× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

১৫০ ভবন নির্মাণে জ্বালানির হিসাব ৩ গুণের বেশি!

আরমান হেকিম

প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৬ ০৮:৪১ এএম

আপডেট : ১৩ মে ২০২৬ ০৯:০০ এএম

‘সমন্বিত উপজেলা ভূমি কমপ্লেক্স নির্মাণ’ প্রকল্পটি আজ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে উপস্থাপন করা হচ্ছে।। ছবি: সংগৃহীত

‘সমন্বিত উপজেলা ভূমি কমপ্লেক্স নির্মাণ’ প্রকল্পটি আজ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে উপস্থাপন করা হচ্ছে।। ছবি: সংগৃহীত

১৫০টি উপজেলায় ভবন নির্মাণের প্রকল্প, কিন্তু জ্বালানি তেলের হিসাব করা হয়েছে তা ৫৩০টি উপজেলার সমপরিমাণ। যা প্রকল্পের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি। এমন অসামঞ্জস্য নিয়েই ১৪০৯ কোটি টাকার ‘সমন্বিত উপজেলা ভূমি কমপ্লেক্স নির্মাণ’ প্রকল্প আজ বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে উপস্থাপন করা হচ্ছে। শুরুতেই ব্যয়ের এই গরমিল প্রকল্পটির পরিকল্পনা ও আর্থিক শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের কারিগরি সহায়তায় দেশের ৬১টি জেলার ১৫০টি উপজেলায় নতুন ভূমি কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পের পুরো অর্থই সরকারি তহবিল থেকে আসবে। লক্ষ্য হিসেবে বলা হয়েছে, উপজেলা ভূমি অফিসের কর্মপরিবেশ উন্নয়ন, ভূমি রেকর্ড সংরক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা ও সেবাগ্রহীতাদের জন্য অপেক্ষাকৃত ভালো পরিবেশ নিশ্চিত করা।

পরিকল্পনা কমিশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পটির প্রাথমিক প্রস্তাব যখন কমিশনে আসে। তখন আমরা ৩০টি খাতে অতিরিক্ত ব্যয় নিয়ে আপত্তি তুলেছিলাম। তার অধিকাংশই সংশোধন করে কমানো হয়েছে। তারপরও অনেক খাতে অস্বাভাবিক ব্যয় থাকতে পারে। এমন কিছু থাকলে সেটা একনেকে দৃষ্টি আকর্ষণ হবে। প্রকল্প পাস হয়ে গেলেও সেগুলো পরে ঠিক করতে হবে। 

প্রকল্পের মোট ব্যয়ের সিংহভাগ রাখা হয়েছে অবকাঠামো নির্মাণে। নথি অনুযায়ী, প্রতিটি উপজেলায় ৬ তলা ভিতের ওপর ৪ তলা ভবন নির্মাণ করা হবে। প্রতিটি ভবনের গড় ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। ভবনের সঙ্গে সীমানা প্রাচীর, অভ্যন্তরীণ রাস্তা, ড্রেনেজ, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ, আসবাবপত্র এবং তথ্যপ্রযুক্তি সরঞ্জাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সব মিলিয়ে মোট ব্যয়ের প্রায় পুরোটা মূলধন ব্যয় হিসেবে ধরা হয়েছে।

তবে অবকাঠামো নির্মাণের বাইরে রাজস্ব ব্যয়ের খাতগুলোতেই বড় ধরনের অসামঞ্জস্য সামনে এসেছে। প্রকল্পে যানবাহন ভাড়ার জন্য প্রায় ১৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রকল্পের জন্য নতুন গাড়ি কেনার পরিবর্তে দীর্ঘ সময় ধরে ভাড়ার পেছনে এত বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে কারিগরি পরামর্শক খাতে প্রায় ৮ কোটি টাকা এবং আউটসোর্সিং খাতে আরও প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে জ্বালানি ব্যয়ের হিসাব। প্রকল্পে পেট্রোল, তেল ও লুব্রিকেন্ট বাবদ ৭৪ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা ৫৩০টি উপজেলার ভিত্তিতে হিসাব করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রকৃত হিসাবের চেয়ে তিন গুণেরও বেশি বরাদ্দ ধরা হয়েছে। অথচ প্রকল্পের আওতায় ভবন নির্মাণ হবে মাত্র ১৫০টি উপজেলায়। কেন অতিরিক্ত ৩৮০টি উপজেলার হিসাব যুক্ত করা হয়েছেÑ তার কোনো ব্যাখ্যা প্রকল্প নথিতে নেই। এতে ব্যয় নির্ধারণের পদ্ধতি ও পরিকল্পনার নির্ভুলতা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

প্রচার ও বিজ্ঞাপন খাতেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ। ৬১টি জেলায় বিজ্ঞাপন ও প্রচারের জন্য ১ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। একটি অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পে এ ধরনের ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে মুদ্রণ, অনুলিপি, স্টেশনারি ও মনিহারি খাতে একাধিকবার বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা ব্যয়ের পুনরাবৃত্তির ইঙ্গিত দেয়।

প্রকল্পটি নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের প্রাথমিক পর্যালোচনায় প্রায় ৩০টি খাতে ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেশি ধরা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে ভবন নির্মাণ ব্যয়ের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন ছাড়াই ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। প্রথম প্রস্তাবে প্রতিটি ভবনের ব্যয় ধরা ছিল প্রায় ৯ কোটি ১৮ লাখ টাকা। পরবর্তী সংশোধিত প্রস্তাবে সেটি বাড়িয়ে ৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি ভবনে গড়ে ৪৩ লাখ টাকা ব্যয় বেড়েছে। ১৫০টি ভবনের হিসাবে এই অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৬৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

কমিশনের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়েছে, এলজিইডির নিজস্ব কারিগরি সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বড় অঙ্কের পরামর্শক ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অতীতে একই ধরনের প্রকল্পে এত বেশি পরামর্শক খরচ দেখা যায়নি। ফলে এই খাতের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সরঞ্জাম কেনাকাটায়ও অস্বাভাবিক ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে। প্রকল্পে দুটি মোটরসাইকেলের জন্য চার লাখ টাকা, তিনটি এয়ারকুলারের জন্য ছয় লাখ টাকা, দুটি ল্যাপটপের জন্য চার লাখ টাকা এবং দুটি ডেস্কটপের জন্য পাঁচ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে, যা বাজারদরের তুলনায় বেশি বলে মনে করছে পরিকল্পনা কমিশন। একইভাবে প্রিন্টার, স্ক্যানার ও ফটোকপিয়ার কেনার ক্ষেত্রেও তুলনামূলক বেশি ব্যয় দেখানো হয়েছে।

যানবাহন ব্যবস্থাপনায়ও রয়েছে প্রশ্ন। প্রকল্প পরিচালক ও উপপ্রকল্প পরিচালকের জন্য পৃথকভাবে জিপ ভাড়ার প্রস্তাবের পাশাপাশি এলজিইডির প্রকৌশলীদের জন্যও আলাদা করে জিপ ও মাইক্রোবাস ভাড়ার খরচ ধরা হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী এসব পদে এমন সুবিধা প্রাপ্য কি নাÑ তা যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া একই ধরনের ব্যয় একাধিক দপ্তরের নামে আলাদা করে অন্তর্ভুক্ত করার প্রবণতা প্রকল্পটির ব্যয় কাঠামোকে আরও জটিল করেছে। ভূমি মন্ত্রণালয় এবং এলজিইডির জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অংশে মুদ্রণ, স্টেশনারি, সিল-স্ট্যাম্প, অনুলিপি ও অন্যান্য খাতে পৃথক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এতে ব্যয়ের পুনরাবৃত্তি ঘটছে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

ভৌগোলিকভাবে প্রকল্পটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত। ঢাকা, ময়মনসিংহ, সিলেট, চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের একাধিক জেলায় একাধিক উপজেলা এই প্রকল্পের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে প্রশাসনিক তদারকি ও বাস্তবায়ন ব্যবস্থাপনাও বড় পরিসরের হবে।

অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অবকাঠামোভিত্তিক প্রকল্পে প্রস্তাব পর্যায়েই ব্যয়ের অস্বাভাবিকতা থাকলে বাস্তবায়নের সময় তা আরও বাড়ার প্রবণতা থাকে। এই প্রকল্পেও শুরুতেই জ্বালানি ব্যয়ে উপজেলা সংখ্যার গরমিল, গাড়ি ভাড়ায় বড় অঙ্কের বরাদ্দ এবং একাধিক খাতে পুনরাবৃত্ত ব্যয়ের বিষয়গুলো সামনে এসেছে। এগুলো প্রকল্পটির আর্থিক শৃঙ্খলা ও পরিকল্পনা কাঠামো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা