× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

গ্যাস সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত

কাউসার আহমেদ

প্রকাশ : ১১ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:২৬ এএম

আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৩০ এএম

প্রবা ফটো

প্রবা ফটো

বাজারে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না, আর যেগুলো মিলছে সেগুলোর দাম সরকারের নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি। এদিকে লাইনের গ্যাসেও চাপ না থাকায় পরিস্থিতি হয়ে উঠেছে ভয়াবহ। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে পাঁচ সদস্যের পরিবার নিয়ে বসবাস করা রুবিনা বেগম বলেন, অতিরিক্ত দামে গ্যাস কিনতে না পেরে কয়েক দিন প্রতিবেশীর বাসার লাইনের গ্যাসে রান্না করলেও এখন সেখানে গ্যাসের চাপ নেই। এখন কী করমু? বাচ্চা-পোলাপান নিয়ে তো বাইরে খাওয়া যায় না। এমনিতেই সব জিনিসের দাম বেশি।

শুধু রুবিনা বেগম নন, গত ২০ দিনেরও বেশি সময় ধরে সিলিন্ডার গ্যাসের তীব্র সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ। বাসাবাড়ি, হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সবাই এই সংকটের শিকার। ব্যবসায়ীদের কৃত্রিম সংকট ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতায় ভোগান্তিতে পড়েছে সব শ্রেণির মানুষ। সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত বাজার তদারকি জোরদার ও সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এই সংকট আরও দীর্ঘ হতে পারে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সীমিত আয়ের পরিবারগুলো, যাদের জন্য রান্নাঘরে আগুন জ্বালানোই এখন বড় দুশ্চিন্তার কারণ।

জোয়ার সাহারা বাজারে হোটেল চালান রহমাতুল্লাহ বলেন, এখন বাজারে সিলিন্ডারই পাওয়া যাচ্ছে না। আগে লাইনের গ্যাসে কোনো মতে হোটেল চালিয়ে নেওয়া যেত, এখন সেটাও নেই। দিনে চুলা জ্বলে না, রাতে রান্না করে সকালে খাওয়ানো সম্ভব নয়। গ্যাস না থাকায় ব্যবসা প্রায় বন্ধের পথে।

রাজধানীর একটি বাসাবাড়িতে কাজ করা গৃহকর্মী হাসিনা বেগম বলেন, সারা দিন গ্যাস থাকে না। শুধু রাত আর ভোরের দিকে একটু পাওয়া যায়। তাই এখন ফজরের আজান শুনেই রান্না করতে আসি। আগে সকাল ৭টায় আসতাম, এখন ৫টায় না এলে গ্যাস পাই না।

তেজগাঁওয়ের আবিদ ও সালমার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সকাল সাড়ে ৮টার পর থেকেই গ্যাসের চাপ এতটাই কমে যায় যে চুলা মিটিমিটি করে জ্বলে। চা গরম করার মতো গ্যাসও থাকে না। এ অবস্থায় অধিকাংশ পরিবার রাতের বেলায় রান্না করে খাবার সংরক্ষণ করে রাখছে। তবে এতে শিশুদের ক্ষেত্রে বাড়তি সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। কারণ শিশুদের খাবার বিভিন্ন সময়ে প্রস্তুত করতে হয়, যা গ্যাস সংকটের কারণে সম্ভব হচ্ছে না। গত শুক্রবার বিকাশের একটি দোকানে গ্যাসের বিল জমা দিতে আসেন তারেক হোসেন বিন্দু। তিনি বলেন, দিনের বেলায় গ্যাস পাওয়া যায় না। অল্প সময় যে গ্যাস আসে, তা দিয়ে কোনো কাজ করা সম্ভব হয় না। তাই বাধ্য হয়ে অল্প কিছু টাকা রিচার্জ করে রাখছি।

শুধু বাসাবাড়ি বা রেস্তোরাঁ নয়, চলমান তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সংকটে ভুগছে অটোগ্যাস স্টেশনগুলোও। দেশে প্রায় এক হাজার অটোগ্যাস স্টেশন থেকে গাড়ির মালিক ও চালকরা এলপিজি নেন। কিন্তু বর্তমানে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাচ্ছে না স্টেশনগুলো। এতে অনেক স্টেশন বন্ধের মুখে পড়েছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন ও কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে মোট এলপিজি ব্যবহারের অন্তত ১০ শতাংশ, অর্থাৎ ১৫ হাজার টন এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশনে সরবরাহের দাবি জানিয়েছে। গতকাল শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি ব্যবহার হয়। এর মধ্যে যানবাহন খাতে মাত্র ১৫ হাজার মেট্রিক টন, অর্থাৎ মোট ব্যবহারের প্রায় ১০ শতাংশ, এলপিজি অটোগ্যাস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অথচ এই পরিমাণ এলপিজি গ্যাস স্টেশনে সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ায় পুরো অটোগ্যাস খাত বিপর্যয়ের মুখে। বিইআরসি কাছে বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন ও কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অনুরোধ জানায়, এ খাতে ব্যবহারের জন্য প্রতি মাসে মোট এলপিজি ব্যবহারের অন্তত ১০ শতাংশ অর্থাৎ ১৫ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশনগুলোতে নিরবচ্ছিন্নভাবে সরবরাহ নিশ্চিত করার।

