× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বাজেট এলোমেলো ভর্তুকির চাপে

আবু কাওসার

প্রকাশ : ১৪ মে ২০২৬ ১৪:০৮ পিএম

আপডেট : ১৪ মে ২০২৬ ১৪:১১ পিএম

বাড়তি ভর্তুকির কারণে বড় ধরনের আর্থিক চাপে পড়েছে সরকার। এলোমেলো হয়ে গেছে বাজেটের সব হিসাব-নিকাশ। প্রতীকী ছবি

বাড়তি ভর্তুকির কারণে বড় ধরনের আর্থিক চাপে পড়েছে সরকার। এলোমেলো হয়ে গেছে বাজেটের সব হিসাব-নিকাশ। প্রতীকী ছবি

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গত জুনে যখন ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করে, তখন বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৬০ ডলার। ওই দামে তেল আমদানি করে দেশের বাজারে বিক্রি করে সরকারি বিপণনকারী সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসি লাভ করত। যে কারণে চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে জ্বালানি আমদানিতে ভর্তুকি রাখা হয়নি। গত ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে আকস্মিক যুদ্ধ শুরু হলে দ্রুত পাল্টে যায় পরিস্থিতি। যুদ্ধের প্রভাবে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বেড়ে যায়। বর্তমানে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে, যা কিছুদিন আগে ১১২ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে গত আড়াই মাসে বিশ্ববাজারে অত্যন্ত স্পর্শকাতর এই পণ্যটির দাম প্রায় ৮৭ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। 

অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে এখন সরকারকে বেশিদামে আমদানি করে দেশের বাজারে তার চেয়ে কমদামে বিক্রি করতে হচ্ছে। ফলে লাভের পরিবর্তে বিপিসিকে এখন লোকসান গুনতে হচ্ছে। এই লোকসান এড়াতে জ্বালানি তেলে মোটা অঙ্কের ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই খাতে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি দিতে হয়েছে সরকারকে। বাড়তি ভর্তুকির কারণে বড় ধরনের আর্থিক চাপে পড়েছে সরকার। এলোমেলো হয়ে গেছে বাজেটের সব হিসাব-নিকাশ। একদিকে সরকারের প্রত্যাশিত আয় কমে গেছে, অন্যদিকে বেড়েছে ব্যয়। তার সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ভর্তুকির অতিরিক্ত চাপ। এমন পরিস্থিতিতে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করা হবে। ১১ জুন জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অর্থনীতিবিদসহ ব্যবসায়ীরা বলেছেন, জ্বালানির সংকট মোকাবিলা করাই হবে নতুন অর্থমন্ত্রীর প্রধান চ্যালেঞ্জ। 

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশে বছরে ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি হয়। এই তেলের বড় একটি অংশ ব্যবহার হয় বিদ্যুৎ উৎপাদনে। পাশাপাশি পরিবহন ও কৃষিকাজেও জ্বালানি ব্যবহার হচ্ছে। এ ছাড়া গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনও বাড়ছে দেশে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এ দুটি জ্বালানিপণ্যের দাম বাড়লে বাজেটে ভর্তুকি ব্যয় বাড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০ ডলার বাড়লে আমদানি ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। আর তা যদি ১৫০ ডলারে উঠে যায় তাহলে আমদানি ব্যয় কয়েক বিলিয়ন ডলার বাড়তে পারে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি করবে। 

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকিতে ৬১ শতাংশ বরাদ্দ থাকছে তিন খাতে। এগুলো হচ্ছেÑ বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সার। এর মধ্যে বিদ্যুৎ ৩৭ হাজার কোটি টাকা, গ্যাস (এলএনজি) সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা ও সার ২৭ হাজার কোটি টাকা। সব মিলে এসব খাতে ৭০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ভর্তুকির প্রস্তাব করা হচ্ছে, যা মোট বরাদ্দের প্রায় ৬১ শতাংশ। এবারের বাজেটে ভর্তুকিতে মোট বরাদ্দ থাকছে ১ লাখ ১৬ হাজার ১২৫ কোটি টাকাÑ যা এযাৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই বরাদ্দ মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির ১ দশমিক ৭০ শতাংশ। সূত্র জানায়, এখন বাজেটে মোট ব্যয়ের ২০ শতাংশ চলে যায় ভর্তুকিতে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের এক কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের ফলে উদ্ভূত বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিদ্যুৎ, সার ও গ্যাসে ভর্তুকি বাবদ অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রয়োজন হবে। 

