বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০১ মে ২০২৬ ০৮:৫৬ এএম
আপডেট : ০১ মে ২০২৬ ০৯:০০ এএম
পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি এবং বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে বয়সসীমা তুলে দিতে আনা দুটি সংশোধনী বিল জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে বয়সসীমা তুলে দিতে আনা দুটি সংশোধনী বিল জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন বিল এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বিল দুটি পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করলে কণ্ঠভোটে তা পাস হয়। তবে পাসের প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা উদ্বেগ প্রকাশ করে জানতে চান, নিজেদের মতো করে লোক বসাতেই আইন দুটিতে সংশোধনী আনা হলো কি না? জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংক-আর্থিক খাতে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হবে না।
বিলের বিরোধিতা করে জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা আখতার হোসেন বলেন, সরকারি দল সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় তারা চাইলে আইন পাস করতে পারে। তবে যে দুটি বিল পাস হলো, তার বিষয়বস্তু নিয়ে যথেষ্ট ব্যাখ্যা হয়নি। বিষয়বস্তু হলো, সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশনের আইন এবং বীমা করপোরেশনের আইনের বয়সের যে বাধ্যবাধকতা ছিল, সেগুলো উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বিলের ভাষা সংক্ষিপ্ত হওয়ায় দেখে মনে হতে পারে বড় কিছু হচ্ছে না। কিন্তু বাস্তবে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের ক্ষেত্রে ৬৫ বছরের এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের ক্ষেত্রে ৬৭ বছরের বয়সসীমা ছিল, সেটিই তুলে দেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে আখতার বলেন, সরকার বলছে যোগ্য ও দক্ষ লোক আনার জন্য বয়সসীমা তোলা হচ্ছে। তবে প্রশ্ন হলো, এটি কোনো নীতির ভিত্তিতে হচ্ছে, নাকি নির্দিষ্ট কাউকে সামনে রেখে করা হচ্ছে? তিনি বলেন, এগুলো কিন্তু আর্থিক প্রতিষ্ঠান। দেশের অর্থসম্পদগুলো যদি এখান থেকে লুটপাটের মতো কোনো পরিবেশ ভবিষ্যতে তৈরি হয়, তার জন্য কিন্তু সরকারি দলকে দায়ী থাকতে হবে।
স্পিকার এই সংসদ সদস্যের উদ্বেগের বিষয়ে অর্থমন্ত্রীকে জবাব দিতে বলেন। এ সময় অর্থমন্ত্রী বলেন, বিল দুটি কেন আনা হয়েছে, তা তিনি আগেই স্পষ্ট করেছেন। আইনটি যখন ১৯৯৩ সালে করা হয়, তখন গড় বয়স ও কর্মক্ষমতার বাস্তবতা ভিন্ন ছিল। আপনার এই বিলটা যখন ’৯৩-তে হলো সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের, তখন গড় বয়স ছিল ৫৭ বছর। এখন গড় বয়স হচ্ছে ৭২ বছর। আপনি কি এই লোকগুলোকে কর্মকাণ্ডের বাইরে রাখতে চান? বাংলাদশের এই নাগরিকগুলোকে, এই অভিজ্ঞ লোকগুলোকে, তাদেরকে কর্মকাণ্ডের বাইরে রাখতে চান? বিশ্বের প্রায় প্রত্যেকটি দেশে যেখানে সাকসেসফুলি সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন অপারেট করছে, তাদের এখানে কোনো এইজ বার নাই। পেশাদার প্রতিষ্ঠানে বয়সসীমা বেঁধে দিলে যোগ্য ব্যক্তিদের কাজ করার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। একই যুক্তি বীমা খাতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
এরপর বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, সরকারের সাম্প্রতিক বিভিন্ন পদক্ষেপ জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি প্রশ্ন তোলেন, যোগ্যতার নামে বাছাই এভাবেই চললে দেশ কীভাবে এগোবে? আমরা তো কার ইনটেনশন কী, সেটা দেখতে পারব না। আমরা দেখব তার প্রকাশটাকে, বাস্তবায়নটাকে কীভাবে এটা সমাজে রিফ্লেক্ট করছে।
অর্থমন্ত্রী জানান, বিল পাস হওয়ার পর এ ধরনের আলোচনা কার্যপ্রণালী বিধির বাইরে, তবু প্রশ্ন ওঠায় তিনি উত্তর দিচ্ছেন। তিনি দাবি করেন, বিগত বিএনপি সরকারের সময় বাংলাদেশ ব্যাংক ও সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে সব নিয়োগই ছিল ‘নন পলিটিক্যাল অ্যাপয়েন্টমেন্ট’। তিনি বলেন, বিএনপির অ্যাপয়েন্টমেন্টগুলো কোনো সময় পলিটিক্যাল কনসিডারেশনে হয় নাই । সেই ধারা এই সরকার অব্যাহত রাখবে। প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, ‘ফিন্যান্সিয়াল সেক্টরে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেওয়া হবে না।’
পরে বিরোধী দলের উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এমন সিদ্ধান্ত থাকলে তারা সেটিকে স্বাগত জানান। তবে বর্তমান বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের একটি রাজনৈতিক পরিচয় আছে বলে তার জানা আছে এবং এ নিয়ে তৈরি হওয়া ‘তথ্যগত বিভ্রান্তি’ দূর হওয়া উচিত। তিনি বলেন, গভর্নর বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন এটা যদি সত্যি হয়, তাহলে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত নীতির আলোকে তার জায়গায় নতুন গভর্নর নিয়োগ দেওয়া উচিত।
স্পিকার তখন অর্থমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেন, নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতে থাকলে সেটি দলীয় পরিচয় কি না। জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, দলকে সমর্থন করা মানে দলের লোক না। কোনো দলের নির্বাচনী কার্যক্রমে সহায়তা করা মানেই ওই ব্যক্তি দলের সদস্য নন।
বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে গত ১৫ বছরে এক লাখ কোটি টাকার বেশি লুটপাট হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। বিল পাসের প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে বলেন, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ সাধারণ মানুষের সঞ্চয় ছিল, যা একটি বিশেষ গোষ্ঠী লুটে নিয়েছে। এই লুটপাটের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
রুমিন ফারহানা বলেন, ১৯৯৬ এবং ২০১০ সালে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে ভয়াবহ ধস নামে। এতে সাধারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা সর্বস্ব হারিয়েছেন। শ্বেতপত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে এই খাত থেকে এক লাখ কোটি টাকার বেশি লুট হয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত, এই লুটপাটের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কখনোই বিচারের আওতায় আনা হয়নি। বর্তমানে দেশের আমদানি-রপ্তানি পরিস্থিতি সংকটে এবং পুঁজিবাজারের ওপর মানুষের আস্থা নেই। এ পরিস্থিতিতে শেয়ারবাজারকে আস্থার জায়গায় ফেরাতে বিএসইসিতে দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, সদস্য রুমিন ফারহানা যে বক্তব্য রেখেছেন, আমি তার প্রতিটি কথার সঙ্গে একমত। শেয়ারবাজারে অতীতে যা ঘটেছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। এই লুটপাট ও অব্যবস্থাপনা দূর করতেই আমরা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছি। তিনি বলেন, যোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের কাজে লাগানোর জন্যই সংশোধন প্রয়োজন। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে এবং আন্তর্জাতিক ফান্ড ম্যানেজারদের আকৃষ্ট করতে আমরা কাজ করছি। বিএনপির আমলে শেয়ারবাজার লুটপাটের সুযোগ ছিল না, এবারও তা থাকবে না। যারা লুটপাট করেছে তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে।