প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০২৩ ২০:৪৫ পিএম
আপডেট : ১৫ মার্চ ২০২৩ ২১:০৩ পিএম
সংগৃহীত
পেঁয়াজের দাম বাড়ানোর দাবিতে বিক্ষোভ করছেন ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য মহারাষ্ট্রের কৃষকরা। সম্প্রতি রাজ্যের নাসিক জেলা থেকে রাজধানী মুম্বাই পর্যন্ত লংমার্চ কর্মসূচির ঘোষণাও দিয়েছেন তারা। নাসিক থেকে মুম্বাইয়ের দূরত্ব প্রায় ২০০ কিলোমিটার (১২৪ মাইল)।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেশ কিছুদিন ধরেই সরকারিভাবে পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি ও নতুন দাম ঘোষণার দাবি জানিয়ে আসছেন রাজ্যের কৃষকরা। ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নিতে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে কৃষকদের কিছু পরিমাণ আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদানের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আন্দোলনরত কৃষকরা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।
নাসিক জেলার বাসিন্দা নামদেব ঠাকরে বিবিসিকে জানান, তার নিজের বিস্তৃত পারিবারিক খামারের বিপুল পরিমাণ জমিতে পেঁয়াজের ক্ষেত করেছিলেন তিনি। কিন্তু মৌসুম চলে যাওয়ার পরও এখন পর্যন্ত সেসব পেঁয়াজ তুলতে পারেননি। ফলে মণের পর মণ পেঁয়াজ নষ্ট হচ্ছে ক্ষেতেই।
কী কারণে তুলতে পারেননি—এ প্রশ্নের উত্তরে নামদেব বলেন, ’বর্তমানে বাজারে পেঁয়াজের যে দাম, তাতে মজুর নিয়োগ করে ক্ষেত থেকে পেঁয়াজ তুলে বাজারে বয়ে আনতে যে খরচ হবে, তা-ই উঠবে না। চাষের খরচ বাদই দিলাম।’
নামদেব একা নন, মহারাষ্ট্রের হাজার হাজার কৃষকের অবস্থা এখন তার মতোই। সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় কয়েক সপ্তাহ আগে ভারতের প্রায় সব রাজ্যে পেঁয়াজের দাম ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। এতেই বিপাকে পড়েছেন ভারতের লাখ লাখ কৃষক।
যদিও পেঁয়াজ উৎপাদনে বিশ্বের এক নম্বর দেশ চীন, তারপরই ভারত। প্রতিবছর ২ কোটি ৪০ লাখ টন পেঁয়াজের উৎপাদন হয় দেশটিতে এবং মহারাষ্ট্র ভারতের পেঁয়াজের ভান্ডার নামে পরিচিত। দেশটির মোট উৎপাদিত পেঁয়াজের অর্ধেকই আসে পশ্চিমাঞ্চলীয় এই রাজ্য থেকে।
কৃষিজাত এই ফসলের চাহিদাও ভারতে প্রচুর। সবজি এবং মসলা উভয় হিসেবেই এটি অপরিহার্য দেশটির প্রায় সব রাজ্যে। নিজেদের চাহিদা মেটানোর পর মোট উৎপাদনের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বিদেশে রপ্তানি করে ভারত। তবে মিষ্টিজাতীয় খাবার ব্যতিত অধিকাংশ ভারতীয় ডিশে পেঁয়াজ অপরিহার্য হলেও দেশটিতে এ পণ্যের বাজার খুবই অস্থিতিশীল। কারণ স্বাভাবিক তাপমাত্রায় এই সবজি বা মসলাটি দ্রুত পচে যায় এবং হিমাগারে নিজেদের পেঁয়াজ সংরক্ষণের সুবিধা দেশটির অধিকাংশ কৃষকের নেই।
আবার এই সবজি বা মসলা একই সঙ্গে ব্যাপকভাবে রাজনৈতিকও। বাজারে যদি সরবরাহ হঠাৎ বেড়ে যায়, তাহলে দাম কমে যায় পেঁয়াজের, ক্ষতিগ্রস্ত হন কৃষক। আবার সরবরাহ যদি হঠাৎ কমে যায়, তাহলে দাম বেড়ে যায় এবং ক্ষোভ শুরু হয় সাধারণ ভোক্তাপর্যায়ে।
ভারতের পাইকারি বাজারে পেঁয়াজের দাম কমে যাওয়ার কারণ নিয়ে দেশটির কেন্দ্রীয় কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, একসময় মহারাষ্ট্রে অনেকটা একচেটিয়াভাবে পেঁয়াজের চাষ হতো। কিন্তু বর্তমানে উত্তর প্রদেশ, বিহার, রাজস্থানসহ আরও কিছু রাজ্যে পেঁয়াজ চাষ বাড়ছে। এ কারণে বাজারে সরবরাহ আসছে প্রচুর, দামও হ্রাস পেয়েছে।
খামার বিশেষজ্ঞ শ্রীকান্ত কুয়ালেকার অবশ্য বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব চলতি মৌসুমের পেঁয়াজ চাষে প্রভাব ফেলেছে। তিনি বলেন, ’ভারতে দুই মৌসুমে পেঁয়াজের চাষ হয়, বর্ষা ও শীতকাল। বর্ষাকালে যে পেঁয়াজ ক্ষেতে রোপণ করা হয়, তা সাধারণত তোলা হয় ডিসেম্বরের শেষ দিকে কিংবা জানুয়ারির শুরুর দিকে। এই মৌসুমের পেঁয়াজ শীতকালীন পেঁয়াজের চেয়ে অপেক্ষাকৃত দ্রুত পচনশীল হওয়ায় ক্ষেত থেকে তোলার পরপরই এগুলো বাজারজাত করতে হয় কৃষকদের। শীতকালীন পেঁয়াজে অবশ্য সেই সমস্যা নেই, ক্ষেত থেকে তোলার পর স্বাভাবিক তাপমাত্রায়ও সেগুলো দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় ‘
মহারাষ্ট্রের কৃষক নেতা অজিত নাভাল বিবিসিকে জানান, বর্তমানে পাইকারি বাজারে প্রতি ১০০ কেজি পেঁয়াজ কৃষকদের বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ২০০ থেকে ৪০০ রুপিতে। অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় মাত্র ২৫৪ থেকে ৫০৮ টাকায়। তিনি বলেন, ’যদি প্রতি ১০০ কেজি পেঁয়াজের দাম ১২০০ রুপি হতো, তাহলে কৃষকরা তাদের উৎপাদন খরচ মেটানোর পর ৪০০ রুপি মুনাফা করতে পারতেন। আমি সর্বনিম্ন মুনাফার কথা বলছি।’
পাইকারি বাজারে পেঁয়াজের দাম কমে গেলেও ভারতের খুচরা বাজারে তার প্রভাব নেই। অজিত নাভালের মতে, বাজারের মধ্যবর্তী ব্যবসায়ীরা পাইকারি বাজারে দাম কম হওয়ার সুযোগে মুনাফা লুটছেন আর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা।
কৃষকদের এ অভিযোগ স্বীকার করেছেন খামার বিশেষজ্ঞ শ্রীকান্ত কুয়ালেকারও। তিনি বলেন, ’ভারতে আসলে ফসল বাজারজাত করা বা দাম নিয়ন্ত্রণ-সম্পর্কিত কোনো নীতি নেই। যখন কোনো কৃষিপণ্যের দাম বেড়ে যায়, সরকার সেটির রপ্তানি বন্ধ করে দেয়, এ পর্যন্তই। কিন্তু এর ফলে অনেক সময় বিভিন্ন দেশে ফসল রপ্তানি-সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি থেকেও পিছু হটতে হয় আমাদের। এটা বাণিজ্যিক লেনদেনের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য ক্ষতিকর।’
সূত্র : বিবিসি, এনডিটিভি