চাকরির তথ্য
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৭ মার্চ ২০২৬ ২১:১৬ পিএম
বাংলাদেশের শ্রমবাজারে গত এক দশকে প্রবেশ করা বিপুলসংখ্যক তরুণের একটি বড় অংশ কর্মসংস্থানের বাইরে থেকে গেছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জাট। তিনি বলেছেন, এই সময়ে প্রায় অর্ধেক কর্মক্ষম তরুণ চাকরি পাননি এবং নারীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও প্রতিকূল।
মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) এক বিবৃতিতে জোহানেস জাট এই কথা বলেন। তিন দিনের সফরকালে তিনি অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে সরকারের উন্নয়ন অগ্রাধিকার এবং কোন কোন ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক সহায়তা করতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা হয়।
জোহানেস জাটের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে দেশের শ্রমবাজারে নতুন করে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ যুক্ত হয়েছেন। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে মাত্র ৮৭ লাখ। ফলে প্রায় অর্ধেকেরও বেশি নতুন প্রবেশকারী তরুণ শ্রমবাজারে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নিতে পারেননি। এই বড় ব্যবধান বাংলাদেশের অর্থনীতির ভেতরে বিদ্যমান কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয় বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, এই চিত্রটি কেবল সংখ্যাগত ঘাটতি নয়; বরং এটি উৎপাদন কাঠামোর সীমাবদ্ধতা, শিল্পায়নের ধীরগতি, বিনিয়োগের ঘাটতি এবং দক্ষতা উন্নয়নের অপ্রতুলতার প্রতিফলন। তরুণরা শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের উপযোগী কাজের সুযোগ তৈরি না হওয়ায় একদিকে যেমন বেকারত্ব বাড়ছে, অন্যদিকে অনেক ক্ষেত্রে আংশিক বা অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে। এতে উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে এবং আয়ের স্থিতিশীলতা ব্যাহত হচ্ছে।
বিশেষভাবে নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ নিয়ে উদ্বেগ তুলে ধরে তিনি বলেন, তরুণীদের জন্য চাকরির সুযোগ আরও সীমিত। সামাজিক ও পারিবারিক প্রতিবন্ধকতা, নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য এবং দক্ষতার সীমাবদ্ধতাÑ এসব কারণে নারীরা শ্রমবাজারে প্রবেশ ও টিকে থাকার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন। ফলে অর্থনীতির একটি বড় সম্ভাবনাময় অংশ পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
সফরকালে জোহানেস জাট সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন। এর মধ্যে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে আলোচনা হয়। এসব বৈঠকে দেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে বিস্তারিত আলাপ হয়।
তিনি উল্লেখ করেন, সরকার বৃহৎ পরিসরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাংক গ্রুপও তাদের সহায়তা আরও জোরদার করতে আগ্রহী। বিশেষ করে যুবসমাজ ও নারীদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরির উদ্যোগগুলোকে এগিয়ে নিতে সহায়তা বাড়ানো হচ্ছে বলে তিনি জানান।
জোহানেস জাট বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে অনিশ্চয়তা বেড়েছে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। এই পরিস্থিতিতে প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখা এবং তা থেকে বাস্তব কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হলে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষমাণ সংস্কারগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি। তিনি বিশেষভাবে সামষ্টিক অর্থনীতি ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা, রাজস্ব ব্যবস্থার দক্ষতা এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতির ওপর জোর দেন।
তার মতে, বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধি অর্জনের ধারাবাহিকতা থাকলেও সেই প্রবৃদ্ধি পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানে রূপ নিচ্ছে না। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধির গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শ্রমঘন শিল্পের সম্প্রসারণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা এবং প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে এই ঘাটতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বিশ্বব্যাংক সদস্য দেশগুলোকে এমন অর্থনীতি গড়ে তুলতে সহায়তা করছে, যেখানে প্রবৃদ্ধি সরাসরি স্থানীয় কর্মসংস্থানে পরিণত হয়। এজন্য ভৌত অবকাঠামোর পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো হচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা, নীতিগত অনিশ্চয়তা কমানো এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিয়ে এর আগে উদ্বেগ প্রকাশ করে সংস্থাটি। ‘বাংলাদেশ : দারিদ্র্য ও বৈষম্য বিশ্লেষণ, সমৃদ্ধির পথে অগ্রযাত্রা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত চার বছর ধরে দেশে দারিদ্র্যের হার বাড়ছে। সংস্থাটির অনুমান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দারিদ্র্যের হার ২১ শতাংশের কিছু বেশি হতে পারে এবং দরিদ্র মানুষের সংখ্যা দাঁড়াতে পারে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখে।
এ ছাড়া দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে অবস্থান করছে, যারা অর্থনৈতিক ধাক্কাÑ বিশেষ করে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সহজেই আবার দারিদ্র্যের নিচে নেমে যেতে পারে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২২ সালে এই ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ। এই শ্রেণির মানুষের আয় অনিশ্চিত এবং তাদের সঞ্চয় বা সুরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় অর্থনীতির সামান্য পরিবর্তনেও তারা বিপদে পড়ে।
বাংলাদেশে নব্বইয়ের দশক থেকে দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও সাম্প্রতিক সময়ে সেই ধারায় স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে। ১৯৯১-৯২ সালে যেখানে দারিদ্র্যের হার ছিল ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশ, সেখানে পরবর্তী দুই দশকে তা দ্রুত কমে আসে এবং আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশ এই ক্ষেত্রে প্রশংসা পায়। তবে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক চাপ, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা এবং আয়ের বৈষম্য বৃদ্ধির কারণে সেই অগ্রগতি কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কর্মসংস্থানের এই সংকট এবং দারিদ্র্যের পুনরুত্থান একই সুতোয় গাঁথা। পর্যাপ্ত ও টেকসই কর্মসংস্থান তৈরি না হলে দারিদ্র্য হ্রাসের অর্জন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে তরুণদের একটি বড় অংশ যদি দীর্ঘ সময় কর্মসংস্থানের বাইরে থাকে, তাহলে তা অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে কাজ করছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি এ পর্যন্ত বাংলাদেশকে ৪৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থায়ন প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যার মধ্যে অনুদান, সুদমুক্ত ঋণ এবং স্বল্পসুদে ঋণ রয়েছে। এই সহায়তার মাধ্যমে দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্বালানি এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।