প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৬ ১৫:৪৫ পিএম
আপডেট : ১৩ মে ২০২৬ ১৭:০৭ পিএম
একনেক সভায় চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে দেশের বহুল আলোচিত পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প। ছবি: পিএমও
প্রায় ছয় দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নের জন্য চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে দেশের বহুল আলোচিত পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প।
প্রকল্পটির প্রথম ধাপ বাস্তবায়নে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে, যা সরকারি তহবিল থেকেই বহন করা হবে।
বাংলাদেশ সচিবালয়ে বুধবার প্রধানমন্ত্রী ও জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি একনেকের চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়।
দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা এই প্রকল্পটি অবশেষে অনুমোদনের মধ্য দিয়ে বাস্তবায়নের পথে এগোল।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার পদ্মা নদীর ওপর ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল ব্যারেজ নির্মাণ করা হবে। এই ব্যারেজে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডার স্লুইস এবং দুটি ফিশ পাস থাকবে। এর মাধ্যমে প্রায় ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংরক্ষিত পানি বণ্টনের জন্য তিনটি অফটেক অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের অংশ হিসেবে ১১৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে, যা জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহে ভূমিকা রাখবে।
এই প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য হলো পদ্মা নদীর ওপর নির্ভরশীল দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের পানির সংকট নিরসন করা। নথিতে বলা হয়েছে, দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ জমি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পদ্মা নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল। শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় এসব এলাকায় কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ নদীর পানিপ্রবাহ পুনরুজ্জীবিত হবে। এগুলো হলো হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল এবং ইছামতী নদী। শুষ্ক মৌসুমে এসব নদীতে প্রায় ৮০০ কিউসেক মিটার পানি সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে।
এছাড়া সুন্দরবন অঞ্চলে লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণেও এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পদ্মা নদীর প্রবাহ বাড়ানো গেলে দক্ষিণাঞ্চলের নদীগুলোতে মিষ্টি পানির প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে, যা জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সহায়ক হবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বৃহত্তর কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের প্রায় ২৯ লাখ হেক্টর কৃষি জমিতে সেচের পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এর ফলে বছরে প্রায় ২৪ লাখ টন ধান এবং ২ দশমিক ৩৪ লাখ টন মাছের উৎপাদন বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
এতে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ছাড়াও মৎস্য খাতের সম্প্রসারণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি নৌ চলাচল পুনরুদ্ধার এবং নদীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও সক্রিয় হবে।
প্রকল্পের নথিতে বলা হয়েছে, এই ব্যারেজ বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় আট হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাবে।
পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে শুষ্ক মৌসুমে পানির ঘাটতি। বিশেষ করে ভারতের ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পর পদ্মা নদীতে পানির প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এর ফলে পদ্মার সঙ্গে সংযুক্ত বিভিন্ন শাখা নদী শুকিয়ে পড়ে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য ও নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় আকারের পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। সে ধারাবাহিকতায় পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পটি চূড়ান্ত রূপ পেয়েছে।
ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, এ ধরনের প্রকল্পের ধারণা প্রথম উঠে আসে ১৯৬১ সালে। পরবর্তীতে ২০০২ সালে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। এরপর ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়া ও পাকিস্তানের বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়।
এরপর ২০১৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকল্পটির নকশা প্রণয়নে কাজ করে। দীর্ঘ এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অবশেষে প্রকল্পটি একনেকের অনুমোদন পেল।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সময়সীমা ধরা হয়েছে ২০২৬ সাল থেকে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত। এই সময়ের মধ্যে ব্যারেজ নির্মাণ, অবকাঠামো স্থাপন এবং সংশ্লিষ্ট সব কাজ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বলছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের পানি ব্যবস্থাপনায় একটি বড় পরিবর্তন আসবে এবং দীর্ঘদিনের পানির সংকট নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।