শ্রমিক আন্দোলন
এম আর মাসফি
প্রকাশ : ১০ নভেম্বর ২০২৩ ০৯:২১ এএম
আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০২৩ ১১:২০ এএম
দেশের উত্তপ্ত রাজনৈতিক অবস্থার মধ্যেই মজুরি বাড়ানোর দাবিতে গত মাসে আন্দোলনে নামেন দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকরা। কয়েকদিনের টানা অস্থিরতার পর শ্রমিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পোশাক কারখানা মালিক এবং শ্রমিক প্রতিনিধিদের নিয়ে মঙ্গলবার সচিবালয়ে এক জরুরি সভা করেন শ্রম প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান। সেখানে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি সাড়ে ১২ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়, যা ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হবে বলে জানানো হয়। তবে এই মজুরি কাঠামো মেনে না নিয়ে শ্রমিকরা আন্দোলনের পথ বেছে নিয়েছেন। ফলে গতকাল বৃহস্পতিবারও সাভারের আশুলিয়ায় ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিক অসন্তোষের জেরে বেশকিছু কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।
যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আগের তুলনায় বেতন বেড়েছে ৫৬ শতাংশ। তারপরও আশানুরূপ বেতন বাড়েনি দাবি করে আন্দোলন করছেন পোশাক শ্রমিকরা। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, সর্বনিম্ন মজুরি বাড়লেও যেসব ক্ষেত্রে যথাযথ বাড়েনি, সেটা নিয়ে আলোচনার সুযোগ রয়েছে। কোনো ক্ষেত্রে যাতে বৈষম্য না হয়, তাই সব পক্ষকে বসে চূড়ান্ত মজুরি নির্ধারণের পরামর্শ দিয়েছেন তারা। তবে কারখানা মালিকরা জানিয়েছেন, চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটকালে কারখানা বন্ধ থাকলে তার ক্ষতি সবার ওপরই পড়বে। এ অচলাবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে তা দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কেননা পোশাক খাত অনেকাংশে দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রেখেছে। তাই এ শিল্প খাতকে সচল রাখার জন্য সবার সহযোগিতা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন তারা। অর্থনীতি বিশ্লেষকরাও বলছেন, শুধু বেতন বাড়ালেই তো হবে না, শিল্পের অবস্থাও দেখতে হবে। তাদের মতে, পোশাক শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া মানে দেশের ক্ষতি। বিষয়টি মাথায় রেখে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হবে, সবাইকেই জয়ী করতে হবে।
মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি বিবেচনা করে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ঠিক করতে গত এপ্রিলে নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে সরকার। গত ২২ অক্টোবর পোশাক শিল্পে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ২০ হাজার ৩৯৩ টাকা প্রস্তাব করা হলেও মালিকরা ১০ হাজার ৪০০ টাকা দিতে সম্মত হন। মালিকদের সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে পোশাকশ্রমিকরা ২৩ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি জানান। তবে সিপিডি ও বেসরকারি সংস্থা ক্রিশ্চিয়ান এইড এক সংলাপে পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১৭ হাজার ৫৬৮ টাকা করার প্রস্তাব দেয়।
শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি সাড়ে ১২ হাজার টাকা নির্ধারণ করার পরও কেন শ্রমিকরা আন্দোলন করছেন জানতে চাইলে বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বেতন বাড়ানো হলেও এর মধ্যে শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে। সর্বনিম্ন বেতন সাড়ে ৪ হাজার টাকা বাড়লেও বেতন বাড়েনি মধ্যম লেভেলে। গার্মেন্টসগুলোতে ৮০ শতাংশ শ্রমিকই অপারেটর, তাদের বেতন বেড়েছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা। একজন যে নতুন কাজে যোগ দেবে, তার বেতন যদি সাড়ে ১২ হাজার টাকা হয় আর যে পাঁচ বছর ধরে কাজ করছে, তার বেতন যদি ১৪ হাজার হয়, তাহলে তো আন্দোলন চলবে। তারাই মূলত আন্দোলন করছে। এই সমস্যার সমাধান জরুরি।’
