আহমেদ তোফায়েল। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হলো ব্যাংকিং খাত। একটি সুস্থ অর্থনীতিতে ব্যাংকের প্রধান কাজ আমানত সংগ্রহ করা। এরপর সেই টাকা বেসরকারি খাতে ঋণ হিসেবে দেওয়া। এই ঋণের সুদই ঐতিহাসিকভাবে ব্যাংকের আয়ের প্রধান উৎস। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই চিত্র পুরোপুরি উল্টে গেছে।
যে ব্যাংকগুলোর মূল কাজ ছিল ঋণ দেওয়া, তারা এখন সরকারের প্রধান পাওনাদার। ২০২১ সালেও ব্যাংকগুলোর আয়ের প্রধান ভিত্তি ছিল বেসরকারি ঋণের সুদ। মাত্র চার বছরের ব্যবধানে সেই সমীকরণ বদলে গেছে। ব্যাংকগুলো এখন ঋণ দেওয়ার চেয়ে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। আপাতদৃষ্টিতে ব্যাংকগুলোর মুনাফা বেশ ভালো দেখাচ্ছে। কিন্তু এই পরিবর্তন দেশের অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ব্যাংকগুলোর সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে এই পরিবর্তনের গতি বোঝা যায়। ২০২১ সালে দেশের প্রধান ৫২টি ব্যাংকের আয়ের প্রধান অংশ এসেছিল ঋণের সুদ থেকে। তখন মোট আয়ের প্রায় ৪৭ শতাংশ আসত এই খাত থেকে। অন্যদিকে সরকারি সিকিউরটিসহ বিভিন্ন বিনিয়োগ থেকে এসেছিল ৩৪ শতাংশ। বাকি ১৯ শতাংশ ছিল সেবা ও কমিশনভিত্তিক আয়। ২০২২ এবং ২০২৩ সালেও বিনিয়োগ থেকে আয় বাড়ার প্রবণতা দেখা গেছে। তবে তা ঋণের সুদকে ছাড়িয়ে যায়নি।
২০২৪ সালে এসে দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে বড় বদল ঘটে। এই প্রথমবার ব্যাংকগুলোর মূল ঋণ ব্যবসার আয়কে পেছনে ফেলে দেয় বিনিয়োগের আয়। আর ২০২৫ সালের চিত্রটি আরও ভিন্ন। এই বছরে ব্যাংকগুলোর মূল ব্যবসা বা নেট ইন্টারেস্ট ইনকাম মোট আয়ের মাত্র ৬ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে। এর বিপরীতে, সরকারি সিকিউরিটি ও বন্ড থেকে আসা আয় এক লাফে দাঁড়িয়েছে মোট আয়ের প্রায় ৭৩ শতাংশে। বাকি প্রায় ২০ শতাংশ এসেছে কমিশন ও অন্যান্য সেবা থেকে। অর্থাৎ, ব্যাংকগুলো এখন আয়ের জন্য পুরোপুরি সরকারি বন্ডের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। (সূত্র: ডেইলি স্টার:০২-০৭-২৬)
কিন্তু কেন?
ব্যাংকগুলোর বন্ডমুখী হওয়ার পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ খেলাপি ঋণের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি। বছরের পর বছর ধরে সুশাসনের অভাবে খেলাপি ঋণের বোঝা পাহাড়সম হয়েছে। খেলাপি ঋণের অর্থ হলো, ব্যাংক তার দেওয়া ঋণের বড় অংশ থেকে কোনো সুদ পাচ্ছে না। কিন্তু অন্যদিকে, আমানতকারীদের ঠিকই নিয়মিত সুদ দিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাংকের উচ্চ পরিচালন ব্যয়। ফলে ঋণের বিপরীতে মুনাফার মার্জিন প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
এমন পরিস্থিতে, ব্যাংকগুলোর সামনে মুনাফা বজায় রাখার পথ ছিল সীমিত। ঠিক এই সময়েই সরকার ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদের হার বাড়িয়ে দেয়। ব্যাংকগুলোর জন্য এটি একটি বড় সুযোগ হিসেবে আসে। বেসরকারি খাতে ঋণ দিলে খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আদায় প্রক্রিয়াও বেশ দীর্ঘ। কিন্তু সরকারি সিকিউরিটিতে বিনিয়োগ সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত। সরকার কখনোই খেলাপি হবে না। এই রাষ্ট্রীয় নিশ্চয়তার পাশাপাশি যখন চড়া সুদ মিলছে, তখন ব্যাংকগুলো আর ঝুঁকি নিতে চায়নি। তারা ব্যবসায়ীদের ঋণ না দিয়ে সরকারি কোষাগারে টাকা জমা দেওয়াকেই বুদ্ধিমানের কাজ মনে করেছে।
শান্তা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী মনিরুল ইসলাম বলেন, ব্যাংক স্বাভাবিকভাবেই কম ঝুঁকিতে বেশি মুনাফার খাতে বিনিয়োগ করবে। ট্রেজারি সিকিউরিটিতে বিনিয়োগের জন্য ব্যাংকগুলোর সামনে একটি স্পষ্ট প্রণোদনা ছিল।
বাণিজ্য মন্দা ও কমিশন আয়ের ধস
ব্যাংকগুলোর এই সংকট কেবল ঋণের সুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। তা ছড়িয়ে পড়েছে তাদের কমিশন আয়ের ক্ষেত্রেও। ডলার সংকটের কারণে গত কয়েক বছর ধরে আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্যে স্থবিরতা চলছে। এলসি খোলার ওপর কড়াকড়ি আরোপের ফলে বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট সেবা থেকে ব্যাংকগুলোর ফি ও কমিশন আয় কমেছে। তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে কমিশনভিত্তিক আয় আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৮ শতাংশ কমে গেছে।
কমিশন আয়ের আরেকটি বড় ধাক্কা এসেছে দেশের পুঁজিবাজার থেকে। যেসব ব্যাংকের নিজস্ব ব্রোকারেজ হাউস আছে, তারা বাজার থেকে ভালো কমিশন পেত। কিন্তু ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য বলছে, ২০২১ সালে পুঁজিবাজারে দৈনিক গড় লেনদেন ছিল ১ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা। ২০২২ সালে তা কমে হয় ৯৬০ কোটি টাকা। ২০২৩ সালে তা আরও কমে ৫৭৮ কোটি টাকায় নামে। ২০২৪ সালে তা নেমে আসে ৫৬৬ কোটি টাকায়। আর ২০২৫ সালে এসে দৈনিক গড় লেনদেন মাত্র ৫১ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকে। পুঁজিবাজারের এই চরম মন্দার কারণে ব্যাংকগুলোর ব্রোকারেজ হাউসের আয় প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বিকল্প পথ না থাকায় সরকারি বন্ডই হয়ে উঠেছে ব্যাংকগুলোর একমাত্র ভরসা।
অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি বিপদ
ট্রেজারি বন্ডের কল্যাণে ব্যাংকগুলোকে কাগজে-কলমে এখন বেশ লাভজনক দেখাচ্ছে। কোনো ঝুঁকি ছাড়াই তারা বিপুল মুনাফা ঘরে তুলছে। শেয়ারহোল্ডাররা এতে সাময়িকভাবে সন্তুষ্ট। তবে অর্থনীতিবিদ এবং প্রাজ্ঞ ব্যাংকাররা এই একক উৎসনির্ভর মুনাফার পেছনে দুটি বড় বিপদ দেখছেন।
প্রথমত, এটি বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকে সংকুচিত করছে। ব্যাংক যদি তার তহবিলের বড় অংশ সরকারকে ধার দেয়, তবে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা ঋণ পাবেন না। নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য ব্যাংক ঋণের বিকল্প নেই। ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়া বন্ধ রাখলে শিল্পায়ন স্থবির হয়ে পড়বে। এটি দীর্ঘমেয়াদে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক গতিকে ধীর করে দেবে। সরকার বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে টাকা নিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেই অর্থ মূলত চলতি ব্যয় মেটাতেই বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বাড়াচ্ছে না।
দ্বিতীয়ত, এই মুনাফার ধারা অত্যন্ত ভঙ্গুর। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান এই বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ইতিমধ্যেই এই প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মূল ভীতি হলো, ভবিষ্যতে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এলে সরকার যদি বন্ডের সুদের হার কমিয়ে দেয়, তখন ব্যাংকগুলোর আয়ের এই বিশাল উৎসটি ধসে পড়বে। সুদের হার কমলে শুরুতে হয়তো ব্যাংকগুলো কিছু মূলধনী মুনাফা পাবে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তাদের মোট আয় ধরে রাখা অসম্ভব হবে। তখন যদি ব্যাংকগুলোর মূল ঋণ ব্যবসা চালু না থাকে, তবে পুরো খাত এক গভীর সংকটে পড়বে।
সমাধানের পথ কোন দিকে?
বর্তমান এই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসা জরুরি। এর জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, ব্যাংকগুলোকে আবার ঋণের ব্যবসায় ফিরিয়ে আনতে ঋণ আদায়ের পরিবেশ উন্নত করতে হবে। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীন তদারকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ঋণ খেলাপি হবে না, এই আত্মবিশ্বাস ফিরে পেলেই ব্যাংকগুলো আবার বেসরকারি খাতে অর্থায়ন শুরু করবে।
দ্বিতীয়ত, সরকারকে ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে হবে। বাজেট ঘাটতি মেটাতে কর আদায় বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার এমন স্তরে রাখতে হবে যাতে তা ব্যাংকের জন্য একমাত্র আকর্ষণীয় বিকল্প না হয়ে ওঠে। পাশাপাশি দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং উৎপাদনশীল খাতগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে সহজ শর্তে ঋণ দিতে হবে। ব্যাংকগুলোকে বৈচিত্র্যময় ঋণ পোর্টফোলিও তৈরি করতে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। এছাড়া কমিশন আয় বাড়াতে হলে পুঁজিবাজারে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। এতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে এবং লেনদেনের খরা কাটবে। একই সঙ্গে ডলার সংকটের সমাধান করে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যকে স্বাভাবিক গতিতে ফেরাতে হবে।
পরিশেষে একটি দেশের ব্যাংকিং খাত যখন মূল চরিত্র হারিয়ে কেবল রাষ্ট্রকে অর্থায়নের নিরাপদ সংস্থায় পরিণত হয়, তখন তা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। বর্তমান বাস্তবতায় ব্যাংকগুলো টিকে থাকার স্বার্থে যে পথ বেছে নিয়েছে, তা হয়তো সাময়িক কৌশল। কিন্তু কাঠামোগতভাবে তা কোনো টেকসই সমাধান নয়। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সচল রাখতে হলে ব্যাংকগুলোকে উৎপাদনশীল খাতে ঋণ বিতরণের ধারায় ফিরতেই হবে। সাময়িক মুনাফার মোহে অন্ধ না হয়ে এখনই দূরদর্শী সংস্কার পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায়, বন্ডের সুদের জোয়ার যখন কমে যাবে, তখন ব্যাংকিং খাতের এই কৃত্রিম বুদবুদ ফেটে দেশের পুরো আর্থিক ব্যবস্থার জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
লেখক: বিজনেস এডিটর, দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