ইকোসিস্টেম পুনরুদ্ধার অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোজন ও প্রশমনের কাজ করে থাকে। এক্ষেত্রে অক্সফাম অবশ্যই মানবাধিকার এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকারকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার পক্ষপাতী নয়। বরং অক্সফাম বিশ্বাস করে, ইকোসিস্টেম সংরক্ষণ, পুনরুদ্ধারের যে ঔপনিবেশিক চর্চা বিদ্যমান রয়েছে তা থেকে বেরিয়ে না এলে সেটি জলবায়ু ন্যায্যতার পরিপন্থি। মনে রাখতে হবে, যে জনগোষ্ঠী (কৃষক, মজুর, জেলে) বা তাদের পূর্বপুরুষ মোটেও জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী নয়, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার অংশ হিসেবে; পরিবেশ সংরক্ষণ, ইকোসিস্টেম পুনরুদ্ধারের নামে তাদের সম্পদের অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া চরম অন্যায্যতা বা দু-মুখো ছুরির মতো। তাই অক্সফাম মনে করে, জনগণের সঙ্গে আলাপ করে, জনগণকে সঙ্গে নিয়েই ইকোসিস্টেম পুনরুদ্ধার করতে হবে এবং এই পুনরুদ্ধারকৃত ইকোসিস্টেমের ওপর প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সেই ধারাবাহিকতায় অক্সফাম স্থানীয় জনগোষ্ঠী, সরকার ও বেসরকারি সংস্থাকে সঙ্গে নিয়ে ইকোসিস্টেম পুনরুদ্ধারে কাজ করবে।
আসকার ইবনে ফিরোজ, ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফার
টাঙ্গুয়ার হাওর বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ কার্বন নিঃসরণের জায়গা। সেখানে মাছ ও জলজ উদ্ভিদের সংখ্যা কমে গেছে। পরিযায়ী পাখি আসার হার দিন দিন কমছেই। দূষণ আগের থেকে বেড়ে গেছে। ৮-১০ বছর আগে সেখানে যে পরিমাণ বড় মাছ ছিল তা গত ৩-৪ বছরে শেষ হয়ে গেছে। এখন ছোট মাছও অনেক কমে গেছে। দেশে ৭২৩ প্রজাতির পাখি ছিল। ৪ বছর আগে রাজধানীর দিয়াবাড়ী ও পূর্বাচলে দুই শতাধিক পাখির ছবি তোলা গেছে। এখন তা নেই। সেখানে গেলে কান্না আসে। ইকোলজি লসের ক্ষেত্রে শহর অন্যতম। দেশের ১-২ শতাংশ শহর। আমরা শহরের ইকোলজি নিয়ে কতটা মনোযোগী? ঢাকায় ১৯৮৮ সালের বন্যার পরে মিরপুরসহ বিভিন্ন জায়গায় বাঁধ দিয়ে হাউজিং করা হয়েছে। প্রথমে সরকার ও পরে বেসরকারি হাউজিং কোম্পানিগুলো করেছে। এতে জলাধার ধ্বংস করা হয়েছে।
২০২১ সালে আমরা ছবি তোলার জন্য সুন্দরবনে গিয়েছিলাম। সেখানে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের চেয়েও বিরল প্রজাতির এক পাখির দেখা পাই। তা হলো বিরল ও বিপন্ন পাখি সুন্দরী বা গোইলো হাঁস। ২০২০ সালের এক গবেষণায় দেখা বর্তমানে সারা বিশ্বে এই বিপন্ন পাখি আছে মাত্র ১০০ থেকে ৩০০টি। সুন্দরবন এখনও তাদের একটি প্রজননক্ষেত্র। বন উজাড়ের পাশাপাশি বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে ক্ষতি হচ্ছে সুন্দরবনের। প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করা এই বন রক্ষায় আমাদের দ্রুত উদ্যোগী হওয়া দরকার।
মোহাম্মদ এজাজ, চেয়ারম্যান ও নদী গবেষক/ রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার
ইকোলজি লসের হিসাব করলে বলতে হবে বনের ক্ষতি হচ্ছে। নির্বিচারে পাহাড় হত্যা হচ্ছে। হাজার হাজার একর পাহাড় কাটা হচ্ছে। দেশে প্রায় ৫৬টি নদী এখন দূষণের শিকার। নদীর পানির যে রঙ থাকার কথা সেটি আর নেই। গন্ধও বদলে গেছে। কুচকুচে কালো পানি আর গন্ধযুক্ত নদী দেখে বড় হচ্ছে আমাদের নতুন প্রজন্ম। আমাদের শহরগুলোও নানাভাবে নদীগুলোকে খেয়ে ফেলছে। তা ছাড়া বরেন্দ্র অঞ্চলের খরার পেছনে ভূগর্ভস্থ পানি তোলা দায়ী। মানুষ নিজের লাভের দিকে তাকাতে গিয়ে কীভাবে পরিবেশের ক্ষতি করছে তা নিজেও বুঝতে পারছে না। এক্ষেত্রে সচেতনতা তৈরির বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে কমিউনিটির মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে।
সপ্তর্ষী পাল, ক্লাইমেট অ্যাক্টিভিস্ট
বর্তমানে ইকোসিস্টেম নিয়ে কথা বলার কারণ হচ্ছে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। ১০ বছর আগেও আমরা এত কথা বলতাম না। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় আমরা পরিবেশের সঙ্গে বেশি খাপ খাওয়াতে পারি। পরিবেশের ক্ষেত্রে ১০ বছরে যে নেতিবাচক পরিবর্তন হওয়ার কথা ছিল বর্তমানে তা ৫ বছরেই হয়ে যাচ্ছে। আমরা যারা উপকূলে বসবাস করি বারবার জলবায়ুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।
সাখাওয়াত উল্লাহ, স্বেচ্ছাশ্রমে গাছ লাগানোর উদ্যোক্তা
১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ৫ লাখ মানুষ ও লাখ লাখ অন্যান্য প্রাণী মারা গেছে। অথচ এজন্য তারা দায়ী ছিল না। নিঝুম দ্বীপে যে পরিমাণ হরিণ ছিল তা এখন অর্ধেকে নেমে এসেছে। হাতিয়া-সুবর্ণচরের মানুষ জীবনে অন্তত তিনবার নদীভাঙনের শিকার হচ্ছে। দেশীয় প্রজাতির গাছ হারিয়ে যাচ্ছে। বিদেশি প্রজাতির গাছের সংখ্যা বেড়েছে। যেখানে যে গাছ দরকার, সেখানে তা থাকতে হবে। আমাদের বাবলা, নিম, খৈফল গাছ দেখা যাচ্ছে না। বটগাছ কমে গেছে। অথচ বটের ফল পাখি খায়। এতে পাখিদের জীবনচক্র জড়িত। করঞ্জা গাছ, নাগলিঙন, বুদ্ধনারকেল, পারুলগাছ কয়টা আছে? এসব গাছের সংখ্যা বাড়াতে হবে। বর্তমানে লেখায়-সাহিত্যে আমরা কতটা গাছ নিয়ে লিখছি? বইমেলাকে যেভাবে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় প্রচার করে, সেখানে বৃক্ষমেলাকেও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের প্রচার করা দরকার। অথচ বৃক্ষমেলার প্রচার নেই। বিলুপ্ত গাছ সংরক্ষণ করা হচ্ছে না।