মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০২৬ ১০:৫০ এএম
আপডেট : ০৯ মার্চ ২০২৬ ১০:৫৭ এএম
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় ৮ মার্চ, ২০২৬ তারিখে ইরানের তেহরানে অবস্থিত একটি তেল কারখানা আক্রান্ত হওয়ার পর সেখান থেকে ওঠা ধোঁয়ার কুণ্ডলী মেঘলা আকাশের সাথে মিশে যায়। ছবি: রয়টার্স
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে ১১৫ ডলারে পৌঁছেছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা ছিল, চলতি সপ্তাহে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাবে। বাস্তবে সপ্তাহের প্রথম দিনই (এশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোয় সপ্তাহ শুরু হয় সোমবার থেকে) সেই আশঙ্কা সত্যি হয়েছে।
বিবিসি ও আল–জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, এশিয়ার বাজারে কেনাবেচা শুরু হওয়ার পর সোমবার সকালে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রায় ২২ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৫ ডলারে উঠে যায়।
একই সময়ে ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ২২ শতাংশ বেড়ে ১১৩ দশমিক ৪০ ডলার এবং মারাবান ক্রুডের দাম প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছায়।
এর আগে গত সপ্তাহেও তেলের দাম প্রায় ২৮ শতাংশ বেড়েছিল। ২০২০ সালে করোনা মহামারি শুরুর পর এক দিনে এটিই তেলের দামের সবচেয়ে বড় উল্লম্ফন।
জ্বালানি সরবরাহে উদ্বেগ
বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত তীব্র হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরানও পাল্টা জবাব দিচ্ছে। সম্প্রতি ইরানের বিভিন্ন স্থানে তেলের ডিপোসহ গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোতে বিমান হামলার খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে ওপেকের তিন বড় উৎপাদক দেশ—ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত—তেল উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা আরও বেড়েছে।
এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলছে, তেলের দাম প্রতি ১০ শতাংশ বাড়লে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি প্রায় ০.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে এবং বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমতে পারে প্রায় ০.১৫ শতাংশ।
শেয়ারবাজারেও ধস
তেলের দামের এই উল্লম্ফনের সঙ্গে সঙ্গে এশিয়ার শেয়ারবাজারেও বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। সোমবার জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক ৭ শতাংশের বেশি কমেছে।
হংকংয়ের হ্যাংসেং সূচক নেমেছে ৩ শতাংশের বেশি। অস্ট্রেলিয়ার এএসএক্স ২০০ সূচক কমেছে ৪ শতাংশের বেশি।
দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি সূচকের পতন ছিল আরও তীব্র—৮ শতাংশের বেশি। বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হয়ে শেয়ার বিক্রি শুরু করেন। এই আতঙ্কজনিত বিক্রি ঠেকাতে ২০ মিনিটের জন্য লেনদেন বন্ধ করে দেওয়া হয়।
বাজারে অতিরিক্ত বিক্রি ঠেকাতে ব্যবহৃত এই ব্যবস্থা হলো ‘সার্কিট ব্রেকার। এর আগেও বুধবার কোসপি সূচক ১২ শতাংশ পড়ে গেলে একই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
তেলের দাম ১৫০ ডলার ছাড়ানোর আশঙ্কা
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। ওয়াশিংটনভিত্তিক পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদ আদনান মাজরেইয়ের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলে তেল উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কার কারণেই বাজারে তেলের দামের এই উল্লম্ফন দেখা যাচ্ছে।
কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, যদি মার্চের শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকে, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে নতুন রেকর্ড গড়তে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, স্বল্প মেয়াদে তেলের দামের এই বৃদ্ধি বড় বিষয় নয়। ইরানের পারমাণবিক হুমকি দূর করতে হলে এই মূল্য দিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলের দাম বাড়লে জেট জ্বালানি, সার উৎপাদনের কাঁচামালসহ বিভিন্ন পণ্যের দামও বাড়তে পারে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে ভোক্তা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।