জাহিদুল ইসলাম
প্রকাশ : ২২ মে ২০২৩ ১৪:২৬ পিএম
প্রবা ফটো
রিটার্ন জমার স্লিপ বা প্রাপ্তি স্বীকারপত্র পেতে দুই হাজার টাকা কর দিতে হবে। আর কর অফিস থেকে রিটার্ন জমার স্লিপ না নিলে ৩৮ ধরনের সরকারি-বেসরকারি সেবা পাওয়া যাবে না। এমনকি ২০২৩-২৪ অর্থবছর থেকে শূন্য রিটার্ন জমা (করযোগ্য আয় না দেখিয়ে রিটার্ন জমা) দিলেও দুই হাজার টাকা আয়কর দিতে হবে। কর আদায় বাড়াতে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। যদিও এমন সিদ্ধান্ততে অযেৌক্তিক বলছেন বিশ্লেষকরা।
বর্তমানে ব্যক্তি শ্রেণির করদাতার ক্ষেত্রে পুরুষ করদাতার বার্ষিক আয় তিন লাখ টাকা, মহিলা অথবা ৬৫ বছরের বেশি পুরুষ করদাতার ক্ষেত্রে সাড়ে তিন লাখ টাকা, প্রতিবন্ধী করদাতার ক্ষেত্রে সাড়ে চার লাখ টাকা, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার বার্ষিক আয় ৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করমুক্ত। এ সীমার নিচে আয় থাকলে করদাতা এতদিন শুধু শূন্য আয় দেখিয়ে রিটার্ন জমা দিতে পারতেন, এক্ষেত্রে কোনো কর দিতে হতো না। বার্ষিক আয় করসীমার ওপর এক টাকার বেশি আয় থাকলেও তাকে ন্যূনতম আয়কর দিতে হয়। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় অবস্থিত করদাতার ন্যূনতম করের হার পাঁচ হাজার টাকা। অন্যান্য সিটি করপোরেশন এলাকায় অবস্থিত করদাতার ন্যূনতম করের হার চার হাজার টাকা। সিটি করপোরেশন ছাড়া অন্যান্য এলাকায় অবস্থিত করদাতার ন্যূনতম করের হার তিন হাজার টাকা।
আগামী বাজেটে কোনো ব্যক্তি শূন্য আয় দেখিয়ে রিটার্ন জমা দিলে স্লিপ পেতে ন্যূনতম দুই হাজার টাকা কর দিতে হবে। অন্যদিকে আয় ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করলে নির্ধারিত হারে আয়কর দিতে হবে।
উদাহরণস্বরূপ, একজন গৃহিণীর ১০ লাখ টাকা সঞ্চয়পত্র আছে। কিন্তু তার করযোগ্য আয় নেই। দুই বছর আগে ব্যাংকে টিআইএন দিয়ে সঞ্চয়পত্র কিনেছিলেন। চলতি অর্থবছরে টিআইএনের পরিবর্তে ব্যাংকে রিটার্ন জমার স্লিপ বাধ্যতামূলক করা হয়। স্লিপ না দিলে সঞ্চয়পত্রের সুদ আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ হারে উৎসে কর কাটার বিধান রয়েছে। আর স্লিপ জমা দিলে ১০ শতাংশ উৎসে কর কাটা হয়। বাড়তি উৎসে কর কাটার হাত থেকে বাঁচতে চলতি অর্থবছর ওই গৃহিণী শূন্য রিটার্ন জমা দিয়ে রিটার্ন জমার স্লিপ নিয়েছেন। কিন্তু আগামী অর্থবছর থেকে শূন্য রিটার্ন জমা দিলেও স্লিপ পেতে হলে দুই হাজার টাকা আয়কর দিতে হবে।
বর্তমানে ৩৮টি সরকারি-বেসরকারি সেবা পেতে রিটার্ন জমার স্লিপ বাধ্যতামূলক। এগুলো হলোÑ পাঁচ লাখ টাকার বেশি ব্যাংকঋণ নিতে চাইলে, কোম্পানি পরিচালক পদ পেতে, আমদানি-রপ্তানি সনদ, ব্যবসা শুরুর ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণ ও নবায়নকালে, সমবায় সমিতির লাইসেন্স নিতে, বীমা কোম্পানির সার্ভেয়ার হিসেবে নিবন্ধন পেতে, ১০ লাখ টাকার বেশি মূল্যের জমি-ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রিকালে, ক্রেডিট কার্ড নিতে, পেশাজীবী