মেরিনা লাভলী, রংপুর
প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১১:০৫ এএম
আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১৬:০৩ পিএম
পানগাছ পরিচর্যায় ব্যস্ত এক কৃষক। প্রবা ফটো
‘কাঁঠাল বাড়ির কাঁচা গুয়্যা, উলিপুরের পান/যুগীপাড়ার দমদমা চুন, গাল ভরেয়া খান, বিয়্যাই খায়্যা যাও’ রংপুর অঞ্চলের ভাওয়াইয়া গানে আতিথেয়তার অবিচ্ছেদ্য অংশ পানের গুরুত্ব ফুটে উঠেছে খ ম সম্রাট আলীর গানে। উত্তরের পুরোনো এ সংস্কৃতি এখনও বিরাজমান থাকায় পানের কদর কমেনি। তাই ধানের দেশে পানের চাষ বেড়েছে দ্বিগুণ হারে। এতে করে পাট, তামাকের সঙ্গে সম্প্রতি পান রংপুর অঞ্চলের অর্থকরী ফসলের অংশ হয়েছে।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, রংপুর কৃষি অঞ্চল তথা রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারী জেলায় ধান, পাট, আলু, ভুট্টা, তামাকের আবাদ নিয়ে কৃষক ব্যস্ত থাকত। সে সুযোগে এক যুগ আগেও রংপুরের হাট-বাজার দখল করে ছিল পটুয়াখালীর মহেশখালীর পান। বর্তমানে রংপুর কৃষি অঞ্চলে প্রায় ৫০০ হেক্টর জমি পান চাষের আওতায় এসেছে। হেক্টরপ্রতি গড় উৎপাদন প্রায় ৭ দশমিক ৩৯ মেট্রিক টন। ফলে রংপুর কৃষি অঞ্চলে পানের উৎপাদন সাড়ে তিন হাজার মেট্রিক টন ছাড়িয়েছে। ২০১৯ সালে রংপুরে ৭৩ হেক্টর জমিতে পানের বরজ ছিল, ২০২৩ সালে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১৩৮ হেক্টরে। রংপুরের সবচেয়ে বেশি পান উৎপাদন হচ্ছে পীরগঞ্জ উপজেলার পাঁচগাছি ইউনিয়নে। এ ছাড়াও রংপুর সদর, বদরগঞ্জসহ জেলার আট উপজেলাতেই পানের উৎপাদন বেড়েই চলেছে।
পান চাষের জন্য বিখ্যাত হয়েছে রংপুর সদর উপজেলার পানবাজার গ্রাম। একসময় এ গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ পান চাষের ওপর নির্ভরশীল ছিল। পানবাজার গ্রামটি থেকেই পানের চাষ ছড়িয়েছে পার্শ্ববর্তী তারাগঞ্জ উপজেলা ও সদর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে।
পানবাজারের পানচাষি হারেশ মিয়া বলেন, ‘আগে ধান, পাট, আলু চাষ করেই দিন পার করতাম। এখন আবহাওয়ার ওপর ভরসা নেই। ঝড়-বন্যার পানিতে ধান নষ্ট হয়ে যায়, আলুতে ব্লাইড ধরে। ফসলের ন্যায্য দাম পাওয়া যায় না। ২৫ শতক জমিতে ৭৫ হাজার টাকা খরচ করে পানের বরজ করেছি। প্রতি তিন থেকে চার মাস পর বরজ থেকে পানের পাতা তুলে বিক্রি করি। এতে করে প্রতিবছর খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ৮০ হাজার টাকা আয় হচ্ছে। পানের দাম সারা বছরই ভালো থাকে। ঝুঁকি কম, খাটুনি কম, আয়ও বেশি।’
একই এলাকার জগো চন্দ্র, কৈলাশ, ছত্র রায় বলেন, ‘পানোত ভালো টাকা পাওয়া যায়। সেই জন্তে হামরা পান আবাদ করি। পাইকাররা হামার সাতে যোগাযোগ করি বরজ থ্যাকি পান নিয়া যায়। ওমরা অমপুর-অমপুরের বাহিরোত পান পাঠায়।’
এলাকার সুচন্দা রাণী বলেন, ‘পান ছাড়া তো কারোই এক সইন্ধ্যা চলে না। ভাত খাবার পর, বাড়িত আত্মীয়-স্বজন আসলে পান তো লাগবেই।’
পীরগঞ্জের পাঁচগাছি ইউনিয়নের জাহাঙ্গীরাবাদের পানচাষি সুব্রত চন্দ্র, সুরেশ রায়সহ অন্যান্যরা বলেন, ‘ধান, পাট, আলু চার মাস পরিশ্রম করে তারপর একবার ফসল ঘরে তোলা যায়। অপরদিকে পান পাতা সারা বছরই বিক্রি করে টাকা আসে। একবার পানের বরজ গড়ে তোলা হলে তা প্রায় এক যুগ ধরে টিকে থাকে। ফলে একবার পানে বিনিয়োগ করলে এক যুগ ধরে এর ফসল ভোগ করা যায়।’
একই এলাকার হরিশ চন্দ্র জানান, ৪০ শতক জমিতে সেচ, সার, বরজ মেরামত করতে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা খরচ হয়। তিন কিস্তিতে এ জমির পান বিক্রি করে বছরে প্রায় ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা আয় করা যায়। সিজনভেদে পানের দাম ওঠানামা করলেও শ্রমিক খরচ কম থাকায় পান চাষে লাভ বেশি।
পাঁচগাছি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বাবলু মিয়া বলেন, ‘আমার ইউনিয়নের এনায়েতপুর, জাহাঙ্গীরাবাদ, নাসিরাবাদ, পানেয়া গ্রামের অনেক চাষি এখন পান চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষকদের পান চাষে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।’
কৃষি সম্প্রসারণ রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক আফতাব হোসেন বলেন, ‘অন্য ফসলের তুলনায় লাভ বেশি হওয়ায় রংপুর অঞ্চলে পান চাষে কৃষকের আগ্রহ বেড়েছে। প্রতি একর পানের বরজ থেকে বছরে খরচ বাদ দিয়ে কৃষকরা প্রায় ৫ লাখ টাকা আয় করতে পারছেন। বর্তমানে পান চাষের আওতা বেড়েছে। দেশে পানের চাহিদা ও বাজার দুটোই ভালো।’