প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০২৬ ২১:০৪ পিএম
বর্তমানে অর্থনীতিতে যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে না পারলে মূল্যস্ফীতি, বৈষম্য ও সামাজিক অস্থিরতা আরও গভীর হতে পারে। বিশেষ করে উচ্চ সুদহার, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতার কারণে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ থমকে আছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে গঠিত নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেবে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
শনিবার (১০ জানুয়ারি) ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি ও নির্বাচনী বাঁকে বহুমাত্রিক ঝুঁকি’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। রাজধানীর ধানমন্ডিতে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।
তিনি বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে না পারলে অর্থনীতিতে বৈষম্য ও অস্থিরতা একসঙ্গে বাড়ে। সমাজে ন্যায়সংগত সুযোগ না থাকলে একদিকে আয় ও সম্পদের বৈষম্য বাড়ে, অন্যদিকে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। তার মতে, নতুন সরকারের জন্য বিনিয়োগ স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠাই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি এখন আর সাময়িক সমস্যা নয়, বরং কাঠামোগত রূপ নিয়েছে। শুধু সুদের হার বাড়িয়ে এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার সংস্কার, মজুদদারি রোধ, পরিবহন ও সংরক্ষণ অবকাঠামোয় বিনিয়োগ এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে সময়মতো খাদ্য আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তার বক্তব্যে খাদ্য নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনার আহ্বানও উঠে আসে। কৃষি ও খাদ্যশস্য ব্যবস্থাপনায় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং কার্যকর সংগ্রহ ও মজুদ ব্যবস্থা জোরদার না করলে খাদ্যবাজার স্থিতিশীল রাখা কঠিন হবে বলে তিনি মনে করেন।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, বর্তমান বিনিয়োগ ঘাটতি থেকে বেরোতে না পারলে অর্থনীতির অন্যান্য সমস্যাও দীর্ঘস্থায়ী হবে। তার মতে, ব্যাংক খাত সংস্কার ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। ঋণখেলাপি কমাতে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থা, ব্যাংক রেজুলেশন আইন কার্যকর করা, ব্যাংক কোম্পানি আইন সংস্কার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে এবং কর ও ভ্যাট ব্যবস্থাকে সহজ ও কার্যকর করতে হবে।
জ্বালানি খাত নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ব্যয়বহুল বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ, দেশীয় গ্যাস ও জ্বালানি অনুসন্ধান জোরদার এবং এই খাতে আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করা হলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং প্রবাসী আয় ধরে রাখার কৌশলকে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার কথা বলতে গিয়ে ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তরুণ জনগোষ্ঠী। দেশের মানুষের গড় বয়স এখনও ২৬ থেকে ২৭ বছরের মধ্যে। এই তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা গেলে অর্থনীতিতে গতি ফেরানো সম্ভব। তিনি বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর পরিবর্তনের এই সময়ে তরুণদের অভিযোজন ক্ষমতাই বাংলাদেশের বড় সম্পদ।
নির্বাচনী প্রেক্ষাপট নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ফাহমিদা খাতুন বলেন, নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। তবে নির্বাচন যেন নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক এবং সহিংসতামুক্ত হয়, এটাই প্রত্যাশা। অর্থের অপব্যবহার রোধে বিদ্যমান নীতিমালা কঠোরভাবে মানা প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশি ও বিদেশি ঋণের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। জাতীয় বাজেটে এখন বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে শুধু ঋণের সুদ পরিশোধে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
তিনি আরও বলেন, দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক গতি মন্থর। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন হার গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। বেসরকারি বিনিয়োগ ঐতিহাসিকভাবে নিম্নমুখী, একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগও সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে কম পর্যায়ে রয়েছে।
রাজস্ব পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সিপিডির পক্ষ থেকে বলা হয়, রাজস্ব বাড়াতে প্রচলিত পথের বাইরে নতুন কৌশল খুঁজতে হবে। করদাতাদের উৎসাহিত করা, অপ্রয়োজনীয় কর ছাড় বাতিল, অবৈধ অর্থপাচার রোধ এবং এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী বাস্তবতায় কর ব্যবস্থার সংস্কার জরুরি। একই সঙ্গে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে অতিরিক্ত ঋণ না নেওয়া এবং প্রকল্প ব্যয়ে কঠোর নজরদারির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
মূল্যস্ফীতির প্রসঙ্গে সিপিডির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম কমলেও দেশের বাজারে তার প্রতিফলন নেই। চালের উৎপাদন চাহিদার চেয়ে বেশি হলেও দেশে চালের দাম কমছে না। আলু, পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ, বেগুন, মাছ ও মাংসের মতো পণ্যে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা বড় হলেও চালের ক্ষেত্রে বিক্রেতাদের মুনাফা তুলনামূলক কম, এমন তথ্যও তুলে ধরা হয় সংবাদ সম্মেলনে।