সংগঠনের (চিকিৎসক, দন্ত চিকিৎসক, আইনজীবী, হিসাববিদ, কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট, ইঞ্জিনিয়ার, স্থপতি, সার্ভেয়ার) সদস্যপদ পেতে, কাজি সনদ গ্রহণ করতে, বাণিজ্য সংগঠনের সদস্য পেতে, ড্রাগ লাইসেন্স, ফায়ার লাইসেন্স, পরিবেশ ছাড়পত্র ও বিএসটিআইয়ের সনদ পেতে, বাণিজ্যিক ও শিল্পে ব্যবহৃত গ্যাস সংযোগ অথবা সিটি করপোরেশন এলাকায় আবাসিক গ্যাস সংযোগ পেতে, নৌযানের সার্ভে সনদ নিতে, ইটভাঁটা চালু করতে, বিদ্যুৎ সংযোগ নিতে, কোম্পানির এজেন্সি বা ডিস্ট্রিবিউটরশিপ পেতে, আগ্নেয়াস্ত্র সনদ পেতে, আমদানির এলসি খুলতে, পাঁচ লাখ টাকার বেশি ডাকঘর সঞ্চয়পত্র ও পাঁচ লাখ টাকার বেশি অন্য সঞ্চয়পত্র কিনতে, ব্যাংক হিসাব খুলতে, উপজেলা, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে চাইলে, যৌথ মালিকানাধীন ব্যবসায়িক অংশীদার হলে, বীমা কোম্পানির এজেন্সি সনদ নবায়ন করতে, মোটরসাইকেল ও সিএনজি ছাড়া অন্য যানবাহনের মালিকানা পরিবর্তন বা ফিটনেস নবায়নকালে, বিদেশি অনুদান গ্রহণকারী এনজিও বা ক্ষুদ্র ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানের সনদ গ্রহণ করতে, আমদানি-রপ্তানি পণ্যের বিল অব এন্ট্রি জমা দিতে, অভিজাত ক্লাবের সদস্যপদ গ্রহণ করতে, বাড়ির নকশা অনুমোদন করতে চাইলে, সরকারি-বেসরকারি দরপত্র জমা দিতে, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন-ভাতা গ্রহণকালে, ১৬ হাজার টাকার বেশি মূল বেতনভোগী সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন তুলতে রিটার্ন জমার স্লিপ লাগবে।
আগামী বাজেটে এর সঙ্গে আরও কয়েকটি সেবা যুক্ত হচ্ছে। আগে শুধু টিআইএন দিয়ে এসব সেবা নেয়া যেত। চলতি ২০২২-২৩ বাজেটে টিআইএনের পরিবর্তে রিটার্ন জমার স্লিপ বাধ্যতামূলক করে এনবিআর।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আমি যদি রিটার্ন জমা দিয়ে থাকি, সেটা পাওয়ার অধিকার আমার আছে। এজন্য আলাদা করে টাকা দেওয়ার প্রয়োজন থাকা উচিত নয়। আবার ওই প্রমাণটা নেওয়ার জন্য পাঁচ হাজার টাকা ঘুষও দিতে হবে। এটা কে রোধ করবে? বর্তমান সিস্টেমে তো এটা হয়েই আসছে।
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, এটা না করে একটি ওয়েবসাইটের মধ্যেই রাখা যেতে পারে দেখার জন্য কে রিটার্ন দিয়েছে। সরকারি ওয়েবসাইট হবে এবং সরকারিভাবেই এ তথ্য থাকবে, যাতে প্রয়োজনে ভেরিভাই করা যায় ব্যক্তির টিআইএন নাম্বার এবং এনআইডি নাম্বার। ওয়েবসাইটে থাকলেই তো ভেরিফাই হয়ে যায়। যেকোনো সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানই দেখে নিতে পারবে এবং এটা সত্যায়িত। কাগজ তো বানিয়েও নেওয়া যায় এবং এটা হবেই। এ জিনিসগুলো সরকারের ভাবা উচিত। ওয়েবসাইটে থাকলে কোনো সার্টিফিকেট নেওয়ার জন্য দৌড়াদৌড়ি করার দরকার হবে না।
তিনি আরও বলেন, এটা কোনো প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান নয়। এজন্য টাকা নেওয়া উচিত হবে না। এটা পাওয়ার অধিকার সবারই আছে। চাইলে এটা দিতে সরকার বাধ্য।