সকালে আর রাত ছাড়া অন্য কোনো সময় গ্যাস পাওয়া যায় না। মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা মো. ফিরোজ বলেন, টানা দুই দিন ধরে গ্যাসের দেখা নেই। মানুষ বাধ্য হয়ে হোটেলে ভিড় জমাচ্ছেন। সুযোগ বুঝে নানা অজুহাতে হোটেল ব্যবসায়ীরা খাবারের দাম হাঁকিয়ে নিচ্ছেন।

গ্যাসের চাপ কম থাকার কারণ জানতে চাইলে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মালবাহী ট্রলারের নোঙরের আঘাতে আমিনবাজারে তুরাগ নদের নিচে স্থাপিত বিতরণ গ্যাস পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মেরামতকালে ওই পাইপলাইনে পানি ঢোকে। একই সঙ্গে সার্বিক সরবরাহ কম থাকায় ঢাকা মহানগরে গ্যাসের মারাত্মক স্বল্পচাপ বিরাজ করছে। এ বিষয়ে তিতাস গ্যাসের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন, বুড়িগঙ্গার নিচ দিয়ে যাওয়া পাইপলাইনে লিকেজের কারণে গত বুধবার গ্যাস সরবরাহ বন্ধের কাজ শুরু করা হয়। তবে পুরোপুরি গ্যাসের চাপ বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট টিম ৯০ থেকে ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত লাইন বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছে। এ সময় পাইপলাইনের ভেতরে পানি ঢুকে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে।

গতকাল শনিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানায়, মিরপুর রোডে গণভবনের সামনে ৪ ইঞ্চি ব্যাসের একটি ভালভ ফেটে ছিদ্র তৈরি হয়। মেরামতের জন্য একাধিক ভালভ বন্ধ রাখায় বিতরণ লাইনে গ্যাসের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এর ফলে ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, নিউমার্কেট, হাজারীবাগ, গাবতলীসহ আশপাশের এলাকায় মারাত্মক স্বল্পচাপ দেখা দেয়। কিন্তু শনিবার বিকালে জানানো হয়, এটি মেরামত করা হয়েছে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক।

গত বৃহস্পতিবার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ‍্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিল এলপি গ‍্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড। পরে সরকার দাবি মেনে নেওয়ার শর্তে বিকালে তারা মানববন্ধন উঠিয়ে নেয়। কিন্তু দাবি মানার পরও রাজধানীতে ব্যাপক হারে সিলিন্ডার সংকট দেখা দেয়। অতিরিক্ত দাম দিয়েও মিলছে না। ক্ষোভ প্রকাশ করে আতিক নামের এক দিনমজুর বলেন, এখনও গ্যাস পাচ্ছি না। সরকার কী সমাধান করল?

ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, সরকার এলপিজি আমদানি ও সিলিন্ডারের ওপর মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) কমালে ভোক্তা পর্যায়ে দাম সহনীয় হবে। সমিতির দাবিগুলোর মধ্যে ছিলÑ সারা দেশে চলমান প্রশাসনিক অভিযান বন্ধ করা, বিতরণকারী ও খুচরা বিক্রেতাদের চার্জ বৃদ্ধি করা এবং এলপিজির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা।

গত বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, আমদানিকৃত এলপিজির ওপর ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার এবং স্থানীয় পর্যায়ে তা ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে সরকারের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো, ভোক্তা পর্যায়ে গ্যাসের দাম কমানো এবং বাজারে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা। বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, ‘কমিশন বৃদ্ধির ব্যাপারে আমরা একমত হয়েছি, বাকি দাবির ব্যাপারে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।’

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এখন অনেক ব্যবসায়ীর অপর নামই যেন মানুষকে জিম্মি করে পকেট কাটা। আমদানি কম হলে তা অন্তত এক মাস আগে জানানোর কথা, শীত বাড়লেই লাইনের গ্যাসে সংকট দেখিয়ে এলপিজির চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজার থেকে সিলিন্ডার উধাও হয়ে যাওয়া স্পষ্ট কারসাজির ইঙ্গিত দেয়। এখানে আমদানিকারক, ডিস্ট্রিবিউটর এবং পাইকারি-খুচরা বিক্রেতাদের যোগসাজশ রয়েছে।

সম্প্রতি এক বক্তব্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীদের ‘যোগসাজশ ও পরিকল্পিত কারসাজির ফল’ হলো গ্যাস সংকট। সরকারের হাতে দুই শতাংশ মালিকানা থাকলেও ৯৮ শতাংশ বেসরকারি হাতে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা