সেমিনারে সিপিডি
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০২৬ ২২:০৫ পিএম
আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২৬ ২২:১৭ পিএম
দেশের অর্থনীতি ভাঙনের মুখে না পৌঁছলেও এখনও বহুমাত্রিক চাপে আবদ্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মতে, সাম্প্রতিক প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাড়লেও বিনিয়োগ, রাজস্ব সংগ্রহ, ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি ও বৈদেশিক বাণিজ্যে দুর্বলতা- এসব কাঠামোগত সমস্যা কাটেনি। ফলে পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত মিললেও তা কতটা টেকসই হবে, সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
বুধবার (৪ মার্চ) ঢাকার সিপিডি ও দ্য ডেইলি স্টার আয়োজিত ‘বাংলাদেশের উন্নয়নের দিকে নজর : স্বল্প থেকে মধ্যমেয়াদে নবনির্বাচিত সরকারের অগ্রাধিকার’ শীর্ষক এক সেমিনারে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।
উপস্থাপিত প্রবন্ধে জানানো হয়, ২০২৫ অর্থবছরে দেশের বাস্তব জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৪ দশমিক ২ শতাংশ। শিল্প খাতে প্রত্যাশিত উৎপাদন সম্প্রসারণ হয়নি, সেবা খাতে ভোগব্যয় কমেছে এবং নতুন বিনিয়োগে অনীহা দেখা গেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক খাতে তারল্য সংকট বিনিয়োগ সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
তবে ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৪ দশমিক ৫০ শতাংশে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ। সিপিডির মতে, এটি আংশিক পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দিলেও অর্থনীতির মৌলিক দুর্বলতা রয়ে গেছে। শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি চাহিদা এবং বেসরকারি বিনিয়োগে শক্তিশালী ধারাবাহিকতা না এলে এই প্রবৃদ্ধি স্থায়ী হবে না।
মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে বলা হয়, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। খাদ্যদ্রব্যের দাম কিছুটা কমায় এ হার নেমেছে। তবে এটি এখনও উচ্চসীমার কাছাকাছি। একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১২ শতাংশে থাকায় প্রকৃত আয় বৃদ্ধি খুব বেশি হয়নি। ফলে ভোগব্যয় ও সঞ্চয়Ñ উভয় ক্ষেত্রেই চাপ বজায় রয়েছে।
ব্যাংকিং খাতে ঋণপ্রবাহের চিত্রও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৬ দশমিক ১০ শতাংশে, যা দীর্ঘ সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিপরীতে সরকারের নিট ঋণপ্রবৃদ্ধি বেড়ে ৩২ দশমিক ১৯ শতাংশে পৌঁছেছে। রাজস্ব ঘাটতি পূরণে ব্যাংকিং খাত থেকে অধিক ঋণগ্রহণের ফলে বেসরকারি খাতের জন্য অর্থপ্রবাহ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রাজস্ব পরিস্থিতিও চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত কমে ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশে নেমেছে। মোট ঋণ-জিডিপি অনুপাত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮ দশমিক ৬১ শতাংশে। যদিও ঋণঝুঁকি এখনও নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি, সুদের বোঝা বাড়তে থাকলে ভবিষ্যৎ বাজেটে তা বড় চাপ তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে সিপিডি। তবে ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১৭ দশমিক ৭৪ শতাংশে পৌঁছানোকে ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ঋণ শ্রেণিকরণ চালুর পর খেলাপি ঋণের হার ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে ওঠে। পরে পুনঃতফসিলের মাধ্যমে তা কমে ডিসেম্বরে ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশে দাঁড়ায়। সিপিডির মতে, পুনঃতফসিল স্বল্পমেয়াদি স্বস্তি দিলেও কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি স্থায়ীভাবে কমবে না।
বৈদেশিক খাতেও মিশ্র চিত্র দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ছিল ঋণাত্মক ১ দশমিক ৯৩ শতাংশ। তবে একই সময়ে প্রবাসী আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় ২১ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেশি। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে এবং প্রায় সাড়ে পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। তবে রপ্তানির ধারাবাহিক দুর্বলতা দীর্ঘমেয়াদে চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে মন্তব্য করা হয়।
সিপিডি আরও জানায়, এলডিসি উত্তরণের ফলে বর্তমান বাণিজ্য সুবিধার বড় অংশ উঠে যাবে। দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ রপ্তানি এসব সুবিধার আওতায় থাকায় ভবিষ্যতে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা বাড়বে। এ পরিস্থিতিতে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তি বিনিয়োগ ও দক্ষতা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর অনুষ্ঠানে বলেন, বর্তমান সরকারের লক্ষ্য ভোগভিত্তিক প্রবৃদ্ধি থেকে সরে এসে বিনিয়োগভিত্তিক টেকসই অর্থনৈতিক মডেল গড়ে তোলা। তিনি জানান, অতীতের ঋণনির্ভর সম্প্রসারণই অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করেছে। এখন অপচয় রোধ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের মাধ্যমে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সামাজিক সুরক্ষায় স্বচ্ছতা আনতে ‘ওয়ান সিটিজেন ওয়ান কার্ড’ চালুর কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি ও হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ কে আজাদ বলেন, এতদিন যারা ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে ব্যবসায় বিনিয়োগ করেনি, তাদের বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর হাতে ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে অর্থনীতি ভালো জায়গায় আসবে না।