বগুড়া অফিস
প্রকাশ : ১০ এপ্রিল ২০২৩ ১৫:২৯ পিএম
আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০২৩ ১৬:১১ পিএম
বগুড়ার সেমাইপল্লীতে সেমাই তৈরি করছেন নারী শ্রমিকরা। প্রবা ফটো
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও জ্বালানি তেলের সংকটে বগুড়ার কোনো কারখানাই পুরোদমে চালাতে পারছেন না মালিকরা। এর মধ্যে বাজারে সংকটের অজুহাতে বেড়েছে চিনির দাম। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কয়েক দফা বেড়েছে আটা ও ময়দার দাম। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বগুড়ার সেমাইপল্লীতে। ফলে বিগত দিনের তুলনায় উৎপাদন অর্ধেকে নামিয়ে এনেছেন উদ্যোক্তারা।
তাই পবিত্র রমজান ও ঈদ সামনে রেখে এবার অলস সময় পার করছেন বগুড়ার সেমাইপল্লীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। তারা ঈদের চাহিদা বিবেচনা করে সাদা চিকন সেমাই তৈরি করলেও বিক্রি নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
বহু বছর ধরেই শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা ইউনিয়নের বেজোড়া গ্রামে চিকন সাদা সেমাই তৈরি হচ্ছে। স্বাধীনতার পর থেকেই এই গ্রামের কয়েকটি পরিবার চিকন সেমাই তৈরি শুরু করে। তাদের দেখাদেখি পরবর্তী সময়ে কালিসামাটি, শ্যাওলাগাতি, শ্যামবাড়িয়াসহ বিভিন্ন গ্রামেও এ ধরনের সেমাই তৈরি করছেন অনেকে।
ধীরে ধীরে এখানকার তৈরি চিকন সেমাইয়ের খ্যাতিও ছড়িয়ে পড়ে দেশের নানা প্রান্তে। সারা বছরই কমবেশি সেমাই উৎপন্ন হয় এই গ্রামটিতে। সেমাই উৎপাদনে অর্ধশত কারখানায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অন্তত ৪০০ নারী শ্রমিক কাজ করলেও এবার এই সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। কারখানার মালিকরা লোকসান কমাতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন শ্রমিকরা।
সেমাই উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক নারী শ্রমিক শেফালী খাতুন বলেন, ‘ঈদের আগে এই সময় আমাদের দম ফেলার সময় থাকত না। কিন্তু এ বছর আমাদের হাতে কোনো কাজ নেই। কারণ কারখানা মালিকরা লোকসানের শঙ্কায় মেশিন বন্ধ রেখেছেন। এদিকে আমরা আগের চেয়ে কম মজুরি নিয়ে কাজ ধরে রেখেছি।’
আরেক নারী শ্রমিক আছিয়া বেগম বলেন, ‘শবেবরাতের পর থেকেই সেমাই তৈরি শুরু হয়ে যেত, কিন্তু এ বছর খুব কম সেমাই তৈরি করা হচ্ছে। গত ২০ বছরেও এ রকম অবস্থা দেখিনি।’
শ্যাওলাগাতি এলাকার সেমাইকল মালিক আব্দুর রশিদ বলেন, ‘ময়দা, চিনির দাম দ্বিগুণের চেয়ে বেশি বেড়েছে। গত বছর ২০০ বস্তা ময়দা থেকে সেমাই তৈরি করেছি, কিন্তু এই বছর মাত্র ২১ বস্তা থেকে সাদা সেমাই তৈরি করছি। সব জিনিসের দাম বাড়ার কারণে শ্রমিকদের মজুরি দিতে না পেরে এখন আটজন থেকে কমে চারজন শ্রমিক কাজ করছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আগে ২৫ কেজির এক খাঁচি সেমাই এক হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হতো। সব জিনিসের দাম বাড়ার কারণে আমরাও ৬০০ টাকা বাড়িয়ে এক হাজার ৯০০ টাকায় বিক্রি করছি। এ ছাড়া বড় বড় করপোরেট হাউসগুলোও এখন সাদা চিকন সেমাই তৈরি করছে। ফলে আমাদের সেমাই কম বিক্রি হচ্ছে।’
সাহেরা খাতুন নামের এক কলমালিক বলেন, ‘করোনার প্রভাব কাটিয়ে ভেবেছিলাম এ বছর লাভের মুখ দেখব। কিন্তু যেভাবে চিনি ও ময়দার দাম বেড়েছে, তাতে আমাদের এই ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।’
শাজাহানপুর উপজেলার বেজোড়া গ্রামের সেমাই কারখানার মালিক কাফি ইসলাম বলেন, প্রতিবছর রমজান এলেই সেমাই তৈরি কার্যক্রম শুরু হয়। মেশিন চলে ভোর থেকে রাত পর্যন্ত। গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার ব্যস্ততা অনেক কমেছে। তবু লাভ হবে বলে তিনি আশাবাদী।
বগুড়া শহরের রাজাবাজার এলাকায় সেমাইয়ের বাজার ঘুরে দেখা যায় রমজানের প্রথম দিন থেকেই শুরু হয়েছে বেচাকেনা। দেশের নানা প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা আসতেন সাদা চিকন সেমাই কিনতে। কিন্তু এ বছর সাদা সেমাইয়ের বিক্রি কমেছে।
এ বিষয়ে রাজাবাজার আড়তদার ও সাধারণ ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক পরিমল প্রসাদ রাজ বলেন, গত বছরের মতো এবার সাদা সেমাইয়ের মার্কেট নেই। মূলত পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও বিভিন্ন বড় বড় কোম্পানির কারণে বগুড়ার সাদা চিকন সেমাই বিক্রি কমেছে।