আহমেদ তোফায়েল
প্রকাশ : ১১ মে ২০২৬ ০৯:২৩ এএম
আপডেট : ১১ মে ২০২৬ ০৯:২৭ এএম
ব্যাংক ঋণের বড় অংশ বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হলেও উৎপাদনমুখী খাতে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের সিংহভাগই ব্যয় হচ্ছে বাণিজ্যিক ( ট্রেড) উদ্দেশ্যে। অন্যদিকে, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় মেয়াদি ঋণের (টার্ম লোন) চাহিদা বাড়লেও শিল্পকারখানা পরিচালনার জন্য অত্যাবশ্যক চলতি মূলধন (ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল) এবং নির্মাণ খাতের ঋণপ্রবাহে নিম্নমুখী প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকের সর্বশেষ উপাত্ত থেকে ঋণের এই খাতওয়ারি চিত্র উঠে এসেছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতের মোট ঋণের ৩৩ দশমিক ৪৬ শতাংশই ব্যবহৃত হয়েছে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে। শতাংশের হিসেবে এটিই একক খাত হিসেবে সর্বোচ্চ। এর পরেই রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি বা মেয়াদি ঋণের অবস্থান, যা মোট ঋণের ২৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ। অন্যদিকে, শিল্প উৎপাদনের প্রাণশক্তি হিসেবে পরিচিত চলতি মূলধন অর্থায়নের অংশ দাঁড়িয়েছে ১৯ দশমিক ২২ শতাংশে।
পরিসংখ্যান বলছে, শেষ প্রান্তিকে বাণিজ্যিক ঋণের পরিমাণ ২০ হাজার ৪৩৭ কোটি টাকা বা ৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ বেড়ে ৫ লাখ ৯৪ হাজার ৬২৪ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। এর আগের প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) যেখানে এই খাতে ঋণপ্রবাহ সামান্য কমেছিল, সেখানে বছরের শেষ দিকে এসে এই খাতের ঋণের চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে।
অর্থনীতির ভাষায় ঋণের এই ধরন পরিবর্তনের পেছনে বেশ কিছু প্রভাব কাজ করছে। অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে মেয়াদি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ২৪ হাজার ৩৪১ কোটি টাকা, যা গত প্রান্তিকের তুলনায় ৬ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি। ডিসেম্বর শেষে মেয়াদি ঋণের মোট স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ২৩ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকায়। গত বছরের একই সময়ে এই প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৭০ শতাংশ। মেয়াদি ঋণে এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, উদ্যোক্তারা নতুন প্রকল্প গ্রহণ কিংবা বিদ্যমান ব্যবসার সম্প্রসারণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ওপর আস্থা রাখছেন। তবে বিপরীতে চলতি মূলধনের ঋণে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়ে তুলতে পারে। আলোচ্য প্রান্তিকে এই খাতে ঋণ কমেছে ৪ দশমিক ১৬ শতাংশ, যা শিল্পোৎপাদনের সক্ষমতা বা প্রতিদিনের ব্যবসায়িক কার্যক্রমে কিছুটা স্থবিরতার ইঙ্গিত দেয়।
কৃষি ও পরিবহন খাতের ঋণেও এই সময়ে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। বিশেষ করে কৃষি ঋণের প্রবাহ ৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৮ হাজার ১১৫ কোটি টাকায়। গত বছরের একই সময়ে যেখানে এই প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৮০ শতাংশ এবং আগের প্রান্তিকে ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ২৬ শতাংশ, সেখানে শেষ তিন মাসে কৃষিতে ব্যাংকগুলোর অর্থায়ন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। একইভাবে পরিবহন খাতেও ঋণপ্রবাহে ইতিবাচক ধারা দেখা গেছে। এই খাতে ঋণ ২ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেড়ে ১০ হাজার ৪৮৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। আগের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে এই খাতে ঋণের প্রবাহ ৬ শতাংশের বেশি কমে গিয়েছিল, ফলে এই পুনরুদ্ধার পরিবহন খাতের জন্য একটি স্বস্তির খবর।
তবে অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত নির্মাণ খাতে ঋণের চাহিদা এবার কমেছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, নির্মাণ খাতের ঋণ ২ দশমিক ১৫ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ১ লাখ ২৫ হাজার ৯০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। আবাসন ও অবকাঠামো উন্নয়নের এই স্থবিরতা সামগ্রিক নির্মাণ উপকরণের বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা কিংবা ব্যক্তিগত প্রয়োজনের জন্য নেওয়া ভোক্তা ঋণের (কনজ্যুমার লোন) পরিমাণ সামান্য হলেও বেড়েছে। আলোচ্য সময়ে এই খাতে ঋণের স্থিতি ১ লাখ ৫১ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা আগের তুলনায় শূন্য দশমিক ৯৩ শতাংশ বেশি।
খাতওয়ারি এই ঋণ বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায়, দেশের বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে ব্যাংকগুলোর ওপর নির্ভরতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে ট্রেড লোনের ক্রমবর্ধমান চাহিদা দেশের আমদানি-রপ্তানি ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের গতিশীলতাকে প্রতিফলিত করে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, কেবল ট্রেড লোনে প্রবৃদ্ধি হলে তা দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের জন্য যথেষ্ট নয়। মেয়াদি ঋণের প্রবৃদ্ধি যেমন আশাব্যঞ্জক, তেমনি চলতি মূলধনের ঋণ প্রবাহ কমে যাওয়া মানে হলো কারখানাগুলোতে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় হয়তো কোনো ধরনের সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। নির্মাণ খাতের নিম্নমুখী ঋণ প্রবাহ ইঙ্গিত দেয় যে, বড় অবকাঠামো প্রকল্প কিংবা আবাসন খাতে বিনিয়োগকারীরা বর্তমানে কিছুটা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
সামগ্রিকভাবে, ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে ব্যাংক ঋণের যে প্রবণতা দেখা গেছে, তা একাধারে সম্ভাবনা ও সতর্কবার্তার সংমিশ্রণ। একদিকে মেয়াদি ঋণের মাধ্যমে শিল্পায়নের আকাঙ্ক্ষা ফুটে উঠছে, অন্যদিকে চলতি মূলধন ও নির্মাণ ঋণে ভাটা পড়ার বিষয়টি অর্থনীতির কাঠামোগত চ্যালেঞ্জগুলোকে সামনে নিয়ে আসছে।