সুবল বড়ুয়া, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ ২১:৫৯ পিএম
আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ ২৩:৪১ পিএম
চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় দেশের একমাত্র সরকারি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের দ্বিতীয় ইউনিটের সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও সুদৃঢ় করতে প্রতিষ্ঠার ৫৭ বছর পর একমাত্র সরকারি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপনের মাধ্যমে সক্ষমতা দ্বিগুণ করার উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম
করপোরেশনের (বিপিসি) এই প্রকল্পটি চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় বাস্তবায়িত হলে দেশের জ্বালানি
তেল পরিশোধন সক্ষমতা বর্তমানের ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫০ শতাংশে উন্নীত হবে, যা আমদানিনির্ভরতা
কমিয়ে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা যাবে বলে মনে করছে সরকার।
এর জন্য গত ২৩ ডিসেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিশোধের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ৩৫ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পে অর্থায়নে ১ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা ঋণের প্রাথমিক প্রস্তাব দিয়েছে সৌদি আরবভিত্তিক ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইএসডিবি)।

পরিকল্পনা কমিশন
বলছে, ইআরএল সম্প্রসারণ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে বছরে ৩০ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি
তেল পরিশোধন করা যাবে। এতে দেশের পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের চাহিদার ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ পূরণ
করা সম্ভব হবে। দ্বিতীয় ইউনিট সম্প্রসারণ হলে জ্বালানি তেলের সংরক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি,
বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। প্রকল্পটি ২০২৫
সালের ডিসেম্বর থেকে ২০৩০ সালের নভেম্বর মেয়াদে বাস্তবায়ন করা হবে।
চট্টগ্রামের পতেঙ্গায়
১৯৬৮ সালে যাত্রা শুরু করে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড। পাঁচ দশকের বেশি সময় পার হলেও
এতদিন রিফাইনারিটির পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ানো হয়নি। এ সময়ে দেশে জ্বালানি তেলের চাহিদা
কয়েকগুণ বেড়েছে। ফলে সরকারকে প্রতিবছর বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে বিদেশ থেকে পরিশোধিত
জ্বালানি আমদানি করতে হচ্ছে।

ইআরএল সম্প্রসারণ
প্রকল্পে অর্থায়নে আগ্রহ প্রকাশ করে গত ২২ ডিসেম্বর আইএসডিবি ১ বিলিয়ন ডলারের প্রাথমিক
ঋণ প্রস্তাব করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একটি চিঠি দেয়, যাতে বাংলাদেশ সরকারও সম্মতি
জানায়। এরপর ২৪ ডিসেম্বর আইএসডিবির সঙ্গে প্রকল্পটি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক
বিভাগের (ইআরডি) অতিরিক্ত সচিব ও মধ্যপ্রাচ্য অনুবিভাগের প্রধান মোহাম্মদ মিজানুর রহমান
গত ডিসেম্বরে বলেছিলেন, আগামী জুনের মধ্যে আইএসডিবির সঙ্গে ঋণচুক্তি সইয়ের বিষয়ে প্রাথমিক
ঐকমত্য হয়েছে। তবে তার আগে জানুয়ারি মাসে আইএসডিবির একটি টেকনিক্যাল কমিটি বাংলাদেশ
সফরে আসবে। ওই সফরেই ঋণের শর্তগুলো চূড়ান্ত করা হবে।
মিজানুর রহমান আরও
বলেন, আইএসডিবি প্রাথমিকভাবে ১ বিলিয়ন ডলার ঋণের প্রস্তাব দিলেও প্রয়োজনে অতিরিক্ত
অর্থায়নের বিষয়েও তারা আগ্রহ দেখিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকেও দীর্ঘদিন ধরে এই প্রকল্পে
বৈদেশিক ঋণ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছিল।
এদিকে আইএসডিবির
টেকনিক্যাল কমিটি বাংলাদেশ সফরে এসেছে কি না— এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে
তথ্য পাওয়া যায়নি।
প্রধান উপদেষ্টা
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে একনেক ২৩ ডিসেম্বরের সভায় এই প্রকল্পের জন্য যে ৩৫
হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে, তার মধ্যে ২১ হাজার ২৭৮ কোটি
টাকা সরকারি তহবিল থেকে এবং বাকি ১৪ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা ইআরএলের নিজস্ব তহবিল থেকে
জোগান দেওয়ার কথা রয়েছে।
তবে পরিকল্পনা কমিশন
ও ইআরডির সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আইএসডিবির ঋণ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত
হলে প্রকল্পের অর্থায়ন কাঠামো পুনর্গঠন করা হবে। আপাতত সরকারি ও নিজস্ব অর্থায়নের মাধ্যমে
প্রকল্পের প্রাথমিক কাজ শুরু করা হবে। ঋণচুক্তি সম্পন্ন হলে অর্থায়নের সংশোধিত কাঠামো
পুনরায় একনেকের অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।
ইআরএল দ্বিতীয় ইউনিট
নির্মাণে দেশের একটি শিল্পগোষ্ঠী ২০২৪ সালের শুরুর দিকে আগ্রহ প্রকাশ করে। প্রায় ২৫
হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে প্রস্তাবিত ওই প্রকল্প ওই বছর ৯ জুলাই জ্বালানি বিভাগ নীতিগত
অনুমোদন দিলেও গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর প্রকল্পটি স্থগিত হয়ে যায়।

