রাজশাহী প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০২৩ ১৩:৫৮ পিএম
আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০২৩ ১৫:২০ পিএম
রাজশাহীর একটা কারখানায় গুটি থেকে সুতা উৎপাদনে কাজ করছেন এক নারী শ্রমিক। ছবি : প্রবা
আবারও নতুন করে গতি পেয়েছে রেশম শিল্প। সম্প্রতি চীনসহ অন্যান্য দেশ রেশম সুতা রপ্তানি কমিয়ে দিয়েছে। ফলে দাম বেড়েছে আমদানি করা রেশম সুতার। অন্যদিকে তুতের উৎপাদন বৃদ্ধি, উন্নত গুটি আবিষ্কার ও প্রশিক্ষিত চাষি বেড়েছে দেশে। ফলে নতুন করে রেশম শিল্পের সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডের অর্থ ও পরিকল্পনা পরিচালক ড. এমএ মান্নান জানান, বোর্ড রেশমের সুদিন ফিরিয়ে আনতে চাষি ও ব্যবসায়ীদের সহযোগিতার মাধ্যমে সম্প্রসারণের কাজ করছে।
তিনি বলেন, চারা লাগানোর পর তুতপাতা পরিপক্ব হতে দুই বছর সময় লাগে। যেখানে প্রতি হেক্টরে ২৭-৩০ টন তুতপাতা পাওয়া যেত গত পাঁচ বছরে রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের গবেষণার ফলে এখন সেই জমিতে পাওয়া যায় ৪৫-৪৭ টন পাতা। একটি গুটি থেকে যেখানে ৩০০ থেকে ৪০০ মিটার সুতা পাওয়া যেত। এখন সেখানে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার সুতা পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি আরও জানান, পলু পোকা গুটি কেটে প্রজাপতি হয়ে বের হয়। সেই প্রজাপতি প্রজননের মাধ্যমে পলু পোকার বংশবিস্তার করে। একটি প্রজাপতি ৩০০ থেকে ৪০০টি ডিম দেয়। গড়ে ১০০টি ডিম থেকে ৪০ কেজি গুটি হতো। তবে গবেষণার মাধ্যমে এখন তা ৮০ কেজিতে উন্নীত করা হয়েছে। মাত্র ৮ কেজি গুটি থেকে এখন এক কেজি সুতা উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে।
শুধু তা-ই নয়, গবেষণাগারে গুটি থেকে সুতা উৎপাদনের নানা যন্ত্রাংশও তৈরি করা হচ্ছে; যা আমদানি করা যন্ত্রের মূল্যের চাইতে অন্তত ৪০ শতাংশ কম। প্রতিবছর প্রায় ৫০০ জন রেশমচাষিকে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে রেশম উন্নয়ন সম্প্রসারণ বিভাগের মাধ্যমে।
এ বিষয়ে রাজশাহীর সপুরা সিল্কের স্বত্বাধিকারী সাজ্জাদ আলী জানান, বাইরের দেশ থেকে সুতা কিনে এখন রেশমের কাপড় উৎপাদন করে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। তাই তিনি রেশমের পুরো প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে চান। এখন রাজশাহী শহরের কাছেই প্রায় ১০০ বিঘা জমির খোঁজ করছেন। যেখানে তুতবাগান, পলু ও রেশম গুটি চাষের পাশাপাশি সুতা ও কাপড় উৎপাদন করবেন।
দেশে উৎপাদিত রেশম গুটি ও সুতার মান আগের চেয়ে অনেক উন্নত মন্তব্য করে তিনি জানান, গত দুই বছর আগে চীন থেকে আমদানি করা রেশম সুতার কেজি ছিল প্রায় ৫ হাজার টাকা, যা এখন ৭ হাজার ৫০০ টাকা। দেশে উৎপাদিত রেশম সুতার দাম ছিল ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকা। এখন ৫ হাজার ৭০০ টাকা। দেশি রেশম গুটির কেজি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় চায়না সুতার দাম বেড়েছে। দেশি সুতার দাম তুলনামূলক কম হওয়ার পাশাপাশি দেশের রেশম সুতার মানও আগের চাইতে অনেক উন্নত। একটা সময় ছিল যখন দেশে উৎপাদিত রেশম সুতা মানের কারণে ব্যবসায়ীরা পরিহার করতেন। তবে সময় পাল্টেছে।
এ উদ্যোক্তা বর্তমানে তার কারখানায় মাত্র ৩৫ শতাংশ দেশি রেশম সুতা ব্যবহার করেন। তবে গত দুই বছরে স্থানীয় কৃষকদের থেকে পাঁচ গুণ বেশি গুটি কিনেছেন। একই সময় তিনি আগের চেয়ে দ্বিগুণ দেশি রেশম সুতা কিনেছেন। দাম বাড়ায় চায়না সুতা কেনা কমিয়ে দিয়েছেন। তিনি মনে করেন আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে দেশে রেশম সুতার উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।
সিল্ক কাপড় উৎপাদকরা জানান, চায়না সরকার বিগত সময়ে রেশম সুতা রপ্তানি করলে তাদের উদ্যোক্তাদের সাবসিডি বা ভর্তুকি দিতেন। এখন তা বন্ধ করে দিয়েছে। চীন সরকার তাদের উদ্যোক্তাদের সুতা রপ্তানি না করে ওই সুতা দিয়ে নিজেদেরই কাপড় উৎপাদনে উৎসাহিত করছে। এখন সুতার পরিবর্তে কাপড় রপ্তানি করলে তাদের চীন সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে।
রাজশাহী জেলার আঞ্চলিক রেশম সম্প্রসারণ কার্যালয়ের উপপরিচালক মাসুদ রেজা জানান, গত বছর থেকে ৫৬ জন কৃষক তাদের ৫৬ বিঘা জমিতে তুত চাষ করছেন। প্রতি বিঘায় দুই হাজার তুতগাছ লাগানো হয়েছে। এ ছাড়া রাস্তার ধার, পুকুরপাড় ও সরকারি খাসজমিতে তুতগাছ লাগাতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।
মাঠপর্যায়ের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, সরকার চাইছে দেশেই রেশম সুতা উৎপাদন হোক। এজন্য কৃষকদের বিনামূল্যে তুতগাছের চারা ও পলু পোকার ডিম দিচ্ছে সরকার। তুতগাছের চাষাবাদ বৃদ্ধির জন্য কৃষকদের পতিত ও খাস জমি, রাস্তার পাশের ও পুকুরপাড়ের ফাঁকা জমি লিজ দেওয়া হচ্ছে। গুটি উৎপাদনের জন্য ডালা বা চন্দ্রকি দেওয়া হচ্ছে। এমনকি রেশম উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ গুটি উৎপাদকদের সঙ্গে রেশম সুতা উৎপাদনকারী উদ্যোক্তাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন, যাতে উভয়েই লাভবান হতে পারে।