ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ২৮ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৩২ এএম
আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৩৪ এএম
জ্বালানির দাম বাড়ায় ও সংকটে মাঝেমধ্যে জেনারেটর চালিয়েও মুরগি বাঁচানো যাচ্ছে না। ছবি: সংগৃহীত
দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে পোল্ট্রি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত গাজীপুর জেলার শ্রীপুরের কাওরাইদ ইউনিয়নের গোলাঘাট গ্রামের খামারি আবু তালেব। নিজ গ্রামের গণ্ডি পেরিয়ে আশপাশের কয়েকটি গ্রামে তার খামার বিস্তৃত। কয়েকটিতে মাংস এবং বেশিরভাগ শেডে ডিমের জন্য মুরগি পালন করেন তিনি। পোল্ট্রি নিয়ে প্রায় ৬ বছরই বিরূপ পরিস্থিতিতে আছেন আবু তালেব। বিশেষ করে গত দুই মাস আরও বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন তিনি।
আবু তালেবের নতুন মাথাব্যথার কারণ বিদ্যুতের লোডশেডিং। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বিশ্বে তেলের বাজার হুহু করে বাড়ায় দেশেও তার প্রভাব পড়েছে। জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় প্রায়ই লোডশেডিং হচ্ছে। আবু তালেব প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, গ্রামে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকে না। এতে করে খামারের মুরগি মারা যাচ্ছে। জ্বালানির দাম বাড়ায় ও সংকটে মাঝেমধ্যে জেনারেটর চালিয়েও মুরগি বাঁচানো যাচ্ছে না। এখন ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছি। তিনি আরও বলেন, পাম্পে গেলে তো সিরিয়াল ধরে তেল পাই না। বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে প্রতি লিটারে ৩০-৫০ টাকা বেশি দিয়ে তেল কিনতে হয়। জেনারেটর চালাব, সেজন্য সময়মতো ডিজেলও পাচ্ছি না।
আবু তালেব বলেন, ডিম দেওয়া মুরগিতে নির্দিষ্ট সময়ে আলো না দিলে ডিমের উৎপাদন কমে যায়। কৃত্রিম উপায়ে বাতাস না দিলে রোগবালাইয়ে আক্রান্ত হয়, স্ট্রোক করে মারা যায়। সময়মতো পানি সরবরাহ না করতে পারলে মুরগি হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়। প্রচণ্ড উত্তাপে মুরগির টোটাল লেভেল (উৎপাদন ও শারীরিক সক্ষমতা) কমে যায়। বিদ্যুৎ না থাকায় গরমের কারণে মুরগির পাতলা পায়খানা হয়। অতিরিক্ত ভিটামিন প্রয়োগ করতে হচ্ছে। এভাবে খরচ বাড়ে, কিন্তু উৎপাদন কমে। আগে এক হাজার মুরগির জন্য বিদ্যুৎ খরচ হতো তিন থেকে চার হাজার টাকা। সেখানে বর্তমানে প্রায় ১৫ হাজার টাকায় উঠেছে সেই খরচ। উৎপাদন খরচ থেকে বর্তমানে প্রতিটি ডিমে প্রায় দুই টাকা লোকসান গুনছি।
পোল্ট্রি শিল্প খাতের বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অথবা ভর্তুকি মূল্যে জ্বালানি দিতে হবে। তা না হলে সংকট বাড়তেই থাকবে। এতে বাজারের ডিম ও মাংসের সরবরাহ কমবে। সাধারণ মানুষের প্রোটিনের প্রধান এই উৎসের দাম নাগালের বাইরে চলে যাবে।
রংপুরে ডিম উৎপাদন কমেছে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ : রংপুরে লোডশেডিংয়ে হুমকির মুখে পড়েছে পোল্ট্রি শিল্প। উপজেলার সদর ইউনিয়নের মুন্সিপাড়ার খামারি আতাউর রহমান বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় জেনারেটর চালিয়ে মুরগির খামার টিকিয়ে রেখেছি। সেই জেনারেটর চালাতেও নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। পাম্পে ৫০০ টাকার তেল নিতে গেলে দিচ্ছে মাত্র ২০০ টাকার। বিদ্যুৎ না থাকায় ডিমের উৎপাদন শতকরা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমেছে। তিনি জানান, রংপুরের সব উপজেলার চিত্রই প্রায় এরকম। এই খামারি বলেন, আমরা চাই দ্রুত এ সংকট দূর হোক। না হলে এমন জোড়াতালি দিয়ে টিকে থাকতে পারব না।
রংপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মুহ. নাজমুল হুদা বলেন, চলমান বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় বড় উদ্যোক্তারা জেনারেটর ব্যবহার করছেন। কিন্তু ছোট ছোট খামারিরা তারা দুর্ভোগে পড়েছেন। আমাদের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা খামারিদের সাথে যোগাযোগ করে বর্তমান সময়ে কীভাবে বৈজ্ঞানিক উপায়ে মুরগি উৎপাদন করা যায় সেই পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন।
শ্রীপুরে মারা যাচ্ছে মুরগি
গাজীপুরের শ্রীপুরে প্রচণ্ড গরমে প্রতিদিনই মারা যাচ্ছে খামারের মুরগি। এতে ডিম ও মাংসের উৎপাদনও কমেছে। ঘরের চালে ঝরনা, বাড়তি ফ্যানের ব্যবস্থা করেও মুরগি সুস্থ রাখতে পারছেন না। ফলে চরম লোকসানে পড়ছেন খামারিরা।
শ্রীপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আশরাফ হোসেন বলেন, এ সেক্টরকে বাঁচাতে হলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ জরুরি। সেজন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়গুলো জানানো হয়েছে। বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধান করা না গেলে অন্তত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি তেল পাওয়া নিশ্চিত করতে হবে খামারিদের।
ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর শ্রীপুরের মাওনা জোনাল অফিসের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) শান্তনু রায় বলেন, মাওনা জোনে বিদ্যুতের চাহিদা ১২০ মেগাওয়াট এবং শ্রীপুরে ২১২ মেগাওয়াট। এখানে লোডশেডিং পাচ্ছি ৪৫ থেকে ৫০%-এর তো। চাহিদার তুলনায় অন এভারেজে ২৫ থেকে ৩০%-এর মতো কম পাচ্ছি।
গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর মহাব্যবস্থাপক (জিএম) আবুল বাশার আজাদ বলেন, এ জোনে বিদ্যুৎ না পাওয়ায় গড়ে ৩০ শতাংশ লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। এতে জেলায় গড়ে ৫-৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না।
চলতি এপ্রিল মাসজুড়ে তিন দফা তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে। তার মধ্যে ২-৫, ১২ থেকে ১৫ ও ২০ থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত। আর এ সময় বিদ্যুতের সুবিধা না পেয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় পোল্ট্রি খামারিদের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হয়।
প্রতিদিন লোডশেডিং গড়ে ২ হাজার মেগাওয়াট
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ২২ এপ্রিলের হিসাবে দেখা গেছে, এদিন দুপুর ১২টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৯১ মেগাওয়াট, সরবরাহ হয়েছে ১২ হাজার ৫৯৪ মেগাওয়াট এবং লোডশেডিং হয়েছে ২ হাজার ৪৯৩ মেগাওয়াট। একই দিন বেলা ৩টায় চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৮৩৪ মেগাওয়াট, সরবরাহ হয়েছে ১২ হাজার ৩৪৩ মেগাওয়াট ও লোডশেডিং হয়েছে ২ হাজার ৪৯৫ মেগাওয়াট। তা ছাড়া বিগত এক মাস ধরে দিনে গড়ে ২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং অব্যাহত রয়েছে। তবে গত রবিবার থেকে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় লোডশেডিংয়ের মাত্রা কিছুটা কমেছে।
বেড়েছে ডিম ও মুরগির মাংসের দাম
তেলের দাম বৃদ্ধি ও বিদ্যুৎ না পাওয়ায় বেড়েছে মুরগি ও ডিমের দাম। গত ২০ দিনের ব্যবধানে একশ লাল ডিমের দাম ৭৫০ থেকে ৯৮০ টাকা বেড়েছে। সাদা ডিম ৭২০ থেকে বেড়ে ৮০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ ব্যাপারে কারওয়ান বাজারের ডিম ব্যবসায়ী বিল্লাল হোসেন রুবেল বলেন, গত ২০ দিনের ব্যবধানে একশ ডিমের দাম ৮০ থেকে ২৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। তা ছাড়া গরমে ডিমের নষ্টের পরিমাণও বেড়েছে।
বর্তমানে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগির দাম ১৯০-২০০ টাকা ও সোনালি মুরগির দাম ৩৭০-৩৮০ টাকা। কারওয়ান বাজারের মুরগি বিক্রেতা শেখ রাসেল হোসেন বলেন, গত এক মাস যাবৎ সব ধরনের মুরগির দাম ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে। বর্তমানে প্রতি কেজি দেশি মুরগির দাম ৭২০ টাকায় গিয়ে উঠেছে। তা ছাড়া সোনালি মুরগির দাম বাড়লেও চাহিদামতো পাওয়া যাচ্ছে না।
কী বলছেন খাত সংশ্লিষ্টরা
ওয়ার্ল্ড পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ শাখার সেক্রেটারি মোহাম্মদ ফায়জুর রহমান বলেন, মার্কিন-ইরান যুদ্ধের ফলে আমাদের জাহাজ ভাড়া বেড়েছে। চট্টগ্রাম থেকে কাঁচামাল আমদানিতে গাড়িভাড়া বেড়েছে দ্বিগুণ। আগে যেখানে প্রতি ট্রাকে ভাড়া ছিল ১৫ হাজার, বর্তমানে তা ৩০ থেকে ৩৩ হাজারে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. সুমন হাওলাদার বলেন, মার্কিন-ইরান যুদ্ধের শুরুর প্রথম সপ্তাহেই প্রতি কেজি ফিডের দাম বেড়েছে ৩ টাকা করে। বর্তমানে ব্রয়লারের ফিড ৭০ টাকা ও সোনালির ফিড ৬০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। সংগঠনটির সহসভাপতি বাপ্পা সাহা বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে আমাদের উৎপাদন কমে গেছে। অনেক স্থানে প্রচুর মুরগি মারাও যাচ্ছে। এতে করে নতুন করে অনেকেই মুরগি তুলছেন না। এর প্রভাব পড়বে জুনে গিয়ে। তিনি বলেন, বিদ্যুতের অভাবে পোল্ট্রি খাতে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে ৩০-৪০ শতাংশ। এ সময় তিনি সরকারকে এ খাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের আহ্বান জানান।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ঘাটতির আঘাত বাচ্চা উৎপাদনেও
ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (বিএবি) তথ্যমতে, দেশে সপ্তাহে ব্রয়লার মুরগির বাচ্চার চাহিদা প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ। ইনকিউবেটরে নিরবচ্ছিন্ন তাপমাত্রা বজায় রাখতে না পারায় সপ্তাহে প্রায় ৫০ লাখ বাচ্চা কম উৎপাদিত হচ্ছে। ফলে সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।
বিএবির তথ্য অনুযায়ী, প্রতি সপ্তাহে দেশে সোনালি ও রঙিন মুরগির বাচ্চা উৎপাদিত হয় প্রায় দুই কোটি ৫০ লাখ। সেখানে পাঁচ থেকে আট লাখ বাচ্চা মরে যায়। জ্বালানি সংকটের কারণে দুই সপ্তাহে সরবরাহ কমে নেমে এসেছে এক কোটি ৫০ লাখ থেকে দুই কোটিতে।
এ ব্যাপারে বিএবির সাধারণ সম্পাদক শাহ ফাহাদ হাবিব বলেন, দিনে ২০ ঘণ্টার মতো লোডশেডিং হচ্ছে। সঠিক সময়ে তাপমাত্রা না পেলে বাচ্চা সমস্যায় পড়ে। এতে শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, দেখা দেয় রোগবালাই। তা ছাড়া জ্বালানি ব্যয় বাড়ায় প্রতিটি ডিমের উৎপাদন ব্যয় ২৫ থেকে ৫০ পয়সা ও প্রতিটি বাচ্চায় দুই থেকে তিন টাকা বাড়ছে।
এদিকে বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) তথ্যে জানা যায়, বছর বছর উৎপাদন খরচ বেড়েই চলছে। ২০২২ সালে বেড়েছিল ১১৫ শতাংশ, ২০২৩ সালে ১৪৫ শতাংশ, ২০২৪ সালে ১৭০ শতাংশ, ২০২৫ সালে প্রায় ১৯০ শতাংশ ও ২০২৬ সালে দাঁড়িয়েছে ২০০ শতাংশে। সে হিসাবে ৬ বছরে উৎপাদন খরচ দ্বিগুণে টান দিয়েছে।
ভাঙতে হবে সিন্ডিকেট
সম্প্রতি পোল্ট্রি শিল্প নিয়ে এক মতবিনিময় সভায় ওয়ার্ল্ড পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের সভাপতি শামসুল আরেফিন খালেদ বলেন, পোল্ট্রি খাতে ৮০-৮৫ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও এক কোটি মানুষ পরোক্ষভাবে জড়িত। বেশিরভাগ খামারিই গ্রামীণ ও তরুণ। তিনি বলেন, এ খাতের বাজার ১৮ জনের একটি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে। সেখানে খামারি ও রিটেইলারের মধ্যে দামের পার্থক্য ৫০ টাকা। এ সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। বর্তমানে ডিম উৎপাদনে ফিডে ব্যয় হয় ৫৬ শতাংশ।
# প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য সহায়তা করেছেন মেরিনা লাভলী- রংপুর ব্যুরো, রায়হানুল ইসলাম আকন্দ- শ্রীপুর (গাজীপুর)