বিএসইসি চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের মাসিক মূল বেতন অভূতপূর্ব হারে বৃদ্ধির একটি প্রস্তাবনাকে কেন্দ্র করে সরকারের বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা চলছে। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দেশের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের মাসিক মূল বেতন অভূতপূর্ব হারে বৃদ্ধির একটি প্রস্তাব সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
এই প্রস্তাবনাকে কেন্দ্র করে সরকারের বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিএসইসির চেয়ারম্যানের বর্তমান মূল বেতন ৮৬ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে একলাফে ৬ লাখ টাকা এবং কমিশনারদের বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে ৪ লাখ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে এই প্রস্তাবনায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রস্তাব অনুমোদন পেলে চেয়ারম্যানের বেতন বৃদ্ধি পাবে প্রায় ৫৯৮ শতাংশ এবং কমিশনারদের বেতন বাড়বে প্রায় ৪১৩ শতাংশ। দেশের সরকারি বেতন কাঠামোর ইতিহাসে এমন নজিরবিহীন ও আকাশচুম্বী বেতন বৃদ্ধির ঘটনা বিরল।
ফলে এই সিদ্ধান্ত পুঁজিবাজারে কর্মদক্ষতা ও সুশাসন নিশ্চিত করার কোনো কৌশল, নাকি এটি নতুন কোনো প্রশাসনিক বৈষম্য ও নৈতিক সংকটের জন্ম দেবেÑ তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বর্তমানে জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫ অনুযায়ী, সরকারের সর্বোচ্চ আমলাতান্ত্রিক পদ মন্ত্রিপরিষদ সচিবের মূল বেতন ৮৬ হাজার টাকা। সেই তুলনায় বিএসইসি চেয়ারম্যানের প্রস্তাবিত নতুন বেতন সরকারি কাঠামোর এই সর্বোচ্চ সীমাকেও প্রায় সাত গুণ ছাড়িয়ে যাবে।
একইভাবে কমিশনারদের জন্য প্রস্তাবিত ৪ লাখ টাকার অঙ্কটিও সরকারের অধিকাংশ সিনিয়র সচিব, সচিব এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের বেতনের চেয়ে বহুগুণ বেশি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক একাধিক কর্মকর্তার মতে, সুনির্দিষ্ট কোনো সংস্থাকে এভাবে ব্যতিক্রমী আর্থিক সুবিধা দেওয়া হলে তা সামগ্রিক প্রশাসনিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। এর ফলে অন্যান্য স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থাও সমপর্যায়ের দাবি তুলতে উৎসাহিত হবে।
তবে এই প্রস্তাবের পক্ষে পুঁজিবাজারের আর্থিক খাতের উপযোগী ও দক্ষ পেশাজীবী আকর্ষণের যুক্তি দেওয়া হচ্ছে।
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রণ করার জন্য করপোরেট ফাইন্যান্স, মার্চেন্ট ব্যাংকিং, ক্যাপিটাল মার্কেট, রিস্ক ম্যানেজমেন্ট এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের মতো বিষয়ে গভীর জ্ঞান থাকা দরকার।
বেসরকারি খাতে এই ধরনের যোগ্য পেশাদাররা মাসে লাখ লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক পান।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান সরকারি বেতন কাঠামো দিয়ে এই মানের দক্ষ কর্মকর্তাদের আকৃষ্ট করা অসম্ভব। এ ছাড়া উচ্চ আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তারা বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের চাপ ও প্রলোভনের ঊর্ধ্বে থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন, যা পরোক্ষভাবে দুর্নীতি প্রতিরোধে ভূমিকা রাখবে।
কিন্তু এই যুক্তি নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা। গত এক যুগে দেশের পুঁজিবাজারে একাধিক ধস, কারসাজি, আইপিও জালিয়াতি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকটের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে হাজার হাজার ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী নিঃস্ব হয়েছেন। বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অভিযোগও উঠেছে বারবার।
বিশ্লেষকদের মতে, শীর্ষ কর্মকর্তাদের বেতন কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিলেই কোনো প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা কিংবা জবাবদিহিতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৃদ্ধি পায় না। প্রতিষ্ঠানের সফলতার জন্য প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত পরিবেশ এবং স্বচ্ছতা বেশি জরুরি।
জনপ্রশাসন বিশ্লেষকদের মতে, প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে সরকারের ওপর বিপুল আর্থিক চাপ সৃষ্টির পাশাপাশি দুদক, বিটিআরসি, আইডিআরএ বা এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের মতো সংস্থাগুলো থেকেও একই ধরনের বেতন বৃদ্ধির দাবি আসবে। চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপের এই অর্থনৈতিক বাস্তবতায় অল্প কিছু কর্মকর্তার জন্য এমন বিশেষ সুবিধা জনমনে নেতিবাচক সামাজিক ও নৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। যদিও উন্নত বিশ্বে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রকদের আকর্ষণীয় বেতন দেওয়া হয়, তবে সেখানে কঠোর কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন, সংসদীয় নজরদারি এবং স্বাধীন অডিট ব্যবস্থা কার্যকর থাকে, যা বাংলাদেশে অনুপস্থিত।
এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, পুঁজিবাজারের মতো উচ্চঝুঁকিপূর্ণ খাতে দক্ষ জনবল আকর্ষণের জন্য প্রতিযোগিতামূলক বেতনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবে এই বৃদ্ধি এমন পর্যায়ে হওয়া উচিত নয়, যা রাষ্ট্রীয় বেতন কাঠামোর ভারসাম্য নষ্ট করে এবং প্রশাসনে অসন্তোষের জন্ম দেয়।
তিনি মনে করেন, বেতন বাড়ানোর আগে সরকারের উচিত সব স্বায়ত্তশাসিত ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্য একটি সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন করা।