জয়নাল আবেদীন
প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১৪:২৮ পিএম
ব্যাংক খাতে ক্রমেই বাড়ছে অনলাইন নির্ভরতা। কাগজ কলমের ঝুট ঝামেলাবিহীন এক নতুন যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে ব্যাংক। তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়নে অনেকটাই বাস্তবায়ন হয়েছে লেনদেন কার্যক্রম ডিজিটাল করার উদ্যোগ। তবে কিছু কাজ এখনো বাকি।
ইতিমধ্যেই ডিজিটাল ব্যাংক স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। লাইসেন্স পেতে আবেদনও করেছে ৫২ টি প্রতিষ্ঠান। এই মুহূর্তে প্রশ্ন উঠেছে চলমান ব্যাংকিং কার্যক্রমে কেমন প্রভাব ফেলবে এই ডিজিটাল ব্যাংক।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রান্তিক পর্যায়ের জনগনকে ব্যাংক নেটওয়ার্কের মধ্যে নিয়ে আসার জন্যই মূলত এ উদ্যোগ। আমাদের দেশে অনেক মানুষ আছেন যাদের ছোট আকারের ঋণের প্রয়োজন। কিন্তু কাগুজে ঝামেলার জন্য তারা ব্যাংকে যেতে চাননা। তবে এই জনগোষ্ঠীর অনেকেই স্মার্ট ফোন ব্যবহার করেন। তারা বিকাশ, নগট বা রকেট একাউন্ট পরিচালনা করেন। কাগুজে ঝামেলা ছাড়াই যদি এই জনগোষ্ঠীকে ব্যাংক সেবা দেওয়া যায় তাহলে এ খাতের পরিসর বাড়বে। তেমনি বর্তমান বা কনভেনশনাল ব্যাংকের কোনো ক্ষতি হবেনা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে ৩১টি ব্যাংক। জুন শেষে এই ব্যাংকগুলোতে নিবন্ধিত এজেন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৫১০ কোটি টাকা। যেখানে হিসাব খুলেছেন ১ কোটি ৯৮ লাখ ৫২ হাজার ২৪০জন। এসব একাউন্টে জমা হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৬২ কোটি টাকার আমানত। আর ঋণ বিতরণ হয়েছে ১৩ হাজার ৪২ কোটি টাকার।
অন্যদিকে পুরোপুরি অনলাইননির্ভর মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০ কোটি ৭২ লাখ ৬৯ হাজার।
আর ২০২৩ সালের জুন শেষে লেনদেনের অঙ্ক এক লাখ ৩২ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ শাখাভিত্তিক লেনদেনের চেয়ে অনলাইনভিত্তিক লেনদেনের আগ্রহ অনেকগুণ বেশি। প্রশ্ন হলো- ভবিষ্যতে যে ডিজিটাল ব্যাংক আসতে যাচ্ছে এর ফলে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের পরিসর ছোট হয়ে আসবে কি না?
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মেজবাউল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এখন কনভেনশনাল বা প্রচলিত ব্যাংকের মাধ্যমে স্বল্প পরিমাণ ঋণ বিতরণের সংখ্যা খুবই কম। যেসব গ্রাহক প্রযুক্তি সম্পর্কে ভালো জ্ঞান রাখেন তারা সরাসরি ব্যাংকে না গিয়ে ডিজিটাল ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারেন। এক্ষেত্রে চলমান ব্যাংকিং কার্যক্রমে তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না। বরং যেসব গ্রাহক ব্যাংকের ঝামেলা এড়ানোর জন্য এতোদিন ঋণ নিতেন না। তারাও এখন ডিজিটাল ব্যাংকে সাহজে মোবাইলের মাধ্যমে ঋণ নিতে পারবেন।’
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম আর এফ হোসেইন বলেন, ‘ডিজিটাল ব্যাংকের কারণে কনভেনশনাল ব্যাংকে কোনো প্রভাব পড়বে বলে মনে করি না। বরং অধিক মানুষ ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের আওতায় আসবে। কারণ মার্কেট অনেক বড়। ডিজিটাল ব্যাংকের উদ্যোগটা দেশ ও অর্থনীতির জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে। ব্যাংকগুলো যদি তাদের সক্ষমতা বাড়াতে পারে তাহলে এখানে ভালো ব্যবসা করা সম্ভব।’
মোবাইল ব্যাংকিং
২০২৩ সালের জুন মাস শেষে গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০ কোটি ৭২ লাখ ৬৯ হাজার। তবে মে মাসে এমএফএসে নিবন্ধিত গ্রাহক সংখ্যা ছিল ২০ কোটি ৩৯ লাখ ৭০ হাজার। জুন শেষে লেনদেনের অঙ্ক এক লাখ ৩২ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এদিকে ‘নগদ’-এর মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় রয়েছে সাড়ে ৬ কোটির বেশি গ্রাহক। এ হিসাব যোগ করলে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে নিবন্ধিত গ্রাহক সংখ্যা সাড়ে ২৭ কোটি ছাড়াবে। এর কারণ অনেক গ্রাহক একাধিক সিম ব্যবহার করছেন। লেনদেনের সুবিধার্থে একাধিক সিমে হিসাব খুলছেন গ্রাহকরা।
এসব নিবন্ধিত হিসাবের মধ্যে পুরুষ গ্রাহক ১১ কোটি ৯৮ লাখ ৭৪ হাজার ২৯৬ ও নারী গ্রাহক ৮ কোটি ৬৮ লাখ ৪১ হাজার ৭৬৬ জন। এছাড়া মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫ লাখ ৮৫ হাজার ৭২২টি, যা মে মাসে ছিল ১৫ লাখ ৭০ হাজার ৩৪০টি। ডিসেম্বরে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে পাঠানো হয়েছে ৩৩ হাজার ৯২৩ কোটি টাকা। আর উত্তোলন করা হয়েছে ৩৭ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা। এমএফএস সেবায় ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি হিসাবে ৩৩ হাজার ৯২৩ কোটি টাকা লেনদেন হয়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বেতন-ভাতা বাবদ বিতরণ হয় পাঁচ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা। বিভিন্ন কেনাকাটায় লেনদেন হয় ছয় হাজার ৪৯৪ কোটি টাকা।