অন্তর্বর্তীকালীন
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রকল্পটি পুনরুদ্ধার করে। তখন প্রকল্প ব্যয় ধরা হয় ৩৬ হাজার
৪১০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২৫ হাজার ৫০০.৭৭ কোটি টাকা উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণ এবং ১০ হাজার
৯০৯.৩২ কোটি টাকা বিপিসির নিজস্ব তহবিল থেকে জোগানের প্রস্তাব ছিল। পরে বিদেশি ঋণ নিশ্চিত
না হওয়ায় রাষ্ট্রীয় কোষাগার ও বিপিসির নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত
নেওয়া হয়। ব্যয় পুনর্নির্ধারণের আগে প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়িয়েছিল
৪২ হাজার ৯৭৩.৭০ কোটি টাকা।
জ্বালানি বিভাগের
তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার মাত্র ২০ শতাংশ পূরণ করতে পারে
ইস্টার্ন রিফাইনারি। বাকি প্রায় ৮০ শতাংশ জ্বালানি আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়।
বিপিসির সংশ্লিষ্ট
কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ইআরএল-২ ইউনিট চালু হলে পরিবেশবান্ধব ইউরো-৫
মানের গ্যাসোলিন ও ডিজেল উৎপাদন সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বিদ্যমান ইউনিটে উৎপাদিত ডিজেল,
মোটর স্পিরিট ও অকটেনও ইউরো-৫ মানে উন্নীত করা যাবে।
ইতোমধ্যে বিপিসি
‘ইনস্টলেশন অব সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) উইথ ডাবল পাইপলাইন’ প্রকল্প বাস্তবায়ন
করেছে, যার মাধ্যমে বছরে সর্বোচ্চ ৪৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল পরিবহন করা সম্ভব হবে।
‘মডার্নাইজেশন অ্যান্ড
এক্সপ্যানশন অব ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড’ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বছরে ৩০ লাখ টন
অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করা যাবে। এতে বছরে প্রায় ৪ লাখ টন ফার্নেস অয়েল, ৬০ হাজার টন
এলপিজি, ৬ লাখ টন ইউরো-৫ পেট্রোল, ১১ লাখ টন ইউরো-৫ ডিজেল, ২ লাখ টন লুব বেজ অয়েল ও
৫ লাখ টন জেট ফুয়েল উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হবে।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী,
২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে পেট্রোলিয়াম পণ্যের ব্যবহার ছিল ৬৭.৩ লাখ টন। এর মধ্যে ইআরএল
উৎপাদন করেছে মাত্র ১২.৫ লাখ টন। ফলে প্রায় ৫০.৫ লাখ টন জ্বালানি আমদানি করতে হয়েছে।
গত কয়েক বছরে জ্বালানির
চাহিদা বছরে গড়ে ৫.৫ শতাংশ হারে বেড়েছে। বিপিসির প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৯-৩০ অর্থবছর
নাগাদ দেশে মোট চাহিদা ১ কোটি ৭ লাখ ৯০ হাজার টনে পৌঁছাতে পারে। তবে ইআরএল সম্প্রসারণ
না হলে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সর্বোচ্চ ৪৫ লাখ টনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

ইআরএল সম্প্রসারণ
না হলে ভবিষ্যতে জ্বালানি ঘাটতি বেড়ে ৯২.৯ লাখ টনে দাঁড়াতে পারে। এতে একদিকে আমদানি
ব্যয়ের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির
মুখে পড়বে।
তবে ইআরএলের এই প্রকল্প
হলে এর মাধ্যমে অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের সক্ষমতা বর্তমানে যা আছে তার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ
করা সম্ভব হবে বলে জানান বিপিসির ঊর্ধ্বতন মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন্স বিভাগ)
মণি লাল দাশ।
তিনি প্রতিদিনের
বাংলাদেশকে বলেন, “এখন যে রিফাইনারিটা হবে, সেটা পরিবেশবান্ধব হবে। এবং এটা আমরা আরও
উন্নতমানের করে… ইউরোপ বা আমেরিকাত যে ধরনের তেল পায়, আমাদের
রিফাইনারি এখন ওই মানেরই হবে, অত্যন্ত আধুনিক মানের। আরও উন্নতমানের জ্বালানি পাব।
“এটার পাশাপাশি আমাদের
যে বাই-প্রোডাক্ট গুলো হবে আমাদের। যেমন এলপিজিরও আরও ডিমান্ড; আমরা সরকারের মাত্র
২ পারসেন্ট সাপোর্ট দিতে পারছি। তখন (দ্বিতীয় ইউনিট হলে) দেখা যায় আমরা ৭-৮ পারসেন্ট
সাপোর্ট দিতে পারছি। আর এখন আছে ১৫ লাখ মেট্রিক টন বছরে, তখন আমরা ৪৫ লাখ মেট্রিক টন
(পরিশোধিত তেল) সাপ্লাই দিতে পারব।”