প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২৩ ১৯:৪৯ পিএম
প্রবা ফটো
২০২২-২৩ অর্থবছরের কোনো মাসেই বেসরকারি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি ব্যাংক খাত। কারণ চলতি অর্থবছরের জন্য বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ। কিন্তু এ খাতের প্রবৃদ্ধিতে লক্ষ করা যাচ্ছে ধারাবাহিক পতন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ১১ দশমিক ১০ শতাংশে নেমেছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিভিন্ন সংকটে দেশে উৎপাদন কমেছে। বিনিয়োগের জায়গা সংকুচিত হওয়ার কারণে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রয়োজনেও ভাটা পড়েছে। করোনাপরবর্তী সময়ে ঋণের চাহিদা আস্তে আস্তে বাড়তে শুরু করে। নতুন করে বিনিয়োগ করছেন ব্যবসায়ীরা। তা ছাড়া ডলারের দাম বাড়ার কারণে বেশি ঋণের প্রয়োজন হচ্ছে। এতে নভেম্বরে কিছুটা বেড়েছিল বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকটসহ নানা কারণে প্রবৃদ্ধিতে আবারও পতন দেখা দেয়, যা এখনও চলমান।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের মে মাসে ১৪ লাখ ৭০ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে বেসরকারি খাতে। ফলে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ঋণের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ১০ শতাংশ। আগের মাস এপ্রিলে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ।
আর্থিক সংকটের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। এসবের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশেও। বিশেষ করে ডলার সংকট বেশ ভোগাচ্ছে বাংলাদেশকে। এ সংকট সমাধানে সরকার রিজার্ভ থেকে ডলার সরবরাহ করছে। এতে রিজার্ভের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। গত ৬ জুলাই আকুর বিল পরিশোধের পর দেশের রিজার্ভের পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ২৯ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মানদণ্ডে হিসাব করলে রিজার্ভের পরিমাণ আরও কমে দাঁড়াবে ২৩ বিলিয়ন ডলারের ঘরে।
সাধারণভাবে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি দুই অঙ্কের ঘরে থাকে। তবে ২০১৯ সালের নভেম্বরে প্রথমবারের মতো তা নেমে যায় ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশে। করোনাভাইরাসের প্রভাব শুরুর পর ঋণ প্রবৃদ্ধি ব্যাপক হারে কমে গিয়ে ২০২০ সালের মে মাসের শেষে নামে ৭ দশমিক ৫৫ শতাংশে। তবে পরের মাস জুন থেকে তা অল্প অল্প বাড়তে থাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশ ব্যাংকের করা প্রাক্কলনের চেয়েও কম। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে ঘোষিত মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ। এর আগের অর্থবছর ২০২১-২২-এ প্রাক্কলন করেছিল ১৪ দশমিক ৮০ শতাংশ। যদিও প্রাক্কলিত হারের চেয়ে লক্ষ্যমাত্রার অর্জন ছিল অনেক কম।
এদিকে অর্থের প্রয়োজনীয়তা মেটাতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বিশাল অঙ্কের ঋণ নিয়েছে সরকার। অর্থবছরের শুরু থেকেই এই ধারাবাহিকতা লক্ষ করা যাচ্ছে। কারণ তারল্য সংকটের কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সরকারকে তেমন একটা ঋণ দিতে পারছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ১ লাখ ২৪ হাজার ১২৩ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। আগের অর্থবছরে সরকার নিয়েছিল ৩১ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা।
ব্যাংকারদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বাজারে টাকা ছাড়ার ফলে নোটের পরিমাণ বাড়ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ১ টাকা বাজারে ছাড়লে তা ৫ গুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে। মার্চে ভোক্তা মূল্যসূচক ৭ মাসে সর্বোচ্চ বেড়ে ৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ হওয়ায় এপ্রিলে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৯ দশমিক ২৪ শতাংশে নেমে আসে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে যা ছিল ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ। গত বছরের মে মাসে রিজার্ভ ছিল ৪২ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার। তা ২৮ শতাংশ কমে গত মাসে ৩০ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। ডলারের দর বৃদ্ধি, আমদানি-রপ্তানি, বাজারে পণ্য সংকট, মূল্যস্ফীতি ও টাকার সরবরাহ সবই একটি অন্যটির সঙ্গে সম্পর্কিত।
এসব বিষয়ে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া মানে বাজারে টাকা ছাড়া, যা মুদ্রাস্ফীতি ও লেনদেন ভারসাম্যের (বিওপি) ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। অর্থায়ন কমে যায় বেসরকারি খাতে। ফলে কমে যেতে পারে নতুন কর্মসংস্থান। জনগণের হাতে অতিরিক্ত অর্থ থাকলে পণ্যের চাহিদা তৈরি হবে, যা দাম বৃদ্ধি করবে। বাজারে বিপুল পরিমাণ অর্থ ছাড়লে তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন আইএমএফের সাবেক এই কর্মকর্তা। অর্থের প্রচলন বেড়ে গেলে পণ্য ও পরিষেবার চাহিদা বেড়ে যায়, যার ফলে আমদানিও বাড়ে।