চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৬ জুন ২০২৩ ১৭:০৮ পিএম
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাটগুলোতে আম নিয়ে হাজির হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। প্রবা ফটো
অনলাইনে আম বিক্রিতে ঝুঁকছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের অসংখ্য যুবক। তবে অনলাইনে বেশি পরিমাণে বেচাকেনা হওয়ায় হাট-বাজারে আমের ক্রেতা কমেছে। উত্তরাঞ্চলের জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জে অর্থকরী ফসল আম। হাতে গোনা কয়েক মাসের আম ব্যবসায় নির্ভর করে এখানকার বাসিন্দাদের বছরের বাকিটা সময়। কয়েক বছর ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পেজ খুলে আম বিক্রি করছেন জেলার বেকার যুবকরা। এ তালিকায় নাম আছে অনেক গৃহবধূরও। কয়েক মাসের জন্য অনলাইনে আম বেচাকেনা হলেও পরবর্তীতে এই মাধ্যমের সাহায্যেই অন্য কোনো খাদ্যদ্রব্য বিক্রি করছেন তারা। অনলাইনে আম বেচাকেনার সঙ্গে যুক্ত থাকা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বলছেন, তারা প্রতিদিন কয়েক হাজার মেট্রিক টন আম বেচাকেনা করছেন।
জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা নুর-ই-জান্নাত এক মেয়েকে নিয়ে আম বিক্রি করছেন কয়েক বছর ধরে। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘শতরুপা’ নামে একটি ফেসবুক পেজ খুলে আম বেচাকেনা করেন। গত বছর মা-মেয়ে অনলাইনে আম বিক্রি করেছেন ৮০০ মণেরও বেশি।
নুর-ই-জান্নাত প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘গত মাসের ২৪ তারিখ থেকে গোপালভোগ আম দিয়ে অনলাইনে আম বিক্রি শুরু করেছি। বর্তমানে খিরসাপাত ৮৫ টাকা ও ল্যাংড়া ৭০ টাকা কেজি দরে আম বিক্রি করছি আমরা। আমাদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী প্রতিদিন ৪৫০ কেজি থেকে ৫০০ কেজি পর্যন্ত আমের অর্ডার আসে, আবার কোনো কোনো দিন বেশিও অর্ডার হয়।’
তার ভাষ্যমতে, আগামীতে আম্রপালি, বিশেষ একধরনের গুটি, বারি-৪, ফজলি আম বিক্রি করবেন। এ ছাড়াও আমের পাশাপাশি তারা বছরজুড়ে এই অনলাইন পেজের মাধ্যমে কয়েক পদের আমের আচার, আমসত্ত্বসহ আরও অন্যান্য পণ্য বিক্রি করেন তিনি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার বাসিন্দা অনার্স পড়ুয়া সাব্বির হোসেন তিন বছর ধরে অনলাইনে আম বেচাকেনায় জড়িত। তারা গত বছর কয়েক দিনের ব্যবধানে সাড়ে ৪০০ মণ আম বিক্রি করেছেন। এতে তার বাণিজ্য হয়েছে আনুমানিক ৯ লাখ টাকারও বেশি। গোপালভোগ আম বিক্রির মধ্য দিয়ে চলতি বছর অনলাইনে আম বেচাকেনা শুরু করেছেন তিনি।
সাব্বির প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘লেখাপড়ার পাশাপাশি ফেসবুকে পিওর প্রিমিয়াম পেজ খুলে অনলাইনে আম বেচাকেনার শুরু করেছি। এখন পর্যন্ত ২৫০ মণেরও বেশি আম বিক্রি করেছি। আমার এ বছর সাড়ে ৭০০ মণ আম অনলাইনের মাধ্যমে বেচাকেনার লক্ষ্য আছে। এতে প্রায় ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকার বাণিজ্য হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’
দেশের বৃহত্তম আমবাজার কানসাটে আম বিক্রি করতে আসা বাগান মালিক ও চাষিরা বলছেন আড়তদাররা আম কিনছেন না। আড়তদাররা কেন আম কিনছেন না, এই প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদ সাহেব আলী নামে এক আড়তদার বলেন, অনলাইনে আম বিক্রি হওয়ার কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানের বাজারগুলোতে আমের চাহিদা কমে গেছে। এখন চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে অনেকে আম বিক্রি করছেন অনলাইনে। যারা অনলাইনে আমের বেচাকেনা করছেন তাদের জন্যই পুনোনো পত্রিকা, ক্যারেট, গাড়ি ভাড়া সব বেড়ে গেছে। অনলাইনে যারা ব্যবসা করছেন তারা বেশি দামে আম বিক্রি করছেন।
কানসাটের আড়তদার সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক টিপু বলেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় এ বছর অনলাইনে বেশি পরিমাণে আম বিক্রি হচ্ছে। অনলাইনে যারা আম বিক্রি করছেন, তারা সবাই বাগান থেকে আম কিনে বিক্রি করেন। ফলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি কাঙ্ক্ষিত দাম পেয়ে লাভবান হচ্ছেন আম চাষি ও বাগানিরা।
অনলাইনে বেশি পরিমাণে আম বিক্রি হওয়ায় কিছুটা হলেও আড়তদাররা ক্ষতিগ্রস্ত বলে জানান জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় খাতা-কলমে ২৪০ জন অনলাইনে আম বিক্রি করছেন। তবে গত বছর অনেকেই অনলাইনের মাধ্যমে আম বিক্রি করে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দিচ্ছেন।
তিনি বলেন, জেলায় যেসব শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতীরা অনলাইনে আম বেচাকেনার সঙ্গে জড়িত তাদের অধিকাংশের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। তারা যেন কৃষিপণ্য বিক্রির লাইসেন্স করে আম বিক্রি করেন। কিন্তু তারা আমাদের কথায় কর্ণপাত না করেই আম বিক্রি করে যাচ্ছেন। আগামীতে তাদের সবাইকে কৃষিপণ্য বিক্রির লাইসেন্সের আওতায় আনার জন্য সব কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন।
অনলাইনে আম বিক্রি করা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সরকারি অ্যাপ ‘সদাই’-এর মাধ্যমে আম বেচাকেনার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে বলেও জানান কৃষি বিপণন কর্মকর্তা।
আমের রাজধানীখ্যাত এ জেলায় এবার ৩৭ হাজার ৮৫৫ হেক্টর জমিতে আমের চাষাবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ লাখ ২৫ হাজার মেট্রিক টন। এবার আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক পলাশ সরকার।