ভর্তুকি একটি অনুৎপাদনশীল খাত। এটি বাড়লে সামাজিক সুরক্ষাসহ সরকারের অন্যান্য কল্যাণমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়ন ব্যাহত হয়। তাই এই খাতে বাজেটে ব্যয় কমিয়ে আনার জন্য অনেক বছর থেকে তাগিদ দিয়ে আসছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। বিদ্যুৎ, কৃষি, রপ্তানিসহ ধীরে ধীরে সব খাত থেকে ভর্তুকি তুলে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে ওয়াশিংটনভিত্তিক বাংলাদেশের এই উন্নয়ন সহযোগী। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে দেশের অর্থনীতিতে ভর্তুকির চাপ ক্রমশ বাড়ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা হিসাব করে দেখেছেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সার, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস-এলএনজি ও জ্বালানি তেলের দাম যে পর্যায়ে চলে গেছে তাতে দেশে ওইসব পণ্যের দাম না বাড়ালে ভর্তুকি আরও বাড়বে। এতে করে বাড়বে বাজেট ঘাটতি। বিরূপ প্রভাব পড়বে মূল্যস্ফীতিতে। কষ্ট বাড়বে সাধারণ মানুষের। চাপে পড়বে দেশের অর্থনীতি।

বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে জ্বালানি তেল, সার, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানোর বিকল্প নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, সরকারের আর্থিক চাপ রয়েছে। কারণ ব্যয় অনুযায়ী আয় বাড়েনি। ভর্তুকির যেসব খাত রয়েছে সেগুলোতে জনগুরুত্ব বিবেচনা করে বরাদ্দ দেওয়া উচিত। কৃষি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে ভর্তুকি অব্যাহত রাখতে হবে। পাশাপাশি অন্য যেসব খাতে বরাদ্দ আছে সেগুলোতে বরাদ্দে লাগাম টানতে হবে।

কৃষি, জ্বালানিসহ বর্তমানে সাত-আটটি খাতে ভর্তুকি দেয় সরকার। বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বেশি। সরকার উৎপাদন খরচের চেয়ে কম মূল্যে বিদ্যুৎ বিক্রি করায় এ খাতে প্রতিবছর বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। 

খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি উৎপাদন যাতে ব্যাহত না হয়, সে জন্য সরকার সারের দাম বাড়াতে চায় না। এ জন্য আগামী বাজেটে সারে মোট ২৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারের যে অবস্থা তাতে এই ভর্তুকিতে কুলানো সম্ভব হবে না। আরও বাড়াতে হবে। 

দুস্থ ও গরিব জনগণের কাছে সাশ্রয়ী দামে চাল বিক্রি করে সরকার। এ জন্য ওএমএস বা খোলাবাজার, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিসহ নানা ধরনের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু আছে। এ ছাড়া টিসিবির ট্রাকে খাদ্যপণ্য বিক্রি করা হয়। আগামী বাজেটে এসব কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে খাদ্য খাতে ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকছে। রপ্তানিকে উৎসাহিত করতে নগদ প্রণোদনা দেওয়া হয়। এটিও এক ধরনের ভর্তুকি। এ জন্য আগামী বাজেটে এ খাতে ৭ হাজার ৮২৫ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায়ও প্রয়োজনীয় এলএনজি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সরকারকে স্পট মার্কেট থেকে দুই থেকে তিনগুণ বেশিদামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। আগামী বাজেটে এ খাতে সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এ ব্যয় আরও বাড়তে পারে।

বৈধ পথে (ব্যাংকিং চ্যানেল) প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত করতে ৫ শতাংশ হারে নগদ প্রণোদনা দেওয়া হয়। জানা গেছে, আগামী বাজেটে এই সুবিধা অব্যাহত রাখা হচ্ছে। এ জন্য ৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ থাকছে। পাট ও পাটজাত পণ্য ব্যবহার বাড়াতে রপ্তানিতে নগদ প্রণোদনা দিয়ে আসছে সরকার। এ জন্য ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব থাকছে। এ ছাড়া অন্যান্য খাতে ১২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হচ্ছে। সব মিলে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি বাবদ ১ লাখ ১৬ হাজার ১২৫ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা