পুঁজিবাজার
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৮:০০ পিএম
আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:০৩ এএম
ডিএসই লেনদেন। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী হওয়ায় নতুন সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। আর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটতেই ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে পুঁজিবাজার।
নির্বাচনের পর লেনদেন হওয়া প্রথম কার্যদিবস রবিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) পুঁজিবাজারে বড় উত্থানের দেখা মিলেছে। এদিন যে কয়টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমেছে তার চেয়ে ১৪ গুণ বেশি সংখ্যকের দাম বেড়েছে। এতে প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ২০০ পয়েন্ট বেড়েছে। একই সঙ্গে বাজার মূলধন বেড়েছে ১২ হাজার কোটি টাকার ওপরে। পাশাপাশি পাঁচ মাস পর হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেনের দেখা মিলেছে। অপর বাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) উল্লম্ফন হয়েছে। বাজারটির প্রধান সূচক বেড়েছে প্রায় ৪৮৪ পয়েন্ট।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন সরকারের দ্রুত নীতিগত দিকনির্দেশনার আশায় বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কেনার দিকে ঝুঁকেছেন। নির্বাচনের আগে টানা কয়েক মাস অনিশ্চয়তা, তারল্য সংকট ও আস্থাহীনতার কারণে বাজারে স্থবিরতা ছিল। অনেক বিনিয়োগকারী সাইডলাইনে ছিলেন। ফলাফল ঘোষণার পর তারা নতুন করে অবস্থান নিতে শুরু করেছেন।
বিশ্লেষকরা বলেন, শুধু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রত্যাশাই নয়— অর্থনৈতিক সংস্কার, সুদহার নীতি, ডলার বাজারে স্থিতি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে নতুন সরকারের পদক্ষেপের দিকেও নজর থাকবে। যদি ঘোষিত সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়নের ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তবে এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা স্থায়ী হতে পারে।
গতকাল লেনদেন শেষে ডিএসইতে দাম বেড়েছে ৩৬৪টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের। বিপরীতে দাম কমেছে ২৬টির। আর ৪টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। এদিকে ভালো কোম্পানি বা ১০ শতাংশ অথবা তার বেশি লভ্যাংশ দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ১৯১টির শেয়ার দাম বেড়েছে। বিপরীতে ১৪টির দাম কমেছে এবং ২টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। মাঝারি মানের বা ১০ শতাংশের কম লভ্যাংশ দেওয়া ৭৭টি কোম্পানির শেয়ার দাম বাড়ার বিপরীতে ৩টির দাম কমেছে এবং ১টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। এ ছাড়া ‘জেড’ গ্রুপে স্থান হওয়া দুর্বল কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৯৬টির শেয়ার দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ৯টির এবং ১টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। আর তালিকাভুক্ত সব (৩৪টি) মিউচুয়াল ফান্ডের দাম বেড়েছে।
অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বাড়ার কারণে ডিএসইর বাজার মূলধন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ২১ হাজার ২৮২ কোটি টাকা, যা আগের কার্যদিবসের লেনদেন শেষে ছিল ৭ লাখ ৮ হাজার ৯৭৭ টাকা। অর্থাৎ বাজার মূলধন বেড়েছে ১২ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা।
বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দাম বাড়ায় ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ২০০ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৬০০ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর ৮ আগস্ট ডিএসইর প্রধান সূচক ৩০৬ পয়েন্ট বেড়েছিল। এরপর এই প্রথম একদিনে ডিএসইর প্রধান সূচক ২০০ পয়েন্ট বাড়ল। অন্য দুই সূচকের মধ্যে ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৩০ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ১২৭ পয়েন্টে অবস্থান করছে। আর ডিএসই-৩০ সূচক আগের দিনের তুলনায় ৮৬ পয়েন্ট বেড়ে ২ হাজার ১৪৫ পয়েন্টে উঠে এসেছে।
সবকটি সূচক বাড়ার পাশাপাশি ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণও বেড়েছে। বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ২৭৫ কোটি ৯ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ৭৯০ কোটি ১৫ টাকা। এ হিসাবে আগের কার্যদিবসের তুলনায় লেনদেন বেড়েছে ৪৮৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। এর মাধ্যমে গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বরের পর ডিএসইতে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হলো।
এই লেনদেনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে সিটি ব্যাংকের শেয়ার। কোম্পানিটির ৮০ কোটি ৭২ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা ঢাকা ব্যাংকের শেয়ার লেনদেন হয়েছে ৪২ কোটি ৪৮ লাখ টাকার। ৪১ কোটি ৮ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেনের মাধ্যমে তৃতীয় স্থানে রয়েছে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস। এ ছাড়া ডিএসইতে লেনদেনের দিক থেকে শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছেÑ ব্র্যাক ব্যাংক, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন, রবি, সায়হাম কটন, যমুনা ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, ওরিয়ন ইনফিউশন।
অন্যদিকে সিএসইতে সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৪৮৪ দশমিক ৩৭ পয়েন্ট বেড়ে ১৫ হাজার ৫১৮ পয়েন্টে অবস্থান করছে। এর আগে ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৪৬৭.১০ বেড়েছিল। এ ছাড়া সিএসসিএক্স সূচক আগের দিনের চেয়ে ২৮৩ দশমিক ৮৩ পয়েন্ট বেড়ে ৯ হাজার ৫৫৫ পয়েন্টে শরিয়া সূচক ১৯ দশমিক ১৯ পয়েন্ট বেড়ে ৯৩৮ পয়েন্টে এবং সিএসই ৩০ সূচক ৪৯৬ দশমিক ৪১ পয়েন্ট বেড়ে ১৪ হাজার ৬৪ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
বাজারটিতে মোট ২৪৭টি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে ২২টি কোম্পানির, কমেছে ১৭টির এবং অপরিবর্তিত আছে ৮টির। এ দিন সিএসইতে ২৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ৯ কোটি ৪০ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট।
এ বিষয়ে ডিএসই পরিচালক মো. শাকিল রিজভী গণমাধ্যমকে বলেন, বড় ধরনের কোনো সহিংসতা ছাড়াই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে এসেছে। তিনি বলেন, আমরা ধারণা করছি আগামী কয়েক দিন বাজার ভালো থাকবে। তবে বাজারের এই ভালো পরিস্থিতি স্থায়ী করতে হলে দ্রুত কিছু ভালো কোম্পানির শেয়ার আনতে হবে। সেই সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে বিনিয়োগবান্ধন পলিসি নিতে হবে। ভালো কোম্পানির আইপিও আনার পাশাপাশি বাজারে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংক লুটপাট যেন আর না হয়, সে বিষয়ে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম গণমাধ্যমে বলেন, নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হওয়ায় শেয়ারবাজার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে। এখন দ্রুত কিছু ভালো কোম্পানির আইপিও আনার ব্যবস্থা করতে হবে।