বিজিএমইএর দাবি
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৮ মার্চ ২০২৬ ২০:৪৪ পিএম
আপডেট : ১৮ মার্চ ২০২৬ ২১:০৩ পিএম
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, দীর্ঘস্থায়ী ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার চাপে দেশের তৈরি পোশাক শিল্প যখন একধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময়েই শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও ঈদ বোনাস পরিশোধে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে খাতটির উদ্যোক্তারা। এমনকি আইনগত বাধ্যবাধকতা না থাকা সত্ত্বেও মানবিক বিবেচনায় মার্চ মাসের আংশিক বেতন অগ্রিম হিসেবে দিয়েছেন প্রায় ৬৪ শতাংশ কারখানার মালিক।
বুধবার (১৮ মার্চ) সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান এ তথ্য জানিয়েছেন। রাজধানীর উত্তরায় বিজিএমইএর প্রধান কার্যালয়ে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
মাহমুদ হাসান খান বলেন, শিল্প খাত বর্তমানে বহুমাত্রিক চাপে থাকলেও উদ্যোক্তারা শ্রমিকদের প্রতি দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে বেতন, ভাতা ও উৎসব বোনাস পরিশোধে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, এই প্রচেষ্টার ফলে অধিকাংশ শ্রমিকই ঈদের আগে তাদের প্রাপ্য বুঝে পেয়েছেন, যা শিল্পাঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বিজিএমইএর তালিকাভুক্ত কারখানাগুলোর মধ্যে ৯৯ দশমিক ৯১ শতাংশ কারখানায় ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন পরিশোধ করা হয়েছে। একই সময়ে ৯৯ দশমিক ৮১ শতাংশ কারখানায় ঈদ বোনাস দেওয়া হয়েছে। অবশিষ্ট অল্পসংখ্যক কারখানার বকেয়া পরিশোধ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং তা দ্রুত সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন হবে বলে জানানো হয়।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলমান বৈদেশিক বাজারে ক্রেতা সংকোচন, মূল্যচাপ এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির মতো বাস্তবতা সত্ত্বেও উদ্যোক্তারা শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। বিশেষ করে ডলার সংকট, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের অনিশ্চয়তার মধ্যেও এই উচ্চমাত্রার পরিশোধ হার শিল্প খাতের স্থিতিস্থাপকতার ইঙ্গিত বহন করে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, ঈদকে সামনে রেখে শ্রমিকদের বাড়ি ফেরা নির্বিঘ্ন করতে শিল্পাঞ্চলভিত্তিক ধাপে ধাপে ছুটি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১৭ মার্চ পর্যন্ত প্রায় ৫০ শতাংশ কারখানায় ছুটি কার্যকর হয়েছে। বাকি কারখানাগুলোতেও পর্যায়ক্রমে ছুটি দেওয়া হচ্ছে, যাতে একই সময়ে অতিরিক্ত যাত্রীচাপ সৃষ্টি না হয় এবং সড়ক ও মহাসড়কে যানজট কমানো সম্ভব হয়।
মাহমুদ হাসান খান বলেন, শ্রমিকরা যাতে আইনসম্মত পাওনা সময়মতো বুঝে পান, তা নিশ্চিত করতে বিজিএমইএ সদস্যরা সমন্বিতভাবে কাজ করেছেন। এর ফলে শিল্প এলাকায় সম্ভাব্য অস্থিরতা এড়ানো গেছে এবং উৎপাদন ব্যবস্থায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, শ্রমিকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয় নয়, বরং এটি শিল্পের টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্যও অপরিহার্য।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার শিল্পবান্ধব ও শ্রমবান্ধব নীতির অংশ হিসেবে পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সহায়তা প্যাকেজ চালু করেছে। এর আওতায় ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন পরিশোধে সহজ শর্তে ঋণসুবিধা দেওয়া হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার নগদ সহায়তা ছাড় করা হয়েছে, যা তীব্র তারল্যসংকটে থাকা অনেক কারখানাকে স্বস্তি দিয়েছে। এই সহায়তা উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখা এবং রপ্তানি প্রবাহ ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত বিজিএমইএর নেতারা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রাখতে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নতুন বাজার অনুসন্ধানের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে, যাতে শিল্প খাত দীর্ঘমেয়াদে টেকসই অবস্থানে থাকতে পারে।
অনুষ্ঠানে বিজিএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি ইনামুল হক খান, সহসভাপতি মিজানুর রহমান, সহসভাপতি ভিদিয়া অমৃত খান, সহসভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরীসহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া পরিচালক শাহ রাঈদ চৌধুরী, ফয়সাল সামাদ, নাফিস উদ দৌলা, মজুমদার আরিফুর রহমান, শেখ হোসেন মোহাম্মদ মোস্তাফিজ, কাজী মিজানুর রহমান, জোয়ার্দার মোহাম্মদ হোসনে কমার আলম, এবিএম সামছুদ্দিন, রশিদ আহমেদ হোসাইনী, রুমানা রশীদ, মোহাম্মদ সোহেল ও সামিহা আজিম অনুষ্ঠানে অংশ নেন। জনসংযোগ ও প্রচার কমিটির চেয়ারম্যান মাসুদ কবির এবং ওয়ান-স্টপ সেলের চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক ভূঁইয়াও উপস্থিত ছিলেন।