শ্রমিক নেতার বক্তব্যের প্রেক্ষিতে জানতে চাইলে পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘যারা বলছে ১ হাজার ৫০০ টাকা বেতন বেড়েছে, এটা ঠিক নয়। তারা না জেনেই শ্রমিকদের বিভ্রান্ত করছে, উস্কানি দিচ্ছে। চূড়ান্ত মজুরি নির্ধারণ হলেই দেখা যাবে বেতন কত টাকা বাড়ল। এখানে সবাই সুযোগ নিচ্ছে। কারখানা বন্ধ হলে তো সবারই ক্ষতি। আমরা চাই কারখানা চলুক। শ্রমিকরা কাজে ফিরুক। আমরা সবকিছু সমাধানের চেষ্টা করছি।’
পোশাকশ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি সাড়ে ১২ হাজার টাকা করার বিষয়ে জানতে চাইলে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘যে বেতন ধরা হয়েছে, সেটা নতুন যে শ্রমিক কাজে যুক্ত হবে তার জন্য। যে বেতন বেড়েছে, সেটা খুব একটা খারাপ না। গত পাঁচ বছরের যে মূল্যস্ফীতি হয়েছে, তার চেয়ে বেশি বেড়েছে মজুরি। আর শুধু বেতন বাড়ালেই তো হবে না, শিল্পের অবস্থাও দেখতে হবে। বেতন বাড়িয়ে দিয়ে আবার কারখানা বন্ধ না হয়ে যায়। এটাই যাতে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয়, সেটাই দেখা দরকার।’
তবে শ্রমিকরা কাজে ফিরে না গিয়ে আন্দোলন চলমান রাখাকে অন্য গোষ্ঠীর ইন্ধন বা ফায়দা লুটার হাতিয়ার বলে সন্দেহ পোষণ করেছেন মজুরি বোর্ডে শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি বাংলাদেশ জাতীয় গার্মেন্টস কর্মচারী ফেডারেশনের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রনি। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমাদের শ্রমিকরা এই বেতন বাড়াতে খুশি, তারা এসে আমাদের মিষ্টি খাওয়াচ্ছে। একটা পক্ষ এটাকে পুঁজি করে ফায়দা লুটতে চাচ্ছে। কারা এখানে বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে, তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তৈরি পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নিয়ে তামাশা চলছে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের। গতকাল বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান বলেন, বর্তমান বাজারব্যবস্থায় প্রস্তাবিত ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা কিছুই না। তিনি তৈরি পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনে আবারও সমর্থন জানান। সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, শ্রমিকদের বেতন বাড়িয়ে দিন অথবা নিত্যপণ্যের দাম কমান।
এক অনুষ্ঠানে মজুরি ঘোষণার পরও কেন আন্দোলন চলছে, তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও মজুরি বোর্ডে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘মজুরি বৃদ্ধিতে মালিকপক্ষের প্রস্তাব ছিল ১০ হাজার ৪০০ টাকা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে মানবিক বিবেচনায় মালিকেরা সাড়ে ১২ হাজার টাকাও মেনে নিয়েছেন। যে মজুরি ধরা হয়েছে, এটাও মালিকপক্ষের জন্য কঠিন হবে। কিন্তু মজুরি ঘোষণার পরও কেন আন্দোলন চলছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের উচিত হবে কারও উস্কানির ফাঁদে পা না দিয়ে কারখানা রক্ষা করা, কাজে ফিরে যাওয়া।’
তবে শ্রমিকদের মজুরির বিষয়ে এখনও আরও খোলামেলা আলোচনার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার ড. গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এখানে আরও খোলামেলা আলোচনার সুযোগ রয়েছে। এখনও যেহেতু চূড়ান্ত মজুরি নির্ধারণ হয়নি। যেহেতু খসড়া প্রস্তাবনা আকারে রয়েছে। আমার মনে হয় যেটি মজুরি বোর্ড থেকে প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে, এটি নিয়ে বিস্তারিত পর্যায়ে শ্রমিকপক্ষ-মালিকপক্ষ এমনকি মজুরি বোর্ডের পক্ষ থেকে আরও আলাপ-আলোচনা করে আরও যেসব জায়গায় পরিমার্জনের সুযোগ রয়েছে, সেখানে পরিমার্জনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।’
জানা যায়, প্রথম মজুরি বোর্ড গঠনের পর ১৯৯৪ সালে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৯৩০ টাকা করা হয়। তারপর ১২ বছর পর করা হয় ১ হাজার ৬৬২ টাকা। ২০১০ সালে করা হয় ৩ হাজার টাকা। এর তিন বছর পার হতেই ২০১৩ সালে ৫ হাজার ৩০০ টাকা বেতন নির্ধারণ করা হয়। এরপর ২০১৮ সালে আবার ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয় ৮ হাজার টাকা। এবার সাড়ে ৪ হাজার টাকা বাড়িয়ে সাড়ে ১২ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।