প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৮ মে ২০২৪ ২১:২১ পিএম
রাজধানীর এফডিসিতে ব্যাংক একীভূতকরণ নিয়ে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি আয়োজিত ছায়া সংসদ বিতর্ক প্রতিযোগিতায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশ ব্যাংক তার স্বাধীন সত্তা হারিয়ে ফেলেছে। মেরুদণ্ড সোজা রেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারছে না। বাইরে থেকে আরোপিত সিদ্ধান্ত কার্যকর করার প্রতি বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারছে না।
শনিবার (১৮ মে) রাজধানীর এফডিসিতে ব্যাংক একীভূতকরণ নিয়ে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি আয়োজিত ছায়া সংসদ বিতর্ক প্রতিযোগিতায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে নৈরাজ্য এমন পর্যায়ে উপনীত হয়েছে যে, আইএমএফের পরামর্শক্রমে ব্যাংক একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হচ্ছে। তবে যথেষ্ট পূর্বপ্রস্তুতি না থাকায় একীভূতকরণ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। জোর করে ব্যাংক একীভূতকরণ টেকসই হতে পারে না।’
তিনি বলেন, ‘সুশাসনের অভাবে সামগ্রিক অর্থনীতিকে সাপোর্ট দেওয়ার সক্ষমতা ব্যাংকিং সেক্টর হারিয়েছে। জনগণ ব্যাংকিং খাতের ওপর আস্থা হারিয়েছে। ব্যাংকে গচ্ছিত আমানত নিরাপদ রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো নিশ্চয়তা প্রদান করতে পারছে না। ফলে আমানতকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যাদের কারণে ব্যাংকিং খাতে রক্তক্ষরণ হচ্ছে, তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে। ব্যাংকের খেলাপি ঋণের সঠিক তথ্য জনগণ জানতে পারছে না।’
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ। তিনি বলেন, ‘ঋণ জালিয়াতি, ঋণখেলাপি, অর্থ পাচার বাংলাদেশের আর্থিক খাতের সবচেয়ে বড় কালো দাগ। ব্যাংকের টাকা মেরে দিয়ে ব্যক্তিবিশেষের আরাম-আয়েশ, ভোগবিলাস দেশের অর্থনীতিতে ক্যানসারের আকার ধারণ করেছে। আর্থিক খাতের এই ক্যানসারের চিকিৎসা না করে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সবল বা ভালো ব্যাংকের সঙ্গে একীভূতকরণ কার্যক্রম শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর সুফল পাওয়া যাবে কি না তা বুঝতে আমাদের আরও কিছু দিন অপেক্ষা করতে হবে।’
কিরণ আরও বলেন, ‘সম্প্রতি সাংবাদিকদের বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রবেশ করতে না দেওয়া নিয়ে সাংবাদিকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। যার ব্যাখ্যা বাংলাদেশ ব্যাংককে দেওয়া উচিত। আমাদের মনে রাখতে হবে সরকারের উন্নয়নে সহায়ক হিসেবে কাজ করে গণমাধ্যম। দেশের আর্থিক খাতের বড় বড় অনিয়মের সংবাদ প্রকাশ করে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছে সাংবাদিকরা। বাজেটকে সামনে রেখে আর্থিক খাতের নানা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে গণমাধ্যমে প্রকাশ করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার নিয়ে যে বাধা রয়েছে তা অচিরেই দূর করা উচিত।’
আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা বজায় রেখে ব্যাংক একীভূতকরণের মাধ্যমে গ্রাহকদের আস্থা ধরে রাখতে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির পক্ষ থেকে ১০ দফা সুপারিশ করা হয়: ১. ব্যাংক থেকে নামে বেনামে আত্মসাৎকৃত অর্থ আদায়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে প্রয়োজনে প্রচলিত আইনের সংস্কার করে অপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা করা। ২. অধিক খাতে জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিশ্চিতে স্বাধীন ব্যাংক কমিশন গঠন করা। ৩. ঋণ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিসহ ঋণখেলাপি ও অর্থ পাচারকারীদের নামের তালিকা জাতীয় সংসদে প্রকাশ করা। ৪. আর্থিক খাতে জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও ঋণখেলাপিদের সকল প্রকার নাগরিক সুবিধা সীমিতকরণ, বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা প্রদান এবং নতুন ঋণ না দেওয়াসহ দুদকের মাধ্যমে তদন্ত করা। ৫. যারা ব্যাংকগুলোকে দুর্বল করে লুটপাট করেছে তাদের বিচারের মুখোমুখি করা। ৬. দুর্বল ব্যাংকগুলোর আমানত গ্রহণ ও বিতরণ ছাড়া অন্যসব কার্যক্রম বন্ধ করে এর ক্ষতির দায় কে নেবে তা স্পষ্ট করা। ৭. বাংলাদেশ ব্যাংকে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রবেশ নিয়ে সাংবাদিকদের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে তা নিরসন করা। ৮. রিজার্ভ চুরির জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে অর্থ প্রাপ্তির পরিমাণ ও অগ্রগতি সম্পর্কে গণমাধ্যমকে অবহিত করা। ৯. ব্যাংকের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা আলাদা করা। ১০. ব্যাংক একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার সুফল পেতে গণমাধ্যমের নিরপেক্ষ ভূমিকা নিশ্চিত করা।