প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০০:১৩ এএম
জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগের মাস জানুয়ারিতে দেশের উন্নয়ন কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। মাসটিতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন হয় মাত্র ৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এ ছাড়া চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে এডিপি বাস্তবায়ন হয় মাত্র ২১ দশমিক ১৮ শতাংশ; যা সাম্প্রতিক দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল চিত্র।
পরিকল্পনা কমিশনের অধীন বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণে এ চিত্র পাওয়া যায়। আইএমইডির তথ্য বলছে, অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি সময়ে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ মিলিয়ে ব্যয় হয়েছে ৫০ হাজার ৫৫৬ কোটি ২৯ লাখ টাকা, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে ব্যয় ছিল ৫৯ হাজার ৮৭৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। বাস্তবায়নের হারও কমে এসেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে যেখানে হার ছিল ২১ দশমিক ৫২ শতাংশ, সেখানে এবার তা নেমে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ১৮ শতাংশে। এর আগের তিন অর্থবছরে প্রথম সাত মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ২৭, ২৮ এবং ৩০ শতাংশের বেশি।
এই স্থবিরতার মধ্যেই ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্বাচনের আগে প্রশাসনিক ব্যস্ততা, মাঠপর্যায়ের অনিশ্চয়তা এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের গা-ঢাকা দেওয়ার প্রবণতায় জানুয়ারিতে উন্নয়ন কার্যক্রম আরও মন্থর হয়ে পড়ে। যদিও একক মাস হিসেবে জানুয়ারিতে ব্যয় কিছুটা বেড়ে ৩ দশমিক ৬৪ শতাংশে দাঁড়ায়, আগের অর্থবছরের জানুয়ারিতে যা ছিল ৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ। তবু সামগ্রিক চিত্রে তাতে কোনো ইতিবাচক মোড় আসেনি।
আইএমইডির তথ্যানুযায়ী, অর্থবছরের অর্ধেক সময় পার হলেও ছয়টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এখনও বরাদ্দের ১০ শতাংশও বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এর মধ্যে রয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ, সুরক্ষা সেবা বিভাগ, জননিরাপত্তা বিভাগ এবং সংসদ বিষয়ক সচিবালয়। সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থা সংসদ বিষয়ক সচিবালয়ের, সাত মাসে সেখানে এক টাকাও খরচ হয়নি।
একই সময়ে বিশেষ প্রয়োজনে বরাদ্দ রাখা ১০ হাজার ৭৭১ কোটি ৬৭ লাখ টাকার তহবিল থেকেও কোনো অর্থ ব্যয় হয়নি। বিপরীতে খাদ্য মন্ত্রণালয় বরাদ্দের চেয়ে ১১৯ কোটি টাকার বেশি খরচ করেছে; তাদের বাস্তবায়ন হার দাঁড়িয়েছে ১৪৫ দশমিক ৯৮ শতাংশে। বাস্তবায়নের দিক থেকে এগিয়ে থাকা কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগÑ যেমন খাদ্য মন্ত্রণালয়, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এই সময়ের মধ্যে তাদের বরাদ্দের ৪০ শতাংশের বেশি ব্যয় করেছে।
উন্নয়ন ব্যয়ের এই নিম্নগতি আরও প্রকট হয়েছে সংশোধিত এডিপিতে বড় কাটছাঁটের পর। সরকার চলতি অর্থবছরে এডিপি থেকে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা কমিয়েছে, যা মোট বরাদ্দের ১৩ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ক্ষমতায় এসে অন্তর্বর্তী সরকার গত জুনে প্রথম বাজেট দেয়। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া উন্নয়ন নীতিতে সংশোধন এনে এডিপির আকার নির্ধারণ করা হয় ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। জানুয়ারিতে তা আরও কমিয়ে সংশোধিত এডিপি দাঁড়ায় ২ লাখ কোটি টাকায়। সবচেয়ে বেশি কাটছাঁট হয় স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে, স্বাস্থ্যসেবায় বরাদ্দ কমে ৭৩ শতাংশ এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় ৫৫ শতাংশ।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সাধারণত অর্থবছরের শুরুতে ব্যয় কম থাকলেও সময় গড়ালে তা বাড়ে। তবে এবার রাজনৈতিক অস্থিরতা, নির্বাচনী প্রক্রিয়া, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চাপ এবং নতুন সরকারের প্রকল্প পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত একসঙ্গে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে ধীর করে দেয়। এর ফলেই নির্বাচনের আগের মাস জানুয়ারিতে এডিপি বাস্তবায়ন কার্যত তলানিতে ঠেকে।
আইএমইডির ওয়েবসাইটে থাকা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে সংশোধিত এডিপির মোট বরাদ্দের ব্যয় হয়েছিল ৬৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ, আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ পয়েন্ট কম। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ হার ছিল ৮০ দশমিক ৬৩ শতাংশ। ২০০৪-০৫ অর্থবছর থেকে এডিপি বাস্তবায়নের যে পরিসংখ্যান রয়েছে, তাতে বিদায়ী অর্থবছরের মতো কম বাস্তবায়ন আর কোনো বছরে দেখা যায়নি; যা নির্বাচনী সময়ের প্রশাসনিক অচলাবস্থা ও নীতিগত অনিশ্চয়তার গভীর ছাপই তুলে ধরছে।