জিইডির ইকোনমিক আপডেট
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৫ মার্চ ২০২৬ ২১:১০ পিএম
উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি এবং বিনিয়োগে অনিশ্চয়তাসহ বর্তমানে নানা চাপে রয়েছে দেশের অর্থনীতি। এসব বাস্তবতার মধ্যেই দায়িত্ব নিয়েছে নতুন সরকার। অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) ফেব্রুয়ারি মাসের অর্থনৈতিক হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চালের দামের চাপ কিছুটা কমলেও মাছ, সবজি ও ফলের দাম বাড়ার কারণে খাদ্য মূল্যস্ফীতি আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। এর ফলে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে, যা ডিসেম্বর মাসে ছিল ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। যদিও চালের দাম কিছুটা কমেছে, কিন্তু অন্যান্য খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার কারণে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমেনি।
খাদ্য মূল্যস্ফীতির খাতভিত্তিক বিশেস্নষণে দেখা যায়, ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে চালের অবদান উলেস্নখযোগ্যভাবে কমেছে। চালের মূল্যস্ফীতিও কমে ১১ দশমিক ৯২ শতাংশ থেকে ৭ দশমিক ৬১ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে একই সময়ে মাছ, ফল ও সবজির দাম বাড়ায় সামগ্রিক খাদ্য মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ বজায় রয়েছে।
বিশেষ করে সবজির দাম পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ডিসেম্বর মাসে সবজি মূল্যস্ফীতিতে নেতিবাচক অবদান রাখলেও জানুয়ারিতে তা ইতিবাচক হয়ে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং পাইকারি বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের উচ্চ মুনাফার প্রবণতার কারণে সবজির দাম বেড়েছে।
অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মজুরি না বাড়ায় সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমছে। জানুয়ারিতে যেখানে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে, সেখানে মজুরি বৃদ্ধির হার মাত্র ৮ দশমিক ৮ শতাংশের কাছাকাছি নয়, বরং ৮ দশমিক ০৮ শতাংশে সীমাবদ্ধ রয়েছে। ফলে প্রকৃত অর্থে মানুষের আয় কমে যাচ্ছে।
গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে টানা কয়েক মাস ধরে মূল্যস্ফীতি মজুরি বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এর ফলে বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে চাপে পড়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার প্রভাব এই শ্রেণির মানুষের ওপর সবচেয়ে বেশি পড়ে, কারণ তাদের আয়ের বড় অংশই খাদ্য ও মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যয় হয়।
রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রেও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জানুয়ারি মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫২ হাজার ৫৪৫ কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবে আদায় হয়েছে ৩৭ হাজার ৩৩ কোটি টাকা। ফলে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১৫ হাজার ৫১২ কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় হয়েছে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৭০ দশমিক ৪৮ শতাংশ রাজস্ব সংগ্রহ করতে পেরেছে এনবিআর।
যদিও ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে রাজস্ব আদায় কিছুটা বেড়েছে, তবে সামগ্রিকভাবে এটি প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব আদায়ে এই ঘাটতি সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন ব্যয়ের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে এর প্রভাব পড়তে পারে।
উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও ধীরগতির চিত্র স্পষ্ট। চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৫০ হাজার ৫৫৬ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের প্রায় ২১ দশমিক ১৮ শতাংশ। অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়েও এডিপি বাস্তবায়নের এই হার গত পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্প প্রস্তুতির দুর্বলতা, ক্রয় প্রক্রিয়ার জটিলতা, প্রশাসনিক সমন্বয়ের ঘাটতি এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে উন্নয়ন ব্যয়ের গতি কমে গেছে। এর ফলে অর্থবছরের শেষ দিকে তড়িঘড়ি করে ব্যয় বাড়ানোর প্রবণতা দেখা দিতে পারে, যা প্রকল্প বাসত্মবায়নের মান ও কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তবে বৈদেশিক খাতে কিছু ইতিবাচক লক্ষণও রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ডিসেম্বর মাসে কিছুটা বাড়ার পর জানুয়ারিতে স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। জানুয়ারিতে মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৩৩ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলারে অবস্থান করছে।
একই সঙ্গে প্রবাসী আয় প্রবাহও তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে রমজান মাসকে সামনে রেখে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী রাখতে সহায়তা করবে।
রপ্তানি খাতে তৈরি পোশাক শিল্প এখনও দেশের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পোশাক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক থাকলেও অ-পোশাক খাতে রপ্তানি বৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে ধীর।