আহমেদ তোফায়েল
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ২ ঘণ্টা আগে
কলম্বোর একটি স্টেশনে পেট্রোল কেনার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন অটোরিকশা চালকরা। ২০২২ সালের ১৬ মে তোলা। ছবি: রয়টার্স
মাত্র তিন বছর আগের কথা মনে করুন। ২০২২ সালের এপ্রিলে বিশ্ব গণমাধ্যমের মূল শিরোনাম ছিল শ্রীলঙ্কা। দেশটিতে তখন শুধুই কান্নার রোল। শ্রীলঙ্কা দেউলিয়া। তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নেমেছিল শূন্যে। তেলের পাম্পে ছিল মাইলের পর মাইল দীর্ঘ লাইন। লণ্ঠন জ্বালিয়ে পরীক্ষার হল সামলাতে হয়েছিল শিক্ষার্থীদের। ক্ষুব্ধ জনতা আছড়ে পড়েছিল রাষ্ট্রপতির বাসভবনে। এক সময়ের সমৃদ্ধ এই দেশকে সবাই ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ বলতে শুরু করেছিল।
কিন্তু ২০২৬ সালের এই সময়ে এসে চিত্রটি পুরোপুরি বদলে গেছে। শ্রীলঙ্কা বিশ্ব অর্থনীতিতে এক অভাবনীয় প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখেছে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ মূল্যায়নে দেশটিকে আবারও ‘উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ’ বলা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এই দেশকে মৃতপ্রায় ঘোষণা করেছিল। অথচ তারা সব পূর্বাভাস ভুল প্রমাণ করেছে। শ্রীলঙ্কা এবার ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়ানো শ্রীলঙ্কা আজ বিশ্ব অর্থনীতির এক অনন্য পাঠ্যপুস্তক।
শ্রীলঙ্কার এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পটি বুঝতে হলে তাদের পতনের গভীরতা জানা দরকার। ২০১৯ সালেও দেশটি একবার উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন নীতিনির্ধারকেরা অতি-আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। তারা সস্তা জনপ্রিয়তার নীতি গ্রহণ করেন। করের হার ঢালাওভাবে কমিয়ে দেওয়া হয়। ফলে সরকারের রাজস্ব আদায় বন্ধ হয়ে যায়। একই সঙ্গে নেওয়া হয় জৈব চাষাবাদের অবাস্তব সিদ্ধান্ত। মেগা প্রকল্পের জন্য চড়া সুদে বাণিজ্যিক ঋণ নেওয়া হয়। এই সব ভুলের খেসারত দিতে হয় পুরো জাতিকে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ইস্টার সানডের সন্ত্রাসী হামলা। এরপর আসে কোভিড-১৯ মহামারির ধাক্কা। এতে দেশের আয়ের মূল উৎস পর্যটন খাত পুরোপুরি পঙ্গু হয়ে যায়। ৫১ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয় কলম্বো। দেশটিতে দেউলিয়া ঘোষণা করা হয়। তখন শ্রীলঙ্কার সামনে দুটি পথ ছিল। প্রথমটি ছিল চরম অরাজকতার দিকে যাওয়া। দ্বিতীয়টি ছিল নির্মম সত্য মেনে নিয়ে নিজেদের বদলে ফেলা। শ্রীলঙ্কা দ্বিতীয় পথটিই বেছে নেয়। তারা নিজেদের ভুল স্বীকার করে এবং অর্থনীতির মৌলিক নিয়মে ফিরে যায়।
অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে যাওয়া নতুন কিছু নয়। কিন্তু আইএমএফের ৩ বিলিয়ন ডলার ঋণের সঙ্গে কিছু কঠোর শর্ত আসে। এই শর্তগুলো বাস্তবায়ন করার রাজনৈতিক সাহস সবার থাকে না। শ্রীলঙ্কা এখানেই ব্যতিক্রমী নজির দেখিয়েছে।
দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং সরকার একযোগে কাজ শুরু করে। তারা মুদ্রানীতিকে অত্যন্ত কঠোর করে। এর ফলে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসে। সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্তটি ছিল রাজস্ব সংকোচন। সরকার করের পরিধি বাড়িয়ে রাজস্বের ভিত মজবুত করে। লোকসান কমাতে জ্বালানি ও বিদ্যুতের সব ভর্তুকি তুলে নেওয়া হয়। সাধারণ জনগণের জন্য এটি ছিল চরম অগ্নিপরীক্ষা। জীবনযাত্রার ব্যয় আকাশচুম্বী হয়েছিল। কিন্তু অর্থনীতির স্বাস্থ্য ফেরাতে এই তিতা বড়ি সেবন ছাড়া উপায় ছিল না। কলম্বো এই সংস্কার কর্মসূচি মাঝপথে পরিত্যাগ করেনি। তারা নীতিতে অটল ছিল। এই মানসিকতাই তাদের পুনরুদ্ধারের ভিত গড়ে দিয়েছে।
শ্রীলঙ্কার এই উত্থানের পেছনে সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি ছিল নীতির ধারাবাহিকতা। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে সাধারণত সরকার বদল হলে আগের সব নীতি ডাস্টবিনে ফেলা হয়। কিন্তু শ্রীলঙ্কা এই সংস্কৃতির ঊর্ধ্বে উঠতে পেরেছে। ২০২৪ সালের শেষের দিকে দেশটিতে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে। বামপন্থী ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার (এনপিপি) সরকার ক্ষমতায় আসে। অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন যে, আইএমএফের কর্মসূচি হয়তো বাতিল হবে। কিন্তু নতুন সরকার সস্তা জনপ্রিয়তার ফাঁদে পা দেয়নি। তারা পূর্ববর্তী অর্থনৈতিক সংস্কারের ধারাবাহিকতা কঠোরভাবে বজায় রেখেছে। এখানেই প্রকাশ পায় দেশটির প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা। এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদদের মূল্যায়ন তাৎপর্যপূর্ণ।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ডিসটিংগুইশড ফেলো অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমান একটি কথা বলেছেন। তার মতে, শ্রীলঙ্কার আসল শক্তি লুকিয়ে আছে তাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতার মধ্যে। তারা শুধু খাতায়-কলমে নীতি তৈরি করেনি। তা মাঠপর্যায়ে কঠোরভাবে কার্যকর করেছে। রাজাপাকসে আমলের অবসানের পর দেশটিতে সুশাসন ফিরিয়ে আনাই ছিল মূল চ্যালেঞ্জ। তারা সেটি চমৎকারভাবে করতে পেরেছে। সুশাসন এবং সিদ্ধান্তের প্রতি লেগে থাকার এই মানসিকতাই তাদের দ্রুত পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করেছে।
অভ্যন্তরীণ সংস্কার যত কঠোরই হোক না কেন, শুধু তা দিয়ে বিশাল ঋণের বোঝা নামানো যায় না। শ্রীলঙ্কা বিচক্ষণতার সঙ্গে তাদের আন্তর্জাতিক ঋণ পুনর্গঠন করেছে। চীন এবং অন্যান্য বেসরকারি বন্ডহোল্ডারদের সাথে ১৭.৫ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি হয়েছে। এটি ছিল কলম্বোর জন্য একটি বড় কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিজয়। এই চুক্তি দেশটিকে তাৎক্ষণিক ঋণের চাপ থেকে মুক্ত করে। তারা কিছুটা স্বস্তিতে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ পায়।
এর পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ ভারতের ভূমিকাও অনস্বীকার্য। সংকটের একদম শুরুতেই ভারত ৪ বিলিয়ন ডলারের জরুরি আর্থিক সহায়তা দিয়েছিল। এই সহায়তা শ্রীলঙ্কাকে বড় মানবিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করে। বাহ্যিক সমর্থন এবং অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার চমৎকার মেলবন্ধন ঘটেছিল। এর ফলেই শ্রীলঙ্কার পক্ষে সময়মতো বৈদেশিক ঋণের বাধ্যবাধকতাগুলো সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে। সামষ্টিক অর্থনীতিতে ফিরে এসেছে স্থিতিশীলতা।
সামষ্টিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছিল। আর প্রবৃদ্ধির মূল জ্বালানি জুগিয়েছে পর্যটন ও রেমিট্যান্স খাত। ২০২৪ সালে শ্রীলঙ্কায় পর্যটকদের আগমন ২০২৩ সালের তুলনায় ৩৮ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। পর্যটকের সংখ্যা ২০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। পর্যটকদের এই ঢল দেশটির শূন্য রিজার্ভকে আবার সমৃদ্ধ করতে শুরু করে।
এর পাশাপাশি যুক্ত হয়েছিল প্রবাসী শ্রীলঙ্কানদের পাঠানো রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবাহ। হুন্ডি বা অবৈধ পথ পরিহার করে ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে শুরু করেন প্রবাসীরা। সরকারের সুনির্দিষ্ট কিছু উদ্যোগের ফলে এই আস্থা ফিরে আসে। রেমিট্যান্সের এই প্রবাহ বৈদেশিক খাতের ওপর থেকে চাপ অনেকাংশে কমিয়ে আনে। এই দুই প্রধান চালিকাশক্তির সঙ্গে শিল্প ও আর্থিক সেবা খাতের উন্নতি যুক্ত হয়। ফলে ২০২৫ সালে প্রকৃত জিডিপি অর্জিত হয় ৫ শতাংশ। মাথাপিছু জাতীয় আয় ৪ হাজার ৪৯৬ ডলারের সীমা অতিক্রম করে। বিশ্বব্যাংক দেশটিকে আবারও উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা দেয়।
২০২৭ সালের চ্যালেঞ্জ
শ্রীলংকার এই অর্জনের পর আনন্দের জোয়ারে ভেসে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ এই পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আগামী দিনের বড় পরীক্ষা। ২০২৭ সালের মধ্যভাগ থেকে দেশটির স্থগিত হওয়া বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হবে। বর্তমানে যে স্বস্তি দেখা যাচ্ছে, তা মূলত সাময়িক। ঋণ পুনর্গঠন ও কিস্তি স্থগিত রাখার কারণেই এই স্বস্তি।
২০২৭ সালে যখন প্রকৃত অর্থেই আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের কিস্তি শোধ করতে হবে, তখন অর্থনীতির আসল শক্তি পরীক্ষা করা যাবে। সেই সময়ে শ্রীলঙ্কা কেবল বৈদেশিক সাহায্য, পর্যটন বা রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকতে পারবে না। তাদের প্রয়োজন হবে একটি টেকসই, উৎপাদনমুখী এবং রপ্তানি-নির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামো।
বাণিজ্য-ভিত্তিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে যদি নিজস্ব বৈদেশিক মুদ্রা তৈরি করা না যায়, তবে বিশ্বব্যাংকের দেওয়া এই মর্যাদা ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।
বাংলাদেশের শিক্ষা
শ্রীলঙ্কার এই তিন বছরের যাত্রা থেকে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক কিছু শেখার আছে। প্রথম শিক্ষাটি হলো- অর্থনৈতিক সংকট কখনোই চিরস্থায়ী নয়, যদি সঠিক ও কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সদিচ্ছা থাকে। দ্বিতীয়ত, সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য অর্থনৈতিক সত্যকে আড়াল করা বা কৃত্রিম উপায়ে মুদ্রা ও সুদের হার ধরে রাখা আত্মঘাতী।
তৃতীয় ও সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি হলো- রাজনৈতিক ঐকমত্য ও নীতির ধারাবাহিকতা। ক্ষমতার রদবদল হলেও দেশের অর্থনৈতিক মৌলিক কাঠামোর যেন কোনো ক্ষতি না হয়, সেই প্রাতিষ্ঠানিক পরিপক্বতা অর্জন করা জরুরি।
শ্রীলঙ্কার সাধারণ মানুষ বিগত তিন বছরে চরম কষ্ট সহ্য করেছে। তাদের এই ত্যাগ ও ধৈর্য বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাসে এক অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে। তারা প্রমাণ করেছে, সুশাসন, সঠিক নেতৃত্ব এবং জাতীয় শৃঙ্খলা থাকলে দেউলিয়া হওয়ার অন্ধকার সুড়ঙ্গ থেকেও আলোর মহাসড়কে ফিরে আসা সম্ভব। ২০২৭ সালের আসন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে কলম্বো তাদের এই অর্জনকে কতদূর টিকিয়ে রাখতে পারে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।