হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ০৬ মে ২০২৬ ১০:৪৬ এএম
আপডেট : ০৬ মে ২০২৬ ১০:৪৯ এএম
চট্টগ্রাম বন্দরে তেলের জাহাজ। ছবি: সংগৃহীত
‘যেসব প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নেবে, সেসব প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব রিফাইনারি থাকতে হবে। যদি রিফাইনারি না থাকে, তবে একটি রিফাইনারির অন্তত ৫০ শতাংশ শেয়ার থাকতে হবে। যার বার্ষিক প্রক্রিয়াকরণ ক্ষমতা ন্যূনতম ৬ (ছয়) মিলিয়ন মেট্রিক টন হতে হবে।’
পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি নীতিমালায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এমন শর্ত দিলেও দরপত্রে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দিতে সেই শর্ত মানছে না। যেই প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব রিফাইনারি নেই, সেই প্রতিষ্ঠান থেকেও সরবরাহ করছে তেল।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদে জি-টু-জি পদ্ধতিতে ১৪ লাখ ৩৫ হাজার টন জ্বালানি সরবরাহের কার্যাদেশ দেওয়া হয় সাত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে। এর মধ্যে সাড়ে তিন লাখ টন বরাদ্দ পায় ইন্দোনেশিয়ার পিটি বুমি সিয়াক পুসাকু (বিএসপি) যাপিন। একইভাবে অর্থবছরের জানুয়ারি-জুন মেয়াদে জি-টু-জি পদ্ধতিতে ১৩ লাখ ৮০ হাজার টন জ্বালানি সরবরাহের কার্যাদেশ দেওয়া সাত সরবরাহকারীর মধ্যে বিএসপি যাপিনকে দেওয়া হয় ৪ লাখ ৩৫ হাজার টনের কার্যাদেশ।
চলতি অর্থবছর পিটি বুমি সিয়াক পুসাকু (বিএসপি) যাপিন বিপিসির সর্বোচ্চ তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। অথচ খোঁজ নিয়ে দেখা গিয়েছে, ইন্দোনেশিয়ার এই প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব কোনো রিফাইনারি নেই। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে জি-টু-জি চুক্তি হলেও তৃতীয় দেশগুলো থেকে জ্বালানি সরবরাহ দেয় তারা। সম্প্রতি ‘এমটি কেপ বনি’, ‘এমটি এফপিএমসি ৩০’ এবং ‘এমটি হাফনিয়া চিত্তা’ নামে তিনটি জাহাজে প্রতিষ্ঠানটি ডিজেল সরবরাহ করে। চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, জাহাজ তিনটির মধ্যে ‘এমটি কেপ বনি’ আসে মালয়েশিয়া থেকে; ‘এমটি এফপিএমসি ৩০’ ও ‘এমটি হাফনিয়া চিত্তা’ আসে সিঙ্গাপুর থেকে।
নীতিমালা অনুযায়ী আবশ্যিক যোগ্যতা না থাকার পরও প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে তেল সরবরাহ নেওয়ায় বিপিসির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিএসপি যাপিনের স্থানীয় এজেন্ট সেভেন মার্কের মালিক ডা. এজাজুর রহমানের সঙ্গে যোগসাজশে নিয়ম না মেনে প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যাদেশ দিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ২০০৯ সালে বিপিসিতে জ্বালানি সরবরাহে যুক্ত হওয়া ডা. এজাজুর রহমান এখন এই খাতের নিয়ন্ত্রক। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, তার নেতৃত্বে জ্বালানি আমদানি খাতে গড়ে উঠেছে এক শক্ত সিন্ডিকেট। এখন কমবেশি ৮০ শতাংশ জ্বালানি তেল আমদানি হচ্ছে ওই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে ডা. এজাজুর রহমানকে মোবাইল ফোনে কল করা হলে সেটি ব্যস্ত পাওয়া যায়। একাধিকবার কল করেও তার মোবাইল ফোনে সংযোগ পাওয়া যায়নি।
জি-টু-জি ভিত্তিতে তেল আমদানি সংক্রান্ত নীতিমালায় বলা হয়েছেÑ বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে এমন যেকোনো দেশের নিম্নবর্ণিত যোগ্যতাসম্পন্ন করপোরেশন/কোম্পানি/প্রতিষ্ঠান থেকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি করতে পারবে এবং এই প্রতিষ্ঠানগুলো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য হবে।
