সাইফুল ইসলাম, রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ)
প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৩ ১৩:৩৬ পিএম
আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২৩ ১৩:৫৪ পিএম
ঈদে জামদানি শাড়ি বিক্রিতে ব্যস্ত বিক্রেতারা। প্রবা ফটো
ঈদ সামনে রেখে ব্যস্ত সময় পার করছেন রূপগঞ্জের জামদানিপল্লীর কারিগর ও ব্যবসায়ীরা। এ বছর জামদানিপল্লীতে সরাসরি ক্রেতা এসে এবং অনলাইনে শাড়ি বিক্রির পরিমাণ বেড়েছে। ই-কমার্স ও সরাসরি শাড়ি কিনতে আসা ক্রেতাদের সমন্বয়ে এই ঈদে প্রায় ৫০ কোটি টাকার শাড়ি বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন ব্যবসায়ীরা।
এ ছাড়া প্রায় ১০ কোটি টাকার জামদানি ভারত, ভুটান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে রপ্তাানি হচ্ছে বলে জানান তাঁতিরা। এতে আয় হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। জামদানি শাড়ির বিভিন্ন রকম ডিজাইন হয়ে থাকে। তার মধ্যে অন্যতম পান্না হাজার, তেরছা, পানসি, ময়ূরপঙ্খী, বটতপাতা, করলা, জাল, বুটিদার, জলপাড়, দুবলী, ডুরিয়া, বলিহার, কটিহার, কলকাপাড়সহ জামদানির ইত্যাদি ডিজাইন বেশ জনপ্রিয়।
খটখট শব্দে মুখরিত এখন রূপগঞ্জের জামদানিপল্লী। তাঁতিদের যেন দম ফেলার সুযোগ নেই। নানা ডিজাইনে মনের মাধুরী মিশিয়ে তাঁতিরা তৈরি করছেন জামদানি শাড়ি। এদিকে জামদানিপল্লীর ভেতরে দোকানগুলোতে পাইকারি ও খুচরা ক্রেতাদের ভিড় ছিল বেশ লক্ষণীয়। জামদানিপল্লীর ভেতরে প্রায় ৩০টি জামদানি বিক্রির শোরুম রয়েছে। এখানেই পাইকারি ও খুচরা ক্রেতারা নিজেদের পছন্দমতো বিভিন্ন ধরনের নান্দনিক ডিজাইনের জামদানি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। আগে তাঁতিরা শুধু জামদানি শাড়ি তৈরি করলেও বতর্মানে জামদানি দিয়ে পাঞ্জাবি, থ্রি-পিস, টু-পিস ও বাচ্চাদের বিভিন্ন ধরনের পোশাক তৈরি করা হয়। এতে জামদানির জনপ্রিয়তা দিন দিন আরও বাড়ছে। তবে জামদানিপল্লীর পরিবেশ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন ক্রেতারা। রাস্তাঘাটের বেহাল দশা, ঘিঞ্জি পরিবেশ জামদানিপল্লীর সৌন্দর্য অনেকটাই ম্লান করেছে বলে দাবি ক্রেতাদের।
তাঁতিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুই-তিন বছর বেশকিছু প্রতিবন্ধকতা থাকলেও এ বছর তাদের জামদানি বিক্রি খুব ভালো হচ্ছে। সরাসরি পাইকারি ও খুচরা ক্রেতারা তাদের কাছ থেকে শাড়ি নিয়ে যাচ্ছে। এতে করে তারা দামও ভালো পাচ্ছে। এদিকে সরাসরি ক্রেতার পাশাপাশি তারা ই-কমার্স ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে জামদানি শাড়ি বিক্রির নতুন বাজার হিসেবে ব্যবহার করছে। এই দুই মাধ্যম মিলিয়ে তাদের এবারের ঈদে প্রায় ৫০ কোটি টাকার শাড়ি বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
জামদানি শাড়ির আধুনিকায়ন ও তাঁতিদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে জামদানিপল্লীতেও আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। বর্তমানে পল্লীর তাঁতি ও দোকান মালিকদের প্রায় সবারই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পেজ রয়েছে। ঈদকে সামনে রেখে সেই পেজের মাধ্যমেই তারা শাড়ি বিক্রি করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ই-কমার্সে বেশ সাড়াও পাচ্ছেন তাঁতিরা।
দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পাইকারদের পাশাপাশি তারা নিজেদের তৈরি শাড়ি বিক্রি করছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও ই-কমার্সে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের প্রোফাইল তৈরি অথবা পেজ খুলে নিজেদের তৈরি শাড়ির ছবি আপলোড করে মূল্য লিখে দিচ্ছেন। যাদের পছন্দ হচ্ছে অগ্রিম কিছু টাকা দিয়ে শাড়ি হাতে পাওয়ার পর বাকি টাকা দিচ্ছেন। তাঁতিরা জানান, তারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শাড়ির অর্ডার পান। শাড়িগুলো বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে যাচ্ছে। ধরন অনুযায়ী শাড়ি দুই হাজার থেকে শুরু করে এক লাখ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে।
পল্লীর বিসমিল্লাহ জামদানির মালিক আসিফ জানান, গত কয়েক বছর জামদানির বাজার খারাপ গেলেও এ বছর বাজার বেশ চাঙ্গা। ফলে বিক্রিও বেড়েছে। আগে শাড়ি বিক্রি করে তাঁতিদের মজুরি দিতে তিনি হিমশিম খেতেন। কিন্তু বর্তমানে বেশ ভালোভাবেই ব্যবসা পরিচালনা করতে পারছেন। দোকানের পাশাপাশি বিসমিল্লাহ জামদানি নামে তার ফেসবুক পেজ রয়েছে। বর্তমানে দোকানে বিক্রি অনেক কমে গেলেও ঈদকে সামনে রেখে অনলাইনে শাড়ি খুব ভালো বিক্রি হচ্ছে। এখন জামদানিপল্লীতে সরাসরি আসার পাশাপাশি অনেকে আবার অনলাইনে শাড়ির অর্ডার দেন। অর্ডার অনুযায়ী কুরিয়ারে পাঠিয়ে দিলে গ্রাহক পণ্য বুঝে পেয়ে টাকা পরিশোধ করেন।
সোহাগ জামদানির মালিক সোহাগ জানান, তার বাবা নজরুল ইসলাম গত ২০ বছর ধরে জামদানির সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন। জামদানিপল্লীতে তার বাবার দোকানও রয়েছে। তিনি সরকারি মুড়াপাড়া কলেজে স্নাতক শ্রেণিতে পড়াশোনা করছেন। তিনি পাইকারির পাশাপাশি অনলাইনে জামদানি শাড়ি বিক্রির চিন্তা করেন। তারপর খোলেন সোহাগ জামদানি নামে একটি ফেসবুক পেজ। সেখানে নিয়মিত জামদানি শাড়ির ছবি তুলে আপলোড করতে থাকেন। কয়েক মাস যেতে না যেতেই দোকানের পাশাপাশি অনলাইনেও জামদানি শাড়ি বিক্রি শুরু হয়। ঈদকে সামনে রেখেও পেজে শাড়ির বেশ ভালো বিক্রি হচ্ছে। তার মতো বেশিরভাগই তাঁতিই এখন অনলাইনে জামদানি শাড়ি বিক্রি করে বেশ লাভবান হচ্ছেন।
রূপগঞ্জের জামদানিপল্লী থেকে জামদানি কিনে অনলাইনে বিক্রি করেন সামিরা আক্তার মিতু নামে আইন বিভাগের এক শিক্ষার্থী। কুসুম ফুল জামদানি নামে তার ফেসবুক পেজ রয়েছে। লেখাপড়া শেষ করে চাকরির পাশাপাশি অনলাইনে জামদানির বিক্রি করছেন। এতে সাড়াও পাচ্ছে বেশ। তিনি বলেন, আমি একটি প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করছি। জামদানির প্রতি আমার অনেক আগে থেকে দুর্বলতা ছিল। জামদানির বিভিন্ন ডিজাইন আমাকে মুগ্ধ করত। এ কারণেই অনলাইনে জামদানি ব্যবসা শুরু করি। ঈদকে সামনে রেখে আমার অনলাইনে অনেক ইউনিক ডিজাইনের জামদানি উঠিয়েছি; যা ক্রেতারাও বেশ পছন্দ করছে।