প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ ২১:০৭ পিএম
দেশে প্রথমবারের মতো ফ্রি ট্রেড জোন গঠনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত এই ফ্রি ট্রেড জোনের স্থান হিসেবে চট্টগ্রামের আনোয়ারাকে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) গভর্নিং বোর্ড সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী।
সোমবার (২৬ জানুয়ারি) রাজধানীর বেইলি রোডের ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ কথা জানান তিনি।
আশিক চৌধুরী বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশে ফ্রি ট্রেড জোনের কোনো কাঠামো নেই। ফ্রি ট্রেড জোন বলতে এমন একটি এলাকা বোঝানো হয়, যা প্রায় ওভারসিজ টেরিটরির মতো কাজ করবে। সেখানে কাস্টমসের বাধ্যবাধকতা থাকবে না। পণ্য সংরক্ষণ, উৎপাদন ও পুনঃরপ্তানির সুযোগ থাকবে। বাংলাদেশের বাণিজ্য কাঠামোতে এটি একটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে।’
বিডা চেয়ারম্যান জানান, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনায় বারবার একটি বিষয় উঠে আসেÑ বাংলাদেশে টাইম টু মার্কেট সমস্যা। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানিতে দীর্ঘ সময় লাগায় উৎপাদন ও রপ্তানি প্রতিযোগিতা কমে যায়। যদি যুক্তরাষ্ট্রের তুলা বাংলাদেশের কোনো ফ্রি ট্রেড জোনে সংরক্ষণ করা যেত, তাহলে প্রয়োজন অনুযায়ী তা বাংলাদেশ বা অন্য দেশে পুনঃরপ্তানি করা সম্ভব হতো। এতে সরবরাহ ব্যবস্থায় গতি আসত এবং বাংলাদেশ বৈশ্বিক উৎপাদন চেইনে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত হতে পারত। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে আনোয়ারায় প্রায় ৬০০ থেকে ৬৫০ একর জমির ওপর একটি ফ্রি ট্রেড জোন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আশিক চৌধুরী বলেন, ‘এটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় নেওয়া হবে। মন্ত্রিসভায় যেহেতু একই ধরনের নীতিনির্ধারকরা থাকেন, তাই অনুমোদন পাওয়ার ব্যাপারে সরকার আশাবাদী।’
ফ্রি ট্রেড জোনের বৈশ্বিক উদাহরণ হিসেবে তিনি দুবাইয়ের জেবেল আলি ফ্রি জোনের কথা উল্লেখ করে বলেন, প্রায় ৫২ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বিস্তৃত এবং এককভাবে বছরে প্রায় ১৯ হাজার কোটি ডলারের বাণিজ্য পরিচালনা করে। ওই জোনটি দুবাইয়ের মোট জিডিপির প্রায় ৩৬ শতাংশ অবদান রাখে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ফ্রি ট্রেড জোন থেকে বড় পরিসরের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক গতিশীলতা প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
তিনি জানান, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে হলে একাধিক আইন, নীতিমালা ও বিধিমালায় পরিবর্তন আনতে হবে। এটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে এবং চলতি বছরের শেষ নাগাদ ফ্রি ট্রেড জোন বাস্তবায়নের প্রাথমিক অবস্থানে পৌঁছানোর লক্ষ্য রয়েছে।
বেজার গভর্নিং বোর্ড সভায় আরেকটি বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন গঠনের বিষয়ে। মিরসরাইয়ে প্রায় ৮৫০ একর জমি ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন হিসেবে মাস্টার প্ল্যানে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। জায়গাটি আগে ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত ছিল, তবে প্রকল্পটি বাতিল হওয়ায় জমিটি নতুনভাবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আশিক চৌধুরী বলেন, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সামরিক শিল্প একটি দ্রুত বর্ধনশীল খাত। একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে কিছু ক্যাপটিভ উৎপাদন সক্ষমতা থাকা জরুরি। সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলোতে দেখা গেছে, ঘাটতি তৈরি হয়েছে মূলত গোলাবারুদ ও সাধারণ যন্ত্রাংশে, উচ্চপ্রযুক্তি অস্ত্রে নয়। এই জায়গায় বাংলাদেশ প্রযুক্তি স্থানান্তর, যৌথ বিনিয়োগ ও সরবরাহকারী হিসেবে যুক্ত হতে পারে। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সম্ভাবনাও রয়েছে।
সভায় কুষ্টিয়া চিনিকল পুনরুজ্জীবনের নীতিগত সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। বেজার সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে বিদ্যমান গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সড়ক অবকাঠামো ব্যবহার করে সেখানে একটি কার্যকর শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রায় ২০০ একর জমি অধিকতর উৎপাদনশীলভাবে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে বলে জানান তিনি।
এ ছাড়া পৌরসভা এলাকার ভেতরে অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগে ২০১২ সালের আইনে পৌরসভাগুলো বেজার আওতার বাইরে ছিল। তবে বর্তমানে পৌরসভার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বাইরে অর্থনৈতিক অঞ্চল করতে গেলে কৃষিজমি অধিগ্রহণের চাপ বাড়ছে। পৌরসভার ভেতরে থাকা বন্ধ শিল্পকারখানাগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতেই এই নীতিগত পরিবর্তন আনা হয়েছে।
বিডা চেয়ারম্যান জানান, একই দিনে মহেশখালী ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট অথরিটির প্রথম গভর্নিং বোর্ড সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে সাংগঠনিক কাঠামো অনুমোদন, ১৩৭ জন জনবল নিয়োগ এবং ২০২৫ থেকে ২০৩০ সালের জন্য স্বল্পমেয়াদি ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে বিপিসি পোর্ট চালু, এলএনজি ও এলপিজি টার্মিনাল স্থাপন এবং একটি ফিশ প্রসেসিং হাব গড়ে তোলাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
বিডার গভর্নিং বোর্ড সভায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাধ্যমে এফডিআই আনতে নতুন প্রণোদনা স্কিমের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রবাসীরা বাংলাদেশে ইকুইটি বিনিয়োগ আনলে সেই বিনিয়োগের ১ দশমিক ২৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা পাবেন। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, কেউ ১০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ আনলে সরকার থেকে তিনি ১ দশমিক ২৫ মিলিয়ন ডলার পাবেন।
এ ছাড়া বিডা, বেজা, হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ, পিপিপি অথরিটিসহ ছয়টি বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থাকে একীভূত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। ভবিষ্যতে একটি স্বাধীন তৃতীয় পক্ষ কনসালট্যান্ট দিয়ে নতুন সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি করা হবে, যাতে কোনো সংস্থা অতিরিক্ত সুবিধা না পায়।
তিনি আরও জানান, বিডার প্রাইভেটাইজেশন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট গাইডলাইন অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে বিনিয়োগ ব্যাংকের মাধ্যমে কমিশনভিত্তিক কাঠামোতে এই প্রক্রিয়া পরিচালিত হবে। পাশাপাশি চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপে পর্যায়ক্রমে বিডার বিদেশি অফিস স্থাপনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যেখানে পারফরম্যান্সভিত্তিক কাঠামোতে কাজ হবে।
বিডা চেয়ারম্যান বলেন, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভালো উদ্যোগ থেমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা দেশের জন্য ক্ষতিকর। তাই এসব সিদ্ধান্তকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে টেকসই করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যৎ সরকারগুলোও এগুলো বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখতে পারে।