রাজশাহী সংবাদদাতা
প্রকাশ : ২৩ ডিসেম্বর ২০২২ ২০:৫৫ পিএম
আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:৫৯ পিএম
রাজশাহী সুগার মিল। ছবি : প্রবা
কাঁচামাল সংকটের কথা জানিয়ে রাজশাহী সুগার মিলে আখ মাড়াই কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার (২৩ ডিসেম্বর) সকালে এই কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় মিল কর্তৃপক্ষ। এতে বড় লোকসানের শঙ্কা করছেন মিল ব্যবস্থাপক।
কর্তৃপক্ষের দাবি, আখ সরবরাহের শর্তে কৃষকদের সার, বীজ ও ওষুধ দেয়া হয়। তবে চাষিরা শর্ত ভঙ্গ করে মিলে না দিয়ে গুড় ব্যবসায়ীদের কাছে আখ বিক্রি করছে। চাষিরা বলছেন, মিল থেকে সঠিক সময়ে পাওনা পরিশোধ না করায় আখ সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছেন অনেকে।
রাজশাহী সুগার মিলস লিমিটেড কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি (২০২২-২৩) অর্থ বছরে ২ ডিসেম্বর থেকে আখ মাড়াই শুরু হয়ে ৪০ দিন চালু থাকার কথা ছিল। এই সময়ের মধ্যে রাজশাহী সুগার মিলে ৫০ হাজার টন আখ মাড়াই এবং তা থেকে ৩ হাজার ২৫০ টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়। তবে গত ২২ দিনে আখ মাড়াই হয়েছে মাত্র ২৬ হাজার ৪৫ টন। যার বিপরীতে চিনি উৎপাদন হবে ১ হাজার ৩০০ টন বা তার কিছু বেশি।

রাজশাহীতে ৩ হাজার ৯০০ আখ চাষি রয়েছে। চাষিদের সঙ্গে কথা হলে তারা অভিযোগ করে জানান, মিলে তারা আখ দিলে টাকা না পাওয়ার দুশ্চিন্তায় থাকেন। টাকা তোলার মাধ্যমটাও তাদের কাছে জটিল মনে হয়। তা ছাড়া বাজারের চাইতে মিলে আখের দাম ৬০ থেকে ৮০ টাকা কম পাওয়া যায়।
পবা উপজেলার আখচাষি কামারুল হক জানান, মিলে আখের দাম প্রতি মণ ১৮০ টাকা। তার মধ্যে কেটে নেয় ৪ টাকা। তা ছাড়া মিলে আখ দিলে শ্রমিক দিয়ে কাটার খরচ, পরিবহন খরচ রয়েছে। তবে গুড় ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করলে আখ কাটা ও পরিবহন খরচ লাগে না। ব্যবসায়ীরা জমি থেকে আখ কিনে নিয়ে যায়। এ ছাড়া তারা প্রতি মণ আখের দাম দিচ্ছে ২২০ থেকে ২৬০ টাকা পর্যন্ত দিচ্ছে।
রাজশাহী আখ চাষি কল্যাণ সমিতির সভাপতি ইয়াসিন আলী জানান, বাজার মূল্যের সঙ্গে সুগার মিলের আখের মূল্য সমন্বয় না থাকা এবং আখ বিক্রির টাকা কৃষকদের হাতে যথা সময়ে না পৌঁছানোয় মিল কর্তৃপক্ষের প্রতি আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে। সেকারণে কৃষকরা মিলে আখ সরবরাহ বন্ধ করে দিচ্ছে। এখনও কৃষকদের ১৬ থেকে ১৮ হাজার টন আখেন পাওনা বাকি রয়েছে।

কৃষকদের এই নেতা আরও বলেন, চিনির মূল্যে সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এখন আখের বাজার হওয়া উচিত ২৬০ টাকা। আগে রূপালী ব্যাংকের শিওর ক্যাশের মাধ্যমে কৃষকের টাকা পরিশোধ করা হতো। এবার অন্য একটি ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা দেয়ার ব্যবস্থা করে মিল কর্তৃপক্ষ। এতে দেখা দেয় বিপত্তি। ১২ দিন আখ সরবরাহের পরেও কৃষকরা তাদের পাওনা পায়নি। পরে গত ৮ থেকে ৯ দিন টাকা দেয়ার পরে এখন আবার টাকা দেয়া বন্ধ রয়েছে।
এমন অবস্থায় কৃষকদের জমিতে আখ থাকা পরও তারা রাজশাহী সুগার মিলে আখ দিতে সাহস পাচ্ছে না।
রাজশাহী সুগার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল বাশার বলেন, ‘সুগারমিল কাচামাল আখের ওপর নির্ভরশীল। ২ তারিখ থেকে শুরু হয়ে ৪০ দিন আখ মাড়াইয়ের কথা ছিল। তবে চিনি উৎপাদনের কাচামাল আখের সংকটের কারণে আমরা আখ মাড়াই বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছি। চলতি অর্থ বছরে ৫০ হাজার টন আখ মাড়াইয়ের বিপরীতে ৩ হাজার ২৫০ টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। তবে আখ সংকটের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে সুগার মিলকে লোকসানের মধ্যে পড়তে হবে।
সুগার মিলের এই ব্যবস্থাপক আরও বলেন, রাজশাহীতে আখ চাষির সংখ্যা ৩ হজার ৯০০। কৃষকরা আখেন দাম বেশি চায়। অথচ আমরা তাদেরকে আখ চাষের জন্য ঋণ দিয়েছি। প্রতি একর জমিতে সার ১৬০ কেজি ইউরিয়া, ১১০ কেজি টিএসপি এবং ২ হাজার ৬০০ কেজি বীজ সরবরাহ তরা হয়। এ ছাড়াও নালা কাটার জন্য ২ থেকে ৩ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। অথচ তারা এই সুবিধা নিয়ে এখন অন্যত্র আখ বিক্রি করে দিচ্ছে।
আখ চাষিদের অর্থ পরিশোধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শুরুতে ডাচবাংলা ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধে সমস্যা দেখা দেয়। তবে এখন আর কোন সমস্যা নেই। কৃষকরা মূলত মিলের কাছ থেকে আখ চাষে সুযোগ সুবিধা নিয়ে ফসল ফলিয়ে এখন অন্যত্র বিক্রি করে দিচ্ছে।
মিল সূত্র জানায়, সবশেষ ১৯৯০ সালে ১৪ কোটি ৪ লাখ টাকা লাভের মুখ দেখে রাজশাহীর এই চিনিকল। গত আট বছরে রাজশাহী চিনিকল প্রায় ৪০০ কোটি টাকা লোকসান গুনেছে। চলতি অর্থ বছরে সম্ভাব্য লোকসানের পরিমাণ ধরা হয়েছে ৬৩ কোটি টাকা। এই সুগারমিলে উৎপাদিত চিনির অধিকাংশই সরকারের বিভিন্ন সামরিক, আধাসামরিক বাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে সরবরাহ করা হয়। রাজশাহী সুগার মিলে আখ মাড়াই মৌসুমে প্রতিদিন ২ হাজার টন চিনি উৎপানের সক্ষমতা রয়েছে। সুগার মিলের নিজস্ব দুইটি গুদামে চিনি সংরক্ষণ করা সম্ভব ১৪ হাজার টন।