প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ২০:৫১ পিএম
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার ফলে অর্থনীতিতে মন্দাভাব দেখা দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তার মতে, বিনিয়োগ বাড়লে এডিপি কিছুটা কম হলেও অর্থনীতিতে বড় ধরনের সমস্যা হতো না, বরং কর্মসংস্থান ও উৎপাদন স্বাভাবিক গতিতে এগোতে পারত।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) রাজধানীর আগাওগাঁওয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভা শেষে ব্রিফিংয়ে এ মন্তব্য করেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। এর আগে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে এনইসি সভাকক্ষে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
এনইসি সভায় দুই লাখ কোটি টাকার সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (আরএডিপি) অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা এবং বিদেশি অর্থায়ন ৭২ হাজার কোটি টাকা। মূল এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ আকার কমেছে ৩০ হাজার কোটি টাকা।
পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, এই সময়ে অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক দিক হলো রেমিট্যান্সপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। রেমিট্যান্সের বড় অংশ গ্রামে যাচ্ছে, ফলে যেসব এলাকায় রেমিট্যান্স বেশি সেখানে বাড়িঘর নির্মাণ, দোকানপাট, সেবা খাত ও ক্ষুদ্র ব্যবসা দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। এসব এলাকায় দারিদ্র্যের চাপ তুলনামূলক কম।
বিনিয়োগের পরিবেশ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, যদিও বড় বিনিয়োগ আসা বা না আসা কেবল সুদের হারের ওপর নির্ভর করে না, সেখানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতিগত নিশ্চয়তার বিষয়গুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। আমাদের করা এক জরিপে দেখা গেছে, তাদের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা হলো ঋণ পাওয়া এবং স্বল্প সুদে চলতি মূলধনের অভাব। কম সুদে ঋণ না পেলে তাদের ব্যবসার স্বাভাবিক কার্যক্রম চালানোই কঠিন হয়ে পড়ে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) এবং সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (আরএডিপি) তুলনা করে দেখা যায়, এডিপির তুলনায় আরএডিপিতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, বরাদ্দ বেড়েছে ২৮ শতাংশ। এর পাশাপাশি স্থানীয় সরকার বিভাগে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে ৮ শতাংশ। এই দুই খাতেই মূলত বরাদ্দ বাড়ানোর প্রবণতা দেখা গেছে। মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ৭৭ শতাংশ কমানো হয়েছে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণে। ৭৩ শতাংশ কমানো হয়েছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা খাতে বরাদ্দ হ্রাস পেয়েছে ৫৫ শতাংশ। এ ছাড়া বিদ্যুতে ২৭ শতাংশ, প্রাথমিক শিক্ষায় ২৯ শতাংশ, নৌ-পরিবহনে ৩৬ শতাংশ, রেলপথ ও কৃষিতে ৩৬ শতাংশ কমানো হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন আরও জানায়, বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পে ৪২৫ কোটি থেকে ২৫৬ কোটি ৪ লাখ কমিয়ে সংশোধিত বরাদ্দ ধরা হচ্ছে ১৬৮ কোটি ৬ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে বরাদ্দ কমছে ৬০ শতাংশ।
এ ছাড়া মেট্রোরেল লাইন-৫ (এমআরটি লাইন-৫) প্রকল্পে ১ হাজার ৪৯০ কোটি ৬৫ লাখ থেকে ৮৯৭ কোটি ৮৫ লাখ কমিয়ে সংশোধিত বরাদ্দ ধরা হচ্ছে ৫৯২ কোটি ৮ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে বরাদ্দ কমছে ৬০ শতাংশ।
মেট্রোরেল লাইন-৬ (এমআরটি লাইন-৬) প্রকল্পে ১ হাজার ৩৪৭ কোটি ৪৪ লাখ থেকে ৩২৩ কোটি ৯৬ লাখ কমিয়ে বরাদ্দ ধরা হচ্ছে ১ হাজার ২৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে বরাদ্দ কমছে ২৪ শতাংশ। ‘আপগ্রেডিং অব হাটিকুমরুল-রংপুর হাইওয়ে টু ৪ লেন’ প্রকল্পে ১ হাজার ৮৭২ কোটি ৫ লাখ থেকে ৩০৯ কোটি ৯৭ লাখ কমিয়ে বরাদ্দ ধরা হচ্ছে ১ হাজার ৫৬২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে বরাদ্দ কমছে ১৭ শতাংশ। এ ছাড়া ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার লেন প্রকল্পে ১ হাজার ৭২৩ কোটি ৭১ লাখ থেকে ৫৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ কমছে।
সামাজিক সুরক্ষা ও নগর উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বরাদ্দও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের খাদ্য কর্মসূচিতে বরাদ্দ প্রায় ৫০ শতাংশ কমানো হয়েছে। ঢাকা স্যানিটেশন উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ কমানো হয়েছে ৪১ শতাংশের বেশি। নগর এলাকায় জনস্বাস্থ্য প্রতিরোধমূলক সেবা প্রকল্পগুলোর বরাদ্দও ৮০ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে।
সংশোধিত এডিপিতে মোট প্রকল্পের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৩০টি। এর মধ্যে বিনিয়োগ প্রকল্প ১ হাজার ১০৮টি, কারিগরি সহায়তা প্রকল্প ১২১টি এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নের প্রকল্প ৬৬টি। আরএডিপিতে ২৮৬টি প্রকল্প সমাপ্তির জন্য নির্ধারিত রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া বিশেষ প্রয়োজনে উন্নয়ন সহায়তার আওতায় মোট ৩০ হাজার ১৫৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে পাঁচটি উন্নয়ন সহায়তা খাতের জন্য ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জন্য ৫৩০ কোটি টাকা এবং বিশেষ এলাকার জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যা মিলিয়ে বিশেষ বরাদ্দের মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা।