কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা
আহমেদ তোফায়েল
প্রকাশ : ০৮ মে ২০২৬ ১২:৫৫ পিএম
আপডেট : ০৮ মে ২০২৬ ১২:৫৮ পিএম
বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ছবি: বাসস
দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে বিশেষ নীতি সহায়তার মেয়াদ বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তারা চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত ঋণ পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিলের জন্য আবেদন করার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে আবেদন পাওয়ার তিন মাসের মধ্যে প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে ব্যাংকগুলোকে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ (বিআরপিডি) থেকে এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করে সব তফসিলি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীর কাছে পাঠানো হয়েছে। মূলত গত বছরের সেপ্টেম্বর ও নভেম্বরে জারি করা দুটি সার্কুলারের ধারাবাহিকতায় এবং বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এই নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৯ (১) (চ) ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে জনস্বার্থে এই নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক, যা অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আবেদনের নতুন সময়সীমা ও শর্তাবলি
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্বাভাবিক করতে আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে আবেদন করতে পারবে। তবে এক্ষেত্রে একটি কঠোর শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। যারা ইতোমধ্যে আগের সার্কুলারের আওতায় বা বিশেষ বাছাই কমিটির মাধ্যমে নীতি সহায়তা গ্রহণ করেছেন, তারা নতুন করে এই সুবিধার জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না। অর্থাৎ সুবিধাটি কেবল তাদের জন্যই যারা এখনও এই প্রক্রিয়ার বাইরে রয়েছেন।
নতুন নীতিমালার আওতায়, আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত অশ্রেণিকৃত ঋণগুলোকে বিশেষ পুনর্গঠন সুবিধা দেওয়া হবে। যেসব ঋণ গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত বিরূপমানে শ্রেণিকৃত (সাব-স্ট্যান্ডার্ড, ডাউটফুল ও ব্যাড ডেট) ছিল, সেগুলোকেও বিশেষ পুনঃতফসিল সুবিধার আওতায় আনা যাবে। এর মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কমানো এবং উৎপাদনশীল খাতকে সচল রাখার চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
দ্রুত নিষ্পত্তির বাধ্যবাধকতা
আবেদন জমা দেওয়ার পর দিনের পর দিন ঝুলে থাকার সংস্কৃতি বন্ধে এবার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আবেদন পাওয়ার পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে ব্যাংকগুলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে নীতি সহায়তার জন্য প্রয়োজনীয় ডাউন পেমেন্ট যদি চেক বা অন্য কোনো মাধ্যমে দেওয়া হয়, তবে তা নগদায়নের পর থেকে এই তিন মাস সময় গণনা শুরু হবে। ডাউন পেমেন্টের অর্থ প্রকৃতভাবে ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে জমা না হওয়া পর্যন্ত কোনো আবেদন কার্যকর করা যাবে না।
প্রভিশন সংরক্ষণ ও নতুন ঋণে কড়াকড়ি
ব্যাংকগুলোর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রভিশন সংরক্ষণের নিয়মেও স্পষ্টতা আনা হয়েছে। বিশেষ এক্সিট সুবিধাপ্রাপ্ত ঋণগুলোকে এখন থেকে ‘এসএমএ’ (স্পেশাল মেনশন অ্যাকাউন্ট) মান হিসেবে প্রদর্শন করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী সাধারণ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে। ঋণের টাকা আদায় না হওয়া পর্যন্ত আগের সংরক্ষিত স্পেসিফিক প্রভিশন কোনোভাবেই ব্যাংকের আয় খাতে নেওয়া যাবে না। তবে সাধারণ প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজনে এর অংশবিশেষ স্থানান্তর করা যেতে পারে।
নতুন নির্দেশনায় ঋণগ্রহীতাদের জন্য একটি সতর্কবার্তাও রয়েছে, যারা এই এক্সিট সুবিধা নেবেন, তারা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে বিদ্যমান ঋণ সুবিধা ছাড়া আর কোনো নতুন ঋণ নিতে পারবেন না। পুরো ঋণ পরিশোধ করলেই কেবল তারা পুনরায় ঋণ পাওয়ার যোগ্য হবেন।
ব্যাংক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পদক্ষেপের ফলে সংকটে থাকা অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে। বিশেষ করে ডাউন পেমেন্টের কড়াকড়ি এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তির বাধ্যবাধকতা ব্যাংক ও গ্রাহকের মধ্যে স্বচ্ছতা বাড়াবে।