প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৩:০৮ পিএম
আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৩:২৮ পিএম
প্রবা ফটো
প্রাক সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন হওয়ার পরও শর্তের বেড়াজালে আটকে যেতে চলেছে নবাবগঞ্জ ইকোনমিক জোন স্থাপনের উদ্যোগ। সম্প্রতি প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব পুনর্গঠনে আট দফা সুপারিশ করেছে, যা বাস্তবায়ন করতে গেলে প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
পিইসি সভায় গৃহীত শর্তের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে-- প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা বেজাকে পরিবেশগত ও বিআইডব্লিউটিএর ছাড়পত্র নিয়ে বিস্তারিত সমীক্ষার আলোকে প্রকল্প প্রস্তাব পুনর্গঠন করতে হবে। এ ছাড়া প্রকল্প ব্যক্তিমালিকানাধীন ও কৃষিজমি বাদ দিয়ে খাসজমিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে হবে। এক্ষেত্রে অর্থের সংস্থান নিয়ে অর্থ বিভাগের মতামতের আবশ্যকতাও জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পমালিক সমিতির সভাপতি মো. আবদুল রাজ্জাক বলেন, ‘ঢাকার খুব কাছেই অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য আমরা অনন্তকাল বসে থাকতে পারি না। আমাদের তো ব্যবসা করতে হবে। নবাবগঞ্জের ইকোনমিক জোনের কাজ কবে শেষ হবে, কেউ কি বলতে পারবে? শুনেছি উদ্যোগ নিলেও এখন কোনো অগ্রগতি নেই।’
পিইসি সভা সূত্রে জানা গেছে, নবাবগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার বিষয়ে ২০১৯ সালের ৫ মে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নীতিগত অনুমোদন পায় বেজা। এরপর বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান প্রাইস ওয়াটার হাউস কুপারসকে (পিডব্লিউসি) দিয়ে একটি প্রাক সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা করা হয়। প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলটি ঢাকা থেকে ৩৯ কিলোমিটার, কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ২৩ কিলোমিটার ও চট্টগ্রাম থেকে ২৫৬ কিলোমিটার দূরে। এর ৮৭৪ একর জমির মধ্যে ৮৩৪ একরই ব্যক্তিমালিকানাধীন। এসব জমিতে কোনো বসতি নেই, বছরের একটা সময় পানির নিচে থাকে, বাকি সময় কৃষিকাজ হয়। সম্ভাব্য স্থানটির কাছেই ধলেশ্বরী ও ইছামতী নদী। পিডব্লিউসির প্রাক্ সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) প্রথম শ্রেণির রুট হলো ধলেশ্বরী নদী। এর গভীরতা আড়াই থেকে সাড়ে তিন মিটার। ফলে প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলটির নৌপথেও যোগাযোগ সুবিধা থাকবে। পিডব্লিউসি বলেছে, সফল অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো মূলত রাজধানী অথবা বড় শহরের কাছে অবস্থিত। এই অবস্থানগত সুবিধা অর্থনৈতিক অঞ্চলের কারখানাগুলোর বাজার ধরা, সংযোগ শিল্পের সুবিধা ও জনবলের প্রাপ্যতা এবং অন্যান্য সুবিধা পাওয়া যাবে। নবাবগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চল যেহেতু ঢাকার কাছে, তাই নবাবগঞ্জ ইকোনমিক জোন থেকে বিনিয়োগকারীরা ওই সুবিধাগুলো পাবেন।
নবাবগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলে সম্ভাব্য বিনিয়োগ খাতের প্রত্যাশা জানতে ১৫৮টি প্রতিষ্ঠানের ওপর জরিপ করেছে পিডব্লিউসি। এগুলোর মধ্যে ১২৮টি দেশি প্রতিষ্ঠান, বাকিগুলো বিদেশি বিনিয়োগকারী। জরিপে উঠে আসে যে, সেখানে ৯টি খাতে বিনিয়োগ করতে বেশি আগ্রহ দেখিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। সেগুলো হলো-- খাদ্য ও পানীয়, বস্ত্র ও পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, নন মেটালিক মিনারেলস, ওষুধ, বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক পণ্য, হালকা প্রকৌশল ও আসবাব, রাসায়নিক এবং প্লাস্টিক ও রাবার। ঢাকায় যারা হালকা প্রকৌশল, প্লাস্টিক ও রাসায়নিকের কারখানা গড়ে তুলেছেন, তারা জমির কথা শুনতে শুনতে ক্লান্ত হয়ে গেছেন।
পিইসি সভার কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, প্রকল্প এলাকা রাজধানীর খুব কাছে। তাই এটি একটি লাভজনক প্রকল্প হবে। এ প্রকল্পের দুটি উদ্দেশ্য। প্রথমত, ঢাকা শহরে যত বিপজ্জনক শিল্প-কারখানা আছে, সেগুলোকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য জমির ব্যবস্থা করা। দ্বিতীয়ত, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যারা ঢাকার আশপাশে জমি চান, তাদের জন্য জমির ব্যবস্থা করা। বেজার প্রস্তাবিত প্রকল্পটি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বরাদ্দবিহীনভাবে অননুমোদিত নতুন প্রকল্প তালিকায় অন্তর্ভুক্ত আছে। এটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি অগ্রাধিকার প্রকল্প। ‘নবাবগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনা’ শীর্ষক প্রকল্পটি জুলাই ২০২৩ থেকে জুন ২০২৬ মেয়াদে মোট ১ হাজার ৯১৫ কোটি টাকায় বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে।
পিইসি সভায় আইএমইডি প্রতিনিধি তার মতামতে বলেছেন, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা না হওয়ার কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে অসুবিধা হয় এবং প্রকল্প ব্যয় ও বাস্তবায়নের মেয়াদ বাড়ে। তাই বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
বেজার পক্ষ থেকে উপসচিব মো. নাজমুল আলম বলেন, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রাইস ওয়াটার হাউস কুপার্সের মাধ্যমে একটি প্রাক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়েছে। সেই আলোকে অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমি অধিগ্রহণসহ কতিপয় অফসাইট ও অনসাইট অবকাঠামো নির্মাণের প্রস্তাব করে প্রকল্প প্রস্তাবটি (ডিপিপি) প্রণয়ন করা হয়েছে। দুই শতাংশ সুদে ঋণগ্রহণের মাধ্যমে বাস্তবায়নের জন্য অর্থ বিভাগের সম্মতি মিলেছে।
প্রকল্পের আওতায় সেতু নির্মাণ করা হবে। তাই বিআইডব্লিউটিএ-এর ছাড়পত্র প্রকল্প গ্রহণের সময় সংযুক্ত করতে হবে। মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোর আওতায় ফিসক্যাল স্পেস এবং অর্থপ্রাপ্তির সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে নতুন প্রকল্প শুরু করার প্রয়োজন। এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের মতামত প্রকল্প প্রস্তাবে সংযুক্ত করা যেতে পারে ।