প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২০:৪৪ পিএম
আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:১৪ পিএম
বাংলাদেশ ব্যাংকের হবু গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণে এনে নাগরিকদের স্বস্তিতে রাখার বিশাল চ্যালেঞ্জ যখন বিএনপি নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকারের সামনে, তখন প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ ব্যাংক পেল পেশায় ব্যবসায়ী এক গভর্নর।
পোশাক খাতের ব্যবসায়ী মো. মোস্তাকুর রহমানকে বুধবার নতুন গভর্নরের দায়িত্ব দিয়েছে তারেক রহমানের সরকার, যিনি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন।
ঢাকায় ১৯৬৬ সালে তার জন্ম; বাড়ি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার জামপুর ইউনিয়নে। তার বড় ভাই মো. মোস্তাফিজুর রহমান মামুন ছিলেন থানা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি।
মোস্তাকুর বর্তমানে রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান হেরা সোয়েটারস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় গভর্নর হওয়া আহসান এইচ মনসুরের স্থলাভিষিক্ত হবেন তিনি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বুধবার এক প্রজ্ঞাপনে জানিয়েছে, “বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ, ১৯৭২ (১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির আদেশ নং ১২৭) এর ১০(৫) অনুযায়ী মো. মোস্তাকুর রহমান এফসিএমএ কে অন্যান্য সকল প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সাথে কর্ম-সম্পর্ক পরিত্যাগের শর্তে তার যোগদানের তারিখ থেকে ৪ (চার) বছরের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক এর গভর্নর পদে নিয়োগ প্রদান করা হল।”
বাংলাদেশের ইতিহাসে ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ ও আমলার বাইরে এই প্রথম একজন ব্যবসায়ীকে গভর্নরের দায়িত্ব দেওয়া হল, যা এ খাত সংশ্লিষ্ট অনেককে বিস্মিত করেছে।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পরিবর্তনকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বলে উল্লেখ করেছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তাদের অগ্রাধিকার, কর্মসূচি ও নীতিগত চিন্তা বাস্তবায়নের প্রয়োজনে বিভিন্ন জায়গায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতেও এ ধরনের পরিবর্তন অব্যাহত থাকবে।
সচিবালয়ে
বুধবার সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “বিবেচনার তো কিছু নাই। একটি নতুন
সরকার এসেছে, তাদের নিজস্ব প্রায়োরিটি আছে। পরিবর্তন শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকেই হয়নি,
অনেক জায়গায় হয়েছে এবং এটি চলমান থাকবে। এটা খুবই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।”
গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৫ সালের জুলাই থেকে মোস্তাকুর রহমান পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এক সময় পুঁজিবাজারের ব্রোকারেজ হাউজ এবং আবাসন ব্যবসাতেও যুক্ত ছিলেন।
১৯৯৮ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ছিলেন চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের বোর্ড সদস্য ছিলেন। এ ছাড়া তিনি ঢাকা চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (ডিসিসিআই), রিহ্যাব, এবং আটাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ পেশাজীবী ও ব্যবসায়ী সংগঠনের সদস্য।
মোস্তাকুর রহমান ইনস্টিটিউট অফ কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অফ বাংলাদেশের (আইসিএমএবি) একজন ফেলো মেম্বার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাকাউন্টিংয়ে স্থাতক ও স্নাতকোত্তর করার পর ১৯৯১ সালে ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি) থেকে এফসিএমএ করেন মোস্তাকুর।
ত্রিশ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি করপোরেট ফিন্যান্স, রপ্তানি, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করছেন বলে জানা যায়।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের ১৪ অগাস্ট অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুরকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব দেয়। তার নেতৃত্বে শুরু হয় ব্যাংক খাতের সংস্কারের কাজ।
দেড় বছরের মাথায় তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে বুধবার আলাদা প্রজ্ঞাপন জারি করেছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। সেখানে তার নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করার কথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বুধবার সকালে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের পদত্যাগ দাবি করে ‘বিক্ষোভ’ করেন। এ পরিস্থিতিতে দুপুরের দিকে আহসান এইচ মনসুর অফিস ছেড়ে চলে যান।
ওই সময়ই মোস্তাকুর রহমান নতুন গভর্নর হচ্ছেন বলে অর্থমন্ত্রণালয় থেকে খবর আসে। তবে কোন মোস্তাকুর রহমান গভর্নর হচ্ছেন এটি নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত বেলা সাড়ে ৩টায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রজ্ঞাপন জারি হলো।
নতুন দায়িত্বে যোগ দিতে ইতিমধ্যে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হেরা সোয়েটার গার্মেন্ট ছেড়ে দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা সেরেছেন মোস্তাকুর।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ড্টকমকে দেওয়া তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নতুন দায়িত্ব পাওয়া এই ব্যবসায়ী বলেছেন, ব্যাংকিং খাতে ‘আস্থা বাড়ানোকে’ মূল কাজ ধরে নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গুরু দায়িত্ব শুরু করতে চান। একই সঙ্গে সুদের হার কমিয়ে আনার চেষ্টাও তার অগ্রাধিকারে থাকবে।
গভর্নর হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ে কী ভাবছেন—এমন প্রশ্নে মোস্তাকুর রহমান বলেন, “আসলে জানেনইতো অর্থনীতির অবস্থা, ব্যাংকিং খাতের অবস্থা। তাই এই সময়টায় এই দায়িত্ব নিয়ে কাজ করায়তো ‘একটা চ্যালেঞ্জ আছে’।
“ইনশাল্লাহ, আগে ব্যাংকে বসি। সবার সাথে আলোচনা করি। আশা করি সবার সহযোগিতা নিয়ে প্রধান কাজটা হবে- আগে ‘ট্রাস্ট বিল্ডিং’ ব্যাংকিং খাতে। শৃঙ্খলা আরও ফিরায়ে নিয়ে আসা। নিশ্চয়ই আগের গভর্নর (আহসান এইচ মনসুর) অনেকখানি নিয়ে আসছে, আরও নিয়ে আসা।”
তার ভাষ্য, “আরেকটা হচ্ছে আমাদের যেটা প্রধান থাকবে যে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য করে আমাদের অর্থনীতিকে যতটুকু রান করা যায়। আপনি জানেন যে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে আসছে, তাই না? তো, এরজন্য চেষ্টা করা- সুদের হারকে কমায়ে নিয়ে আসা। এই কাজগুলো করা।”
হবু গভর্নর হিসেবে তার করণীয় বিষয়ে জানতে চাইলে মোস্তাকুর রহমান বলেন, “আমাদের আগে কাজ করতে হবে। মানে আমরা কথা বলে ফেললাম, কাজ করতে পারলাম না–এরকম যাতে না হয়। আগে কাজ করি, দোয়া করেন। সবার সহযোগিতা চাই।”