এম আর মাসফি
প্রকাশ : ২৭ মার্চ ২০২৩ ১০:৩৫ এএম
আপডেট : ২৭ মার্চ ২০২৩ ১১:০৮ এএম
চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ১০২টি প্রকল্পের আওতায় উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) অনুযায়ী চাহিদা ২২ হাজার কোটি টাকা। আর এডিপির বরাদ্দের সিলিং অনুযায়ী তারা পেয়েছে মাত্র ৭ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা।
অর্থাৎ ডিপিপি অনুযায়ী প্রকল্পগুলোর চাহিদার তুলনায় আরও ১৪ হাজার ৬৩ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে। এদিকে চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ না পাওয়ায় প্রকল্প শেষ করতে সময় বেশি লাগছে। যার কারণে প্রকল্প বাস্তবায়ন দীর্ঘায়িত হচ্ছে। বেড়ে যাচ্ছে খরচ। আর এডিপিতে টাকার সংকট থাকায় জরুরি প্রকল্পও জায়গা পাচ্ছে না।
সম্প্রতি ৪৬ কোটি টাকা খরচে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলার উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য দিঘি খননের একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। প্রকল্পটি খুলনার দাকোপ, পাইকগাছা, বটিয়াঘাটা ও ডুমুরিয়া উপজেলা, সাতক্ষীরার শ্যামনগর, কালিগঞ্জ, তালা ও আশাশুনি, বাগেরহাটের মোংলা উপজেলায় বাস্তবায়ন হবে।
এসব এলাকায় নিরাপদ পানির সংকট খুবই প্রকট। প্রকল্পটির মাধ্যমে এসব এলাকায় নিরাপদ পানির সংকট দূরীকরণে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, সুপেয় পানি সরবরাহ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাপ্যতা নিশ্চিতকরণ, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ব্যবহার, জনগণের ওপর লবণাক্ত পানির বিরূপ প্রভাব হ্রাস এবং এই সব এলাকার পরিবেশগত উন্নয়ন করা হবে। ওই এলাকার জন্য প্রকল্পটি খুবই জরুরি হলেও মন্ত্রণালয়ের আওতায় অর্থসংকটে প্রকল্পটির অনুমোদন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
প্রকল্পটির বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশন বলছে, চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ১০২টি প্রকল্পের ডিপিপি অনুযায়ী মোট অর্থের চাহিদা ২২ হাজার ১ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের অনুকূলে প্রাপ্ত মোট সিলিং ৭ হাজার ৯৩৮ কোটি ১৫ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরে চাহিদার তুলনায় বরাদ্দে মোট গ্যাপ ১৪ হাজার ৬৩ কোটি ৬২ লাখ টাকা।
এ ছাড়া আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ডিপিপি অনুযায়ী মোট চাহিদা ১৯ হাজার ৮১৭ কোটি টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ডিপিপি অনুযায়ী মোট চাহিদা ১৪ হাজার ২৯৪ কোটি টাকা। আর মন্ত্রণালয়ের সিলিং অনুযায়ী দুই অর্থবছরে বরাদ্দ দেওয়া হবে যথাক্রমে ৮, হাজার ৭৩১ কোটি টাকা ও ৯ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। ফলে দুই অর্থবছরে চাহিদার তুলনায় অর্থসংকট থাকবে যথাক্রমে ১১ হাজার ৮৫ কোটি টাকা ও ৪ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা। এটি পূরণ করে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় কীভাবে এ প্রকল্পের অর্থায়ন করবে তা জানতে চেয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পে অর্থবরাদ্দের বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট উইংয়ের এক কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, তারা যে পরিমাণ প্রকল্প নিয়েছে তাতে এখন চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া যাচ্ছে না। এতে প্রকল্প অনুমোদনের পর বসে থাকছে। ফলে প্রকল্পের মেয়াদ বেড়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে খরচ বাড়ছে। যার কারণে নির্দিষ্ট সময়ে প্রকল্প শেষ করা যাচ্ছে না। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সচেতন হওয়া দরকার।
প্রস্তাবনায় আরও বলা হয়, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে উপকূলীয় অঞ্চলের সুপেয় পানির সংকট মেটানো সম্ভব। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকায় পানির বিশালতা থাকলেও মিঠা পানির প্রাপ্যতারভিত্তিতে সংকট সব সময়ই ছিল। গভীর নলকূপের পানিতে রয়েছে মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ততা ও আর্সেনিক দূষণ। এলাকার মানুষের পানির চাহিদপূরণের জন্য পুকুর ও রেইনওয়াটার হারভেস্টিং প্লান্ট হচ্ছে ভরসা। বৃষ্টির পানি ধারণ করে তা এই প্রান্টের মাধ্যমে ব্যবহার করা হয়।
আবার অপরিকল্পিত চিংড়ির চাষ ও যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে স্থানীয় পুকুরগুলোর অধিকাংশই মিঠা পানির আধার হিসেবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। কিছু কিছু এলাকায় রেইনওয়াটার হারভেস্টিং প্ল্যান্ট থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। এই এলাকার অর্ধেক জনগোষ্ঠী বৃষ্টির পানি ও পুকুরের পানি ফিল্টার ( শোধন) করে পান করে। বাকি অর্ধেক পুকুরের পানি পান করে ফিল্টার ছাড়াই। ফলে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলার উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় পানির সংকট চলছেই। দিঘি খনন করে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে এই অঞ্চলের সুপেয় পানির সংকট মেটানো সম্ভব। এ সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে প্রকল্পটি প্রস্তাব করা হয়েছে।
চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ না থাকলেও নতুন প্রকল্প নেওয়ার বিষয়ে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব পরিকল্পনা অনুবিভাগ দীপান্বিতা সাহা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এই প্রকল্পটি ওই এলাকার জন্য খুবই জরুরি। মানুষ নিরাপদ খাবার পানি পাচ্ছে না। চলতি অর্থবছরে এবং আগামী অর্থবছরে বেশ কিছু প্রকল্প কমবে। তাতে নতুন প্রকল্পের জায়গা হয়ে যাবে। আমরা অর্থমন্ত্রণালয়ে চাহিদা দিয়ে বরাদ্দ পাচ্ছি না। আর প্রকল্প না নিয়ে তো বসে থাকা যাবে না। চাহিদা অনুযায়ী প্রকল্প তো নিতেই হবে।’
প্রকল্পের প্রস্তাবনায় দেখা যায়, প্রকল্পের আওতায় ২১টি দিঘি খনন বাবদ মোট ৪৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। যার মধ্যে ৭টি দিঘির জন্য ১২ কোটি টাকা, ১৩টি দিঘির জন্য ১৯ কোটি ৯৮ লাখ টাকা এবং ১টি দিঘির জন্য ১৩ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। প্রকল্পের রাজস্ব খাতে সম্মানী, গাড়ি ভাড়া, সেমিনার ও কনফারেন্স, জরিপসহ বিভিন্ন অঙ্গের জন্য মোট ৯৮ লাখ টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পের মূলধন খাতের বিভিন্ন অঙ্গের জন্য মোট ৯ লাখ টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। সংরক্ষিত বৃষ্টির পানি পরিশোধনের জন্য ৪টি দিঘিতে ২টি করে এবং ১৭টি দিঘিতে ১টি করে সর্বমোট ২৫টি পন্ড স্যান্ড ফিল্টার স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া দিঘির সুপেয় পানি সংগ্রহ, সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ৪টি দিঘিতে ২টি করে এবং ১৭টি দিঘিতে ১টি করে সর্বমোট ২৫টি ঘাটলা (টাইপ-এ ২১টি ও টাইপ-বি ৪টি) নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। নিরাপদ পানি সংগ্রহ ও সরবরাহের জন্য চলাচলের সুবিধার্থে দিঘির পাড়ের ওপর ওয়াকওয়ে নির্মাণ এবং ভূমিক্ষয় রোধ করার জন্য দিঘির পাড় ঘাসের চাপড়ায় আচ্ছাদিত (টাফিং) করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
দিঘির পাড়ে সর্বমোট ৫ হাজার ৩১৪ মিটার সারফেস ড্রেন, ৬২টি কংক্রিটের ছাতা, ৯০টি কংক্রিটের বঞ্চ, ১৬৬টি কংক্রিটের চেয়ার ও ২২০টি রোপিত বৃক্ষের পেরিফেরিয়াল ওয়াল নির্মাণ এবং মহিলা ও পুরুষদের জন্য ৯টি টয়লেট নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। দিঘির পাড়ে দেশি প্রজাতির পাম জাতীয় বৃক্ষরোপণের প্রস্তাব করা হয়েছে।