চট্টগ্রাম
এলাচ। ফাইল ছবি
ভোগ্যপণ্যের অন্যতম পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে এলাচের বেপরোয়া ট্রেডিং হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সাধারণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, চলতি বছরের এই কয়েক মাসে দেশে এলাচের আমদানি কম হলেও বাজারে এলাচের ডিও (ডিমান্ড অর্ডার) বেচাকেনা হচ্ছে বেশি। একশ্রেণির অসাধু ও বহিরাগত ব্যবসায়ী নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ডিও স্লিপের মাধ্যমে এলাচ বিক্রি করছেন। এতে বাজারে পণ্যমূল্যের স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে। অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ে পণ্য প্রাপ্তি নিয়েও তৈরি হচ্ছে শঙ্কা। এ অবস্থায় প্রকৃত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করার জন্য গতকাল বৃহস্পতিবার সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন।
খাতুনগঞ্জের মসলা আমদানিকারক গুলিস্তান ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী আব্দুর রাজ্জাক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, খাতুনগঞ্জের একশ্রেণির ব্যবসায়ী এলাচের ডিও স্লিপ বিক্রি করছেন কিন্তু ক্রেতাকে পণ্য বুঝিয়ে দিতে পারছেন না। তারা বলছেন, ডিও কেনার এক মাস পরে পণ্য ডেলিভারি দেবে।
এটি বাজারে দুই ধরনের সমস্যা তৈরি করছে বলে জানিয়েছেন খাতুনগঞ্জের এই ব্যবসায়ী। আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ডিও বিক্রির এক মাস পরে পণ্য বুঝিয়ে দেওয়ার কারণে প্রথমত, এক মাস পর তারা আদৌ পণ্য বুঝিয়ে দিতে পারবেন কি না সেটি নিয়ে শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। কারণ তারা পণ্য আমদানি না করেই এলাচের ডিও বিক্রি করছেন। আমরা অতীতে দেখেছি অনেকে এভাবে ডিও বিক্রি করে পণ্য বুঝিয়ে না দিয়ে পালিয়ে গেছেন। দ্বিতীয় সমস্যা হচ্ছে, তাদের বেপোরোয়া ডিও বিক্রির কারণে প্রকৃত আমদানিকারকরা লোকসানে পড়ছেন। যে কারণে তারাও এলাচ আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন।
চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়ে এলাচ আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ করেও দেখা যায়, গত দুই তিন মাসে এই সমুদ্রবন্দর দিয়ে এলাচ আমদানি কমেছে। উদ্ভিদ সংঘ নিরোধ চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ১০ মে পর্যন্ত চলতি অর্থবছরের এই ১০ মাস ১০ দিনে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়ে এলাচ আমদানি হয়েছে ১ হাজার ১৫০ মেট্রিক টন। যেখানে তার আগের অর্থবছরের (২০২৪-২৫) প্রথম ১০ মাসে আমদানি হয়েছিল ১ হাজার ৬১৩ মেট্রিক টন।
এলাচ আমদানির মাসভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত জানুয়ারি মাসে আমদানি হয় ৭৯ মেট্রিক টন। এরপর ফেব্রুয়ারি এবং মার্চ মাসে আমদানি কিছুটা বাড়লেও এপ্রিল মাসে এসে এলাচ আমদানি আবার কমে যায়। মার্চ মাসে যেখানে ১৫৩ মেট্রিক টন এলাচ আমদানি হয়, সেখানে এপ্রিল মাসে আমদানি হয়েছে মাত্র ৪৩ মেট্রিক টন। যেখানে ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে আমদানি হয়েছিল ৯৭ মেট্রিক টন। আর মে মাসে আমদানি হয়েছিল ১৫৯ মেট্রিক টন।
খাতুনগঞ্জে পণ্য বিক্রি হয় ডিও স্লিপের মাধ্যমে। মিল মালিক অথবা আমদানিকারকের হয়ে ট্রেডিং হাউসগুলো পণ্যের ডিও স্লিপ বিক্রি করেন। সাধারণ ব্যবসায়ীরা তাদের কাছ থেকে ডিও স্লিপ কিনে আমদানিকারকের গুদাম থেকে পণ্য খালাস নেন। এই ক্ষেত্রে দেখা যায়, ডিও স্লিপটি একাধিকবার বেচাকেনা হয়। প্রথম যিনি ডিও স্লিপ কেনেন, তিনি কিছুটা লাভ পেলে আরেকজনের কাছে বিক্রি করে দেন। এই ডিও স্লিপ হাত বদল হলেই বাজারে বেড়ে যায় পণ্যের দাম। এভাবে কয়েক দফায় হাত বদলের পর পণ্যটি বাজারে সরবরাহ করা হয়।
পণ্য গুদামে অথবা মিলে আসার পর এই ডিও স্লিপ বেচাকেনার নিয়ম থাকলেও সম্প্রতি এলাচের ডিও বিক্রির ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, আমদানি করা এলাচ দেশে আসার আগেই ডিও স্লিপ বিক্রি করছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। যে কারণে এখন ডিও বিক্রি করলেও এক মাসের আগে পণ্য সরবরাহ করতে পারছেন না তারা। এতে দীর্ঘ এক মাসের মধ্যে একাধিকবার ডিও স্লিপ হাত বদল হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আর যতবার হাত বদল হবে ততবারই বাজারে বাড়বে দাম। অস্থিরতা তৈরি হবে এলাচের বাজারে।
এর আগে ২০২৪ সালের জুন মাসে এভাবে এলাচের ডিও বিক্রি করে সাধারণ ব্যবসায়ীদের প্রায় ৫ কোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে যান এক এলাচ ব্যবসায়ী। ওই সময় ব্যবসায়ীর কাছে এলাচের ডিও বিক্রি করে টাকা নগদায়ন করে হঠাৎ মোবাইল বন্ধ করে গা ঢাকা দেন খাতুনগঞ্জের সোনামিয়া মার্কেটের ‘নূর ট্রেডিংয়’র মালিক নাজিম উদ্দিন। এর আগেও ডিও বিক্রি করে পণ্য বুঝিয়ে না দিয়ে টাকা নিয়ে পালিয়ে যাওযার একাধিক ঘটনা ঘটেছে খাতুনগঞ্জে।
এ অবস্থায় সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন। গতকাল সংগঠনটির পক্ষ থেকে জারি করা সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আপনাদের সদয় অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, খাতুনগঞ্জ একটি ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে অত্যন্ত সুপরিচিত। এলাকায় দীর্ঘদিন যাবৎ ধরে অত্যন্ত সততা ও নিয়মশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় কিছু অসাধু ও বহিরাগত ব্যবসায়ী নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ডিও স্লিপের মাধ্যমে এলাচি, পামওয়েলসহ অন্যান্য ভোগ্যপণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। যে কারণে অনেক ব্যবসায়ী আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। তাই ভোগ্যপণ্যের ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে খাতুনগঞ্জস্থ যে সকল ব্যবসায়ী নিয়মশৃঙ্খলা ও সুনামের সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন তাদের সাথে লেনদেন করার জন্য খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ হতে অনুরোধ জানানো হলো।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. আমিনুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বিভিন্ন সময় আমরা দেখেছি পণ্য ছাড়া ডিও কিনে অনেক সাধারণ ব্যবসায়ী প্রতারিত হয়েছেন। অসাধু ব্যবসায়ীরা ডিও বিক্রি করে পণ্য না বুঝিয়ে দিয়ে টাকা নিয়ে গা ঢাকা দেন। সম্প্রতি খাতুনগঞ্জে এলাচ বেচাকেনার ক্ষেত্রে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। তাই কোনো ব্যবসায়ী যাতে এ ধরনের ফাঁদে না পড়েন, সেজন্য ব্যবসায়ীদের সতর্ক করতে আমরা এ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছি।