প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২১:১৭ পিএম
আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২১:২৩ পিএম
সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ও নাগরিক প্লাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। ফাইল ছবি
অন্তর্বর্তী সরকার দেশের ঋণ পরিস্থিতি যেভাবে পেয়েছিল, তার চেয়ে আরও বেশি নাজুক ও ভঙ্গুর অবস্থায় রেখে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ও নাগরিক প্লাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টার ইনে নাগরিক প্লাটফর্ম আয়োজিত ‘নতুন সরকারের সূচনাবিন্দু : অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এ কথা বলেন তিনি। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংগঠনটির অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান।
নতুন সরকারকে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সংযমের পরামর্শ দিয়েছেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, সরকারের এ মুহূর্তে কোনো জনতুষ্টিবাদী পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ নেই। সরকারকে অবশ্যই বাজেটে কৃচ্ছ্রসাধন করতে হবে। কৃচ্ছ্রসাধন সম্ভব না হলে অন্তত আর্থিক সংযম দেখাতে হবে।
অনুষ্ঠানে নাগরিক প্লাটফর্মের আহ্বায়ক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, গত অন্তর্বর্তী সরকার যেসব ক্রয় চুক্তি করে গেছে, সেখানে নিয়মের কোনো ব্যত্যয় ঘটেছে কি না, তা পর্যালোচনা করে দেখা প্রয়োজন। গত সরকার বিভিন্ন ধরনের বৈদেশিক চুক্তিও করেছে। এসব চুক্তি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হয়নি বা শুধু বন্দর দিয়ে দেওয়ার জন্য হয়নি। অন্যান্য ক্ষেত্রেও হয়েছে, যেগুলো সম্পর্কে হয়তো আমরা এখনও অবহিত নই। এসব বৈদেশিক চুক্তিকে পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
নতুন সরকারকে একটি উত্তরণকালীন দল গঠনের পরামর্শ দেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ‘এই দলের প্রাথমিক কাজ হবে গত আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালের আর্থিক ব্যবস্থাপনার ময়নাতদন্ত করে একটি দলিল বা ব্রিফিং ডকুমেন্ট তৈরি করা। সেটার ভিত্তিতে রাষ্ট্রের বিভিন্ন পক্ষ ব্যবস্থা নিতে পারবে।’
এ ছাড়া আগামী মার্চ মাসের শেষ নাগাদ সরকার যেন জাতীয় সংসদে একটি আর্থিক বিবৃতি দেয়, সেই পরামর্শ দেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ২০০৯ সালে প্রণীত সরকারি আয়-ব্যয় ও বাজেট ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশে আর্থিক বিবৃতির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ধারা রয়েছে। এই আর্থিক বিবৃতি সরকারের আর্থিক স্বচ্ছতা ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পাহারাদার হবে।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘বলা হচ্ছে, ১৮০ দিনের একটি কর্মপরিকল্পনা নিয়ে সরকার এগোবে। তবে আমি সরকারের যেকোনো আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করার বিপক্ষে। আমি ধৈর্য ধরতে বলব। চলতি অর্থবছরে নতুন কিছু না করে; বরং পরবর্তী অর্থবছরের জন্য যথাযথভাবে পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন। আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সংযম দেখালে আগামী অর্থবছরে সরকার মূল্যস্ফীতি থেকে শুরু করে অন্য অসুবিধাগুলো পরিষ্কারভাবে উতরে যাবে।’
সরবরাহশৃঙ্খলে সিন্ডিকেট ব্যবস্থা নিয়েও কথা বলেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, আমাদের তথ্য–উপাত্ত বলছে, রমজান মাসের প্রয়োজনীয় পণ্যের যথেষ্ট পরিমাণে সরবরাহ রয়েছে। আমরা জানি যে নিত্যপণ্যের সরবরাহশৃঙ্খলে রাজনৈতিক প্রভাবাধীন সিন্ডিকেট রয়েছে। নতুন সরকারি দলের নেতারা বলেছেন, তারা সিন্ডিকেট ভেঙে দেবেন। সরকারের প্রথম দিন থেকে আমরা সেটি দেখার অপেক্ষায় আছি।
অনুষ্ঠানে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের ওপর দেওয়া প্রণোদনা ধীরে ধীরে কমানো উচিত। কারণ যে প্রণোদনা রেমিট্যান্সের ওপর দেওয়া হচ্ছে, তা আমাদের রাজস্বের ওপরে চাপ সৃষ্টি করছে। যদি ৩০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসে এবং তার ওপর আড়াই শতাংশ হারে প্রণোদনা দেওয়া হয়, তাহলে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়। এই অর্থনৈতিক চাপটা অবশ্যই আমাদের হিসাব করতে হবে।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এক্ষেত্রে প্রণোদনা কমানোর পাশাপাশি টাকার মূল্য বাজারভিত্তিক করা যেতে পারে। প্রবাসীরা তখন প্রতি ডলারের বিপরীতে দেশে বেশি টাকা পাবেন। ফলে টাকা কিছুটা অবমূল্যায়িত (ডেপ্রিসিয়েশন) হলে রেমিট্যান্সের প্রবাহে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, বর্তমানে অর্থনীতি একটি বড় সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নতুন সরকার সেই সংকটকালে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। এখানে তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এক, সমষ্টিগত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বর্তমানে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। দুই, ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান পরিস্থিতি একটি নির্ভরযোগ্য অবস্থানে নেই। তিন, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বর্তমানে অনেক সীমাবদ্ধ।
এমন পরিস্থিতিতে সরকারের জন্য কয়েকটি নীতি সুপারিশ করেছে সিপিডি। সংস্থাটি বলেছে, টাকার মান ধীরে ধীরে অবমূল্যায়ন করা উচিত। রেমিট্যান্স ও রপ্তানির জন্য প্রণোদনা কমিয়ে আনার সময় হয়েছে। আর চলতি বছরের বাজেট বাস্তবসম্মতভাবে সংশোধন করা প্রয়োজন, যাতে আগামীর অর্থবছরের জন্য সঠিক প্রস্তুতি নেওয়া যায়।
তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, সরকারের প্রথম কাজ হবে ২০২৪ সালের বাজেট সংশোধন করা। এ সংশোধনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কাঠামো প্রস্তুত করা। এরপর ধীরে ধীরে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দিকে এগোনো। তবে তা অবশ্যই আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় ধাপে ধাপে করা উচিত।