সরবরাহকারী প্র্রতিষ্ঠান হওয়ার আবশ্যিক যোগ্যতাগুলো হলোÑ ক. সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানে সরকারের ন্যূনতম মালিকানা ৫০ শতাংশের বেশি হতে হবে। অনুরূপ মালিকানাধীন মূল প্রতিষ্ঠানের আওতাধীন সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানও সরবরাহকারী হিসেবে বিবেচিত হতে পারবে। তবে, সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৫০ শতাংশের বেশি শেয়ার মূল প্রতিষ্ঠানের হতে হবে। খ. তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব রিফাইনারি থাকতে হবে অথবা রিফাইনারির ন্যূনতম মালিকানা ৫০ শতাংশের বেশি থাকতে হবে, যার বার্ষিক প্রক্রিয়াকরণ ক্ষমতা ন্যূনতম ৬ (ছয়) মিলিয়ন মেট্রিক টন হতে হবে। গ. বার্ষিক জ্বালানি তেল রপ্তানির পরিমাণ ন্যূনতম ৫ (পাঁচ) মিলিয়ন মেট্রিক টন (৫০ লাখ) হতে হবে। ঘ. প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক টার্নওভার ন্যূনতম ৫ (পাঁচ) বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ হতে হবে। ঙ. জ্বালানি তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে কমপক্ষে ৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। চ. সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে আন্তর্জাতিক সংস্থা (জাতিসংঘ, ওপেক, ডব্লিউটিও ইত্যাদি) কর্তৃক বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা মুক্ত হতে হবে। ছ. পরিশোধিত জ্বালানি তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের নিজ দেশের ক্রুড অয়েল বা অন্য কোনো দেশের তেলক্ষেত্রের সঙ্গে Production Sharing Contract (PSC) থাকতে হবে। জ. সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান অথবা তার পরিচালকবৃন্দ কোনো ধরনের ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান হতে ঋণখেলাপি হতে পারবেন না বা কোরনা জাতীয় বা আন্তর্জাতিক আদালতে এ-সংক্রান্ত কোনো মামলা অনিষ্পন্ন অবস্থায় থাকতে পারবে না। ঝ. সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত Safety Standard and Environment সম্পর্কিত Compliance মেনে চলতে হবে।
অভিযোগ রয়েছে, বড় সরবরাহকারী হলেও নীতিমালা অনুযায়ী বিএসপি যাপিনের প্রয়োজনীয় মানদণ্ড নেই। জি-টু-জি হলেও তৃতীয় দেশগুলো থেকে জ্বালানি সরবরাহ দেয় তারা।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা যায়, বিপিসির তালিকাভুক্ত তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান আছে মোট ১৩টি। এর মধ্যে দুটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান অপরিশোধিত তেল সরবরাহ করে। বাকি ১১টি প্রতিষ্ঠানই পরিশোধিত তেল সরবরাহ করে।
অপরিশোধিত তেল সরবরাহকারী দুই প্রতিষ্ঠান হলোÑ সৌদি এরাবিয়ান অয়েল কোম্পানি (সৌদি আরামকো) এবং আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি লিমিটেড (এডনক)।
পরিশোধিত তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো হলোÑ মালয়েশিয়ার পেটকো ট্রেডিং লাবুয়ান কোম্পানি লিমিটেড (পিটিএলসিএল), সংযুক্ত আরব আমিরাতের অ্যামিরেটস ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (ইনক), চীনের পেট্রোচায়না (সিঙ্গাপুর) পিটিই লিমিটেড, ইন্দোনেশিয়ার পিটি বুমি সিয়াক পুসাকু (বিএসপি) যাপিন, চীনের ইউনিপেক (সিঙ্গাপুর) পিটিই লিমিটেড, থাইল্যান্ডের পিটিটি ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং পিটিই লিমিটেড, ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেড (এনআরএল), ওমানের ওকিউ ট্রেডিং লিমিটেড, চীনের পেট্রোচায়না ইন্টারন্যাশনাল (সিঙ্গাপুর) প্রাইভেট লিমিটেড, ভারতের ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন লিমিটেড (আইওসিএল), সিঙ্গাপুরের ভিটল এশিয়া পিটিই লিমিটেড এবং সায়নোকেম ইন্টারন্যাশনাল অয়েল (সিঙ্গাপুর) পিটিই লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানগুলো জি-টু-জি ও উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে বিপিসিকে পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহ দেয়।
এর মধ্যে ইউনিপেক (সিঙ্গাপুর) এবং ইন্দোনেশিয়ার বিএসপি-যাপিন দুই সরবরাহকারীর স্থানীয় এজেন্ট সেভেন মার্ক। মালয়েশিয়ান পিটিএলসিএল, থাইল্যান্ডের পিটিটিটি, সিঙ্গাপুরের ভিটল এশিয়া এবং সায়নোকেম প্রতিষ্ঠান চারটির স্থানীয় এজেন্ট ট্রান্সবাংলা কমোডিটিস লিমিটেড। সিঙ্গাপুরের পেট্রোচায়নার স্থানীয় এজেন্ট মেরিনার্স ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম কোং লিমিটেড, আমিরাতের ইনকের স্থানীয় এজেন্ট ইশান ট্রেডার্স। এ ছাড়া ওমানের ওকিউটি, ভারতের আইওসিএল এবং এনআরএল প্রতিষ্ঠান তিনটি নিজেদের কান্ট্রি হেড দিয়ে বিপিসির সঙ্গে লিয়াজোঁ করেন। এর মধ্যে সেভেন মার্ক ও ট্রান্সবাংলা কমোডিটিস লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী ডা. এজাজুর রহমান।
বিপিসির আন্তর্জাতিক দরপত্র (কোটেশন) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির ক্রয় প্রস্তাবের অনুমোদন তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-জুন মেয়াদে জি-টু-জি ও উন্মুক্ত দরপত্রে সর্বমোট ২৭ লাখ ১০ হাজার টনের মধ্যে ১৮ লাখ ৪০ হাজার টন জ্বালানি সরবরাহের কার্যাদেশ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থানীয় এজেন্টের মালিক ডা. এজাজুর রহমান। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জি-টু-জি এবং উন্মুক্ত দরপত্রে কার্যাদেশ দেওয়া ৫৫ লাখ ১০ হাজার টন পেট্রোলিয়াম জ্বালানির মধ্যে ৪৩ লাখ টনের কার্যাদেশ পায় ডা. এজাজুর রহমানের ছয় প্রতিষ্ঠান, যা বার্ষিক মোট আমদানির ৭৮ শতাংশ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিপিসির একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিপিসির ঊর্ধ্বতন কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে ডা. এজাজুর রহমানের লিয়াজোঁ আছে। তারাই তাকে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে কাজ পাইয়ে দিতে সহযোগিতা করেন। অসাধু এই কর্মকর্তারা, অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের দর ডা. এজাজুর রহমানকে জানিয়ে দেন। যে কারণে তিনি ওইসব প্রতিষ্ঠানের চেয়ে কম দর দিয়ে কার্যাদেশ ভাগিয়ে নেন।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদে উন্মুক্ত দরপত্রে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে চার প্যাকেজে ১২ লাখ ৭৫ হাজার টন পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহের জন্য তিনটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ‘এ’ প্যাকেজে ৪ লাখ ৬০ হাজার টন ডিজেল ও ৮০ হাজার টন জেট ফুয়েল সরবরাহের কার্যাদেশ পায় পেট্রোচায়না সিঙ্গাপুর, ‘বি’ প্যাকেজে ৪ লাখ ৩০ হাজার টন ডিজেল, ৮০ হাজার টন জেট ফুয়েল, ‘সি’ প্যাকেজে ১ লাখ ৭৫ হাজার টন ফার্নেস অয়েলের কার্যাদেশ পায় ভিটল এশিয়া এবং ‘ডি’ প্যাকেজে ৫০ হাজার টন অকটেন সরবরাহের কার্যাদেশ পায় সায়নোকেম ইন্টারন্যাশনাল।
চলতি (২০২৫-২০২৬) অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদে জি-টু-জি পদ্ধতিতে ১৪ লাখ ৩৫ হাজার টন জ্বালানি সরবরাহের কার্যাদেশ দেওয়া হয় সাত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে। এর মধ্যে ১ লাখ ৬০ হাজার টন ডিজেল, ২৫ হাজার টন জেট ফুয়েল, ৭৫ হাজার টন ফার্নেস অয়েল, ৭৫ হাজার টন অকটেন, ১৫ হাজার টন মেরিন ফুয়েলের বরাদ্দ পায় বিএসপি-যাপিন।
৯০ হাজার টন ডিজেল, ২৫ হাজার টন ফার্নেস অয়েল, ১৫ হাজার টন মেরিন ফুয়েলের বরাদ্দ পায় ইনক; ৮০ হাজার টন ডিজেল, ১০ হাজার টন জেট ফুয়েল, ৫০ হাজার টন ফার্নেস অয়েল বরাদ্দ পায় আইওসিএল; ৫০ হাজার টন ডিজেল ও ১০ হাজার টন জেট ফুয়েল সরবরাহের বরাদ্দ পায় পেট্রোচায়না।
এ ছাড়া ৯০ হাজার টন ডিজেল, ১ লাখ ২৫ হাজার টন জেট ফুয়েলের বরাদ্দ পায় পিটিএলসিএল; ৩০ হাজার টন ডিজেলের বরাদ্দ পায় পিটিটিটি এবং ৪ লাখ ৩০ হাজার টন ডিজেল, ৫৫ হাজার টন জেট ফুয়েল, ২৫ হাজার টন ফার্নেস অয়েল বরাদ্দ পায় ইউনিপেক (সিঙ্গাপুর)।
এ সম্পর্কে জানতে বিপিসির পরিচালক (অপারেশন্স) মো. এ কে মোহাম্মদ সামছুল আহসানকে কল করা হলে তিনি মোবাইল রিসিভ করেননি। পরে এ বিষয়ে জানতে বিপিসির চেয়ারম্যান রেজানুর রহমানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনিও কল রিসিভ করেননি। এর পর তার সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলেও তার কাছ থেকে কোনো প্রতিউত্তর পাওয়া যায়নি।