মেসবাহুল হক
প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর ২০২২ ১৬:২৮ পিএম
আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০২২ ১৭:২২ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
করোনা মহামারী এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বের পণ্য বাজার হঠাৎ অস্থির হয়ে ওঠেছে। এ সংকট মোকাবেলায় সরকার খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর উপর জোর দিচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে কৃষি ঋণ বিতরণ বাড়াতে চায় সরকার। তাই রাষ্ট্র মালিকানাধীন বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক- বিকেবির মূলধন তিন গুণেরও বেশি বাড়িয়ে ৫ হাজার কোটি টাকা করা হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সুত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, বর্তমানে ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ দেড় হাজার কোটি টাকা। ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি ও মোট ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের তুলনায় মূলধন কম হওয়ায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা মূলধন বৃদ্ধি করতে চায় ব্যাংকটি। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কাছে চিঠি পাঠিয়ে অনুমোদন চেয়েছে কৃষি ব্যাংক। এরপর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে অর্থ বিভাগে চিঠি দিয়েছে। অর্থ বিভাগ মূলধন বাড়ানোর বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। তবে এখনো চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বিকেবির মূলধন বাড়ানোর বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। চুড়ান্ত অনুমোদনের জন্য এ বিষয়ে একটি সার-সংক্ষেপ তৈরি করা হচ্ছে। সারসংক্ষেপে অর্থমন্ত্রী সম্মতি দিলেই তা বাস্তবায়ন করা হবে।
বিকেবি কর্তৃপক্ষ বলছে, সময়ের পরিক্রমায় ঋণ ও অগ্রিম স্থিতিসহ ব্যাংকের কার্যক্রম বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বহুমাত্রিক প্রসার লাভ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা ও ব্যাসেল-৩ গাইডলাইন অনুযায়ী কৃষি ব্যাংকের মূলধন ৫ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা প্রয়োজন। তাই তারা মূলধন বৃদ্ধির বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ১৯৭২ সালে ২০ কোটি টাকা অনুমোদিত মূলধন ও ১০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। বর্তমানে ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
এমতাবস্থায় কৃষি ও কৃষিভিত্তিক ব্যবসায়িক কর্মকান্ড সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা, অর্থনৈতিক কাঠামো সুদৃঢ়করণ, বৈদেশিক আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে বিনিয়োগ চাহিদা পূরণ, ভবিষ্যৎ ব্যাংকিং চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, ব্যাসেল-৩ গাইডলাইন অনুযায়ী ন্যূনতম মূলধন সংরক্ষণ এবং সার্বিকভাবে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে ব্যাংকের কার্যক্রম সুচারুভাবে করার লক্ষ্যে পরিচালনা পর্ষদের ৭৮তম সভায় মূলধন ৫ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্যাংকটি।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইসমাইল হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ব্যাংকের ভিত্তি শক্ত হওয়ার পাশাপাশি ঋণ-অগ্রিমও বেড়েছে। ভবিষ্যতে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে সুচারুভাবে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য মূলধন বাড়ানোর বিকল্প নেই। এ সিদ্ধান্ত ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে অনুমোদনের পরই আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। ২০২১ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা। ব্যাংকটির মুখ্য কার্যক্রম কৃষিঋণ বিতরণকেন্দ্রিক হওয়ার কথা থাকলেও অন্যান্য ব্যবসাও প্রসার করেছে। শিল্প খাতে বেশি ঋণ দেওয়ার কারণে কমেছে কৃষিঋণ। ২০২১-২২ অর্থবছরে ব্যাংকটির কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ হাজার কোটি টাকা।
মূলধন বৃদ্ধি করার যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা ও ব্যাসেল-৩ গাইডলাইন অনুযায়ী মোট ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের ন্যূনতম ১০ শতাংশ মূলধন সংরক্ষণ করতে হবে। উক্ত গাইডলাইন অনুযায়ী ২০২১ সালের ৩০ জুন আর্থিক বিবরণীতে ব্যাংকের মোট ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের পরিমাণ ২৩ হাজার ৬৯৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ১০ শতাংশের হিসাবে মূলধন প্রয়োজন ২ হাজার ৩৬৯ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।
এদিকে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক সুদ ভর্ভুকি চাইলে তা না দেওয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কৃষিঋণ বিভাগ থেকে এক চিঠি পাঠিয়ে এ বিষয়ে আপত্তি জানানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যুক্তি কম সুদে কৃষিঋণ বিতরণের জন্য বিকেবিকে সুদ ভর্তুকি দেওয়া হলে দেশের অন্যান্য ব্যাংকও এ দাবি করতে পারে। কারণ, অন্যান্য রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও বাজারে প্রচলিত সুদের তুলনায় কম সুদে কৃষিঋণ বিতরণ করে। এ ছাড়া ভর্তুকি থাকলে কৃষি ব্যাংকের সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টাও ব্যাহত হবে।
সম্প্রতি কৃষি ব্যাংক এক আবেদনে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে ১৭৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা সুদ ভর্তুকি দাবি করেছে। ২০২১ সালের ১ এপ্রিল থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে বিতরণ করা ঋণের বিপরীতে এ অর্থ দাবি করা হয়েছে। ব্যাংকটির যুক্তি, প্রত্যন্ত অঞ্চলে কৃষকদের কাছে ঋণ পৌঁছানো এবং বেশি সুদে আমানত সংগ্রহের কারণে তাদের লোকসান হচ্ছে। সরকার কৃষি খাতে অগ্রাধিকার দেওয়ায় বিকেবি ঋণ বিতরণ কমাতে পারছে না। ফলে তাদের সুদ ভর্তুকি দিয়ে সহায়তা না করলে তহবিল ঘাটতি বেড়ে যাবে, যা ঋণ বিতরণ সক্ষমতা কমিয়ে দেবে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, সরকারের অগ্রাধিকার খাত হিসেবে কৃষিঋণের সুদহারে সবসময়ই সীমা বেঁধে দেওয়া থাকে। এ ঊর্ধ্বসীমা বাজারে প্রচলিত সুদহার থেকে সাধারণত ১ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত কম হয়। বাজার পরিস্থিতির পরিবর্তন ও কৃষিঋণের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সুদহার নির্ধারণ করে থাকে। সর্বশেষ ২০২১ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ ব্যাংক কৃষিঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ নির্ধারণ করে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, গত জুন শেষে বিকেবির ঋণস্থিতি ২৭ হাজার ৮৯০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ, যা বিতরণ করা ঋণের ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ। খেলাপি ঋণ বেশি হওয়ায় ব্যাংকটি তাদের তহবিল চাহিদা মেটাতে বেশি সুদে আমানত নিচ্ছে। ফলে কস্ট অব ফান্ড বেশি। এতে মুনাফার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক চিঠিতে বলেছে, বিকেবিকে ২০১৯ ও ২০২০ সালে ১ হাজার কোটি টাকা করে ২ হাজার কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়ন তহবিল দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া কৃষিঋণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখার জন্য গত এপ্রিলে ৫০০ কোটি টাকা ডিমান্ড ঋণ দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া ব্যাংকটির কাছে ২০১৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের পাওনা ২ হাজার ৪৬৯ কোটি টাকা সুদবিহীন ব্লক অ্যাকাউন্টে রেখে পরিশোধের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ২০৩২ সাল পর্যন্ত কিস্তিতে এ টাকা পরিশোধ করতে পারবে। এসব সুবিধা দেওয়ার পর ব্যাংকটিকে সুদ ভর্তুকি দেওয়ার কোন প্রয়োজনীয়তা আছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে না।
স্বাধীনতার পর দেশের কৃষি খাতের উন্নয়নে সরকার বিকেবি প্রতিষ্ঠা করলেও লক্ষ্য থেকে সরে এসেছে ব্যাংকটি। অনিয়ম ও দুর্নীতি, সরকারের ওপর অত্যধিক নির্ভরশীলতা, কৃষিঋণের সুদের হার কম ও তহবিল পরিচালন ব্যয় বেশি হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে বিশেষায়িত এই ব্যাংকটির অবস্থা খুব ভাল নয়। মূলধন ঘাটতি পূরণে ২০১৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৬৫০ কোটি টাকা দিয়েছে সরকার।
কৃষি ব্যাংকের সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘কৃষি ব্যাংকের ভঙ্গুর পরিস্থিতি পুরোনো। বাংলাদেশ ব্যাংকও কয়েকবার মূলধন সহায়তা দিয়েছে। মূলধন বৃদ্ধিতে সরকার সিদ্ধান্ত নিতেই পারে। তবে ব্যাংকটির পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, কৃষির নামে অনেক বড় ঋণ দেওয়া হয়েছে, যেগুলো পরে খেলাপি হয়ে গেছে। যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত গ্রাহককে ঋণ দেওয়া হয়নি। আবার কৃষকের ঋণে মধ্যস্বত্বভোগী ঢুকে পড়েছে। এসব ক্ষেত্রে আরো সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন সাবেক এ গভর্নর।
প্রবা/আরএম