গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৫ মার্চ ২০২৬ ২০:১৬ পিএম
আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২৬ ২০:২৯ পিএম
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে এবার আরও কাঠামোবদ্ধ ও সময়সীমাবদ্ধ সংস্কার পরিকল্পনার ওপর জোর দিচ্ছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ লিখিতভাবে চেয়েছে, যেখানে ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি, সংস্কারের ধাপ এবং বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট সময়সূচি স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে।
বুধবার (২৫ মার্চ) বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদলের বৈঠকে এই বিষয়টি সামনে আসে। এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলের পরিচালক কৃষ্ণা শ্রীনিবাসনের নেতৃত্বে আসা প্রতিনিধিদলটি বৈঠকে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ নীতিগত দিকনির্দেশনা নিয়ে আলোচনা করে। বৈঠকে আইএমএফ সামগ্রিক অগ্রগতিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও, সংস্কার কার্যক্রমে স্পষ্ট কাঠামো এবং সময়সীমা নির্ধারণের অভাব রয়েছে বলে ইঙ্গিত দেয়।
আইএমএফের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাতের মূল চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, পরিচালনাগত দুর্বলতা এবং নীতিগত অস্পষ্টতা। এ প্রেক্ষাপটে সংস্থাটি চায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ তৈরি করুক, যেখানে ঋণ শ্রেণিকরণ পদ্ধতির সংস্কার, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সংজ্ঞা ও জবাবদিহিতা এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোর উন্নয়ন বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকবে। সংস্থার মতে, এ ধরনের লিখিত পরিকল্পনা থাকলে তা শুধু দিকনির্দেশনা দেবে না, বরং সংস্কার বাস্তবায়নের অগ্রগতি পরিমাপ করাও সহজ হবে।
বৈঠকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় সাম্প্রতিক অগ্রগতিকে ইতিবাচক হিসেবে তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালু এবং বৈদেশিক লেনদেনে ভারসাম্য আনার ক্ষেত্রে নেওয়া পদক্ষেপগুলো কার্যকর হয়েছে বলে উল্লেখ করে আইএমএফ। তবে এসব পদক্ষেপ টেকসই করতে হলে নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি বলে মত দেয় সংস্থাটি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী বৈঠক শেষে জানান, ঋণ কর্মসূচির পরবর্তী কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আগামী এপ্রিলে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠকের পর নেওয়া হবে। এর আগে একটি রিভিউ মিশন বাংলাদেশ সফর করে সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও সংস্কারের অগ্রগতি মূল্যায়ন করবে। সেই মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী কিস্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।
আইএমএফের সঙ্গে চলমান ঋণ কর্মসূচির অধীনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত এখনো পূরণ হয়নি। খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা পুনর্নির্ধারণ, ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের খেলাপি ঋণ নির্দিষ্ট সীমার নিচে নামিয়ে আনার মতো বিষয়গুলো গত কয়েক বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি। একইভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা এখনও আইনি প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়নি।
এদিকে বিনিময় হার ব্যবস্থায় ক্রলিং পেগ পদ্ধতি চালুর মাধ্যমে কিছুটা স্থিতিশীলতা আনার চেষ্টা করা হয়েছে। একই সঙ্গে আইএমএফের নির্ধারিত হিসাব পদ্ধতিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গণনা শুরু হয়েছে, যদিও সনাতনী পদ্ধতিও সমান্তরালভাবে চালু রয়েছে। ফলে রিজার্ভের প্রকৃত অবস্থান নিয়ে দ্বৈত চিত্র তৈরি হচ্ছে, যা নীতিনির্ধারণে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের মত।
রাজস্ব খাতেও সংস্কারের গতি প্রত্যাশিত নয়। আইএমএফের পরামর্শ অনুযায়ী জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে পুনর্গঠন করে রাজস্বনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনাÑ এই দুই পৃথক কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন আটকে আছে। একইভাবে করছাড় কমিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হলেও তা এখনও অসম্পূর্ণ। বিভিন্ন খাতে দীর্ঘদিন ধরে দেওয়া করসুবিধা প্রত্যাহার করতে গিয়ে নীতিনির্ধারকদের একদিকে রাজস্ব বাড়ানোর চাপ, অন্যদিকে বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কাÑ এই দ্বৈত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
বর্তমানে দেশে বহুমাত্রিক ভ্যাট হার চালু থাকায় কর ব্যবস্থায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। আইএমএফ একক ভ্যাট হার চালুর পক্ষে মত দিলেও তা বাস্তবায়নে প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। একই সঙ্গে ভ্যাট ও আয়কর প্রশাসন আধুনিকায়নের যে পরিকল্পনা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চূড়ান্ত হওয়ার কথা ছিল, সেটিও এখনও সম্পন্ন হয়নি।
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ ইতোমধ্যে পাঁচ কিস্তিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ পেয়েছে। তবে ষষ্ঠ কিস্তি নির্ধারিত সময়ে ছাড় না হওয়ায় সংস্কার বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বাকি অর্থ পেতে হলে শর্ত পূরণে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অর্থনৈতিক সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা জোরদার করা হয়েছে। তবে বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মধ্যে এখনও বড় ধরনের ব্যবধান রয়ে গেছে। আইএমএফের সাম্প্রতিক এই রোডম্যাপ চাওয়ার মধ্য দিয়ে সেই ব্যবধান কমিয়ে আনার চাপ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।