চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ
চিনির বাজারে অস্থিরতা। ছবি: সংগৃহীত
এক মাস আগে ভোগ্যপণ্যের অন্যতম পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে প্রতি মণ (৩৭ দশমিক ৩৩ কেজি) চিনি বিক্রি হয়েছিল ৩ হাজার ৩৬০ টাকায়। গত সোমবার একই চিনি প্রতি মণ বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৬২০ টাকায়। ফলে এক মাসের ব্যবধানে মণপ্রতি পণ্যটির দাম বেড়েছে অন্তত ২৬০ টাকা।
ব্যবসায়ীরা
জানিয়েছেন, দেড় মাস ধরে খাতুনগঞ্জে চিনির বাজার ঊর্ধ্বমুখী। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়
থেকে সেখানে পণ্যটির দাম বাড়তে শুরু করে। তখন এক সপ্তাহের ব্যবধানে মণপ্রতি দাম বেড়ে
যায় ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত। এরপর মে মাসের শুরুতে বাজার কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও
এক সপ্তাহ ধরে আবারও দাম বাড়ছে। সর্বশেষ এক সপ্তাহে মণপ্রতি চিনির দাম বেড়েছে অন্তত
১২০ টাকা। এক সপ্তাহ আগে যেখানে প্রতি মণ বিক্রি হয়েছিল ৩ হাজার ৫০০ টাকায়, সোমবার
তা বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৬২০ টাকায়। এ হিসাবে পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি চিনি বিক্রি
হচ্ছে প্রায় ৯৭ টাকায়।
খাতুনগঞ্জে
পণ্যটির দাম বৃদ্ধির পেছনে মিল মালিকদের কারসাজি রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ীরা।
তাদের দাবি, ২০২৪ সালের শুরুর দিকে খাতুনগঞ্জে প্রতি মণ চিনি বিক্রি হয়েছিল ৪ হাজার
৪০০ থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকায়। তবে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর
বাজারে পণ্যটির দাম কমতে শুরু করে।
নাম
প্রকাশে অনিচ্ছুক খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির এক নেতা প্রতিদিনের
বাংলাদেশকে জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পরিশোধিত চিনি আমদানির সুযোগ পাওয়ায় ওই
সময় মিল মালিকদের পাশাপাশি সাধারণ ব্যবসায়ীরাও আমদানিতে যুক্ত হন। এতে মিল মালিকরা
বাজারে সরবরাহ বাড়িয়ে দাম কমিয়ে দেন। ফলে হঠাৎ করে এই ব্যবসায় প্রবেশ করা সাধারণ ব্যবসায়ীরা
লোকসানের মুখে পড়েন। এরপর লোকসানের কারণে অনেক সাধারণ ব্যবসায়ী চিনি ব্যবসা থেকে সরে
দাঁড়ান। ফলে খাতুনগঞ্জের চিনির বাজার আবারও মিল মালিকদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এই নিয়ন্ত্রণ
ফিরে পাওয়ার পর জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে মিল মালিকরা বাজারে আবারও চিনির
দাম বাড়াচ্ছেন বলে ওই ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন।
এদিকে
খাতুনগঞ্জে পাইকারি বাজারে যখন চিনির দাম বাড়ছে, তখন আন্তর্জাতিক বাজারে দেখা যাচ্ছে
উল্টো চিত্রÑ সেখানে পণ্যটির দাম কমছে। গত ১ এপ্রিল আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি কেজি
চিনি বিক্রি হয়েছিল ৩৩ সেন্টে। এরপর তিন দিনের ব্যবধানে দাম কমে ২৮ সেন্টে নেমে আসে।
তবে সর্বশেষ সোমবার আবার তা বেড়ে ৩৩ সেন্টে দাঁড়িয়েছে। প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসেবে
প্রতি কেজি চিনির দাম দাঁড়ায় ৪০ টাকায়।
দাম
ঊর্ধ্বমুখী হলেও খাতুনগঞ্জে চিনির কোনো সংকট নেই বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি,
বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। চিনি আমদানির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের
প্রথম ১০ মাসে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় চিনি আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হয়েছে।
এমনকি দেশে চিনির বার্ষিক যে চাহিদা, তার চেয়েও বেশি চিনি এই সময়ে আমদানি করা হয়েছে।
সরকারি
হিসাব অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে চিনির বার্ষিক চাহিদা ২৩-২৪ লাখ মেট্রিক টন। অথচ চলতি
অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত মিলিয়ে চিনি আমদানি হয়েছে ৩১ লাখ ৯৪
হাজার ৭৯৩ মেট্রিক টন। কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরের জুলাই থেকে ২৮ এপ্রিল
পর্যন্ত সময়ে দেশে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত চিনি আমদানি হয়েছিল ২৫ লাখ ৬৪ হাজার ৭১৩ মেট্রিক
টন। এর মধ্যে অপরিশোধিত চিনি ছিল ২৩ লাখ ৫৭ হাজার ৮১ মেট্রিক টন এবং পরিশোধিত চিনি
২ লাখ ৭ হাজার ৬৩২ মেট্রিক টন।
অন্যদিকে
চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত মিলিয়ে মোট
চিনি আমদানি হয়েছে ৩১ লাখ ৯৪ হাজার ৭৯৩ মেট্রিক টন। এর মধ্যে অপরিশোধিত চিনি ৩০ লাখ
১২ হাজার ২৪৭ মেট্রিক টন এবং পরিশোধিত চিনি ১ লাখ ৮২ হাজার ৩২০ মেট্রিক টন। এই হিসাবে
চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় পরিশোধিত চিনি আমদানি ২৫
হাজার ৩১২ মেট্রিক টন কম হলেও অপরিশোধিত চিনি আমদানি বেড়েছে ৬ লাখ ৫৫ হাজার ৩৯১ মেট্রিক
টন।
খাতুনগঞ্জ
ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের আইন বিষয়ক সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন প্রতিদিনের
বাংলাদেশকে বলেন, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও বর্তমানে চিনির দাম ঊর্ধ্বমুখী। তার মতে,
এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি মণ চিনি অন্তত ১০০ টাকা বেড়েছে। সপ্তাহখানেক আগেও খাতুনগঞ্জে
প্রতি মণ চিনি ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৫২০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। অথচ মঙ্গলবার তা
বেড়ে ৩ হাজার ৬২০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া দেড় মাসের ব্যবধানে প্রতি মণ চিনি ২৫০ থেকে
৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
এদিকে
দেড় মাসের ব্যবধানে মণপ্রতি প্রায় ৩০০ টাকা দাম বাড়লেও আন্তর্জাতিক বাজারে দেখা যাচ্ছে
উল্টো চিত্র। গত বছরের অক্টোবর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে ধারাবাহিকভাবে চিনির দাম কমছে।
অক্টোবর মাসে যেখানে প্রতি কেজি চিনি ৩৫ থেকে ৩৭ সেন্টে বিক্রি হয়েছিল, সেখানে সোমবার
তা নেমে এসেছে ৩৩ সেন্টে। এই হিসাবে ছয় মাসের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম
মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে।
বিজনেস
ইনসাইডারের তথ্য অনুযায়ী, ছয় মাস আগে গত বছরের ১৭ অক্টোবর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি
কেজি চিনি বিক্রি হয়েছিল ৩৭ সেন্টে। প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসাবে ওই সময় আন্তর্জাতিক
বাজারে প্রতি কেজি চিনির দাম দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৪৫ টাকায়। নভেম্বর মাসে দাম আরও কমে
গিয়ে প্রতি কেজি চিনি ৩০ সেন্টে বিক্রি হয়, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪০ টাকা। এরপর
ডিসেম্বর মাসে দাম কিছুটা বাড়লেও ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে আবার কমে যায়। ১৬ মার্চ আন্তর্জাতিক
বাজারে প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হয় ৩০ সেন্টে, তখন বাংলাদেশি টাকায় এর মূল্য ছিল প্রায়
৩৮ টাকা। পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম সামান্য ওঠানামা করলেও কখনোই ৩৫ সেন্টের
বেশি হয়নি। ২৭ এপ্রিল প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হয়েছিল ৩০ সেন্টে। প্রতি ডলার ১২২ টাকা
হিসাবে তখন বাংলাদেশি মুদ্রায় এর দাম ছিল প্রায় ৩৮ টাকা। সর্বশেষ সোমবার আন্তর্জাতিক
বাজারে প্রতি কেজি চিনি ৩৩ সেন্টে বিক্রি হয়েছে, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৪০ টাকা।
এস
আলম গ্রুপের কারখানায় পরিশোধিত চিনি বাজারজাত করছে মীর গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ আব্দুস সালাম
বলেন, বর্তমানে বাজারে আবুল খায়ের গ্রুপ ও মেঘনা গ্রুপ ছাড়া অন্যদের চিনি সরবরাহ তুলনামূলকভাবে
কম।
তিনি
বলেন, সিটি গ্রুপ এলসি খুলতে পারছে না, এস আলমের কারখানা বন্ধ রয়েছে এবং আব্দুল মোনায়েম
গ্রুপের অবস্থাও একই। এসব প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে চিনির দাম বাড়ছে।
আব্দুস
সালাম জানান, পরিশোধিত চিনি আমদানির জন্য তারা অনুমতি চেয়েছিলেন। তবে বর্তমানে এ ধরনের
চিনি আমদানিতে ভ্যাট ও ট্যাক্স বেশি থাকায় খরচও বেশি পড়ছে। তার মতে, সরকার যদি চিনি
আমদানিতে রাজস্ব কমায়, তাহলে বাজারে আবারও দাম কমে